বোরখা-হিজাব আমার ভাইরাস প্রোটেক্টিং পিপিই না, রেপ প্রোটেক্টিং স্যুট না!

তানজিয়া ইসলাম তানহা

নোভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে পৃথিবীব্যাপী দুর্ভোগ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা অনেক অ্যাপোলোজেটিক মুসলিমস ইসলামবিদ্বেষীদের কিছু কটাক্ষের দাঁত ভাঙা জবাব পেয়ে গেছি।

১। ‘মেয়েরা এখন পিপিই পরে পুরো শরীর ঢেকে রাখছে তাতে তো কিছু বলা হচ্ছে না! খালি বলা হয় বোরখা/হিজাবের বেলায়!’

২। ‘মাস্ক পড়ে মুখ ঢেকে রাখলে প্রগতিশীলতায় বাঁধা পড়ে না, বাঁধা পড়ে খালি নিকাব পড়ে মুখ ঢেকে রাখলে!’

৩। ‘ভাইরাসের ভয়ে মাস্ক/পিপিই পড়তে পারো, আল্লাহর ভয়ে হিজাব/নিকাব পড়লেই দোষ!’

৪। ‘আমার হিজাব/নিকাবই আমাকে ভাইরাস থেকে প্রোটেক্টেড রাখে, মুসলিমাহদের মাস্ক/পিপিই লাগে না!’

৫। ‘পিপিই পড়াদের দিকে কেউ আঙুল তুলছে না তার গরম লাগে কিনা, তাকে চেনা যাচ্ছে কিনা, তাকে বাঙালী সংস্কৃতিধারী লাগছে কিনা অথচ মেয়েটা বোরখা/জিলবাব পড়লেই তাকেই ক্ষ্যাত, মধ্যযুগীয়, অপ্রগতিশীল বলা হতো!’

নভেল করোনা ভাইরাস এসে এই মাস্ক আর পিপিই দিয়ে তবে ইসলামবিদ্বেষীদের এবার দাঁতভাঙা, মুখভাঙা জবাব দিয়ে গেলো!

ইসলামিস্টদের থেকে এখন পর্যন্ত এমন লেখা দেখেননি এমন মানুষ হয়তো সোশাল মিডিয়ায় খুব কমই আছেন।
বেশিরভাগই হয়তো এই ‘দাঁতভাঙা’ যুক্তিগুলোর সাথে একমতও পোষণ করেছেন। খালি তলে তলে টেরই পাননি, এটি ইসলামোফোবদের ঘৃণার দাঁতভাঙা জবাব নয়, স্বয়ং ইসলামেরই স্পিরিটকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া কুযুক্তি।

আমার পর্দাশীল পোষাক কখনো মাস্ক-পিপিইর সমতুল্য নয়। আমি পর্দাশীল পোশাক পড়ি, মুখ ঢেকে রাখি কেবল,

=> ভাইরাস থেকে বাঁচতে নয়,
=> রেপ থেকে বাঁচতে নয়,
=> চুল/স্কিন সূর্যালোক থেকে প্রটেক্টেড রাখতে নয়,

আমি পর্দাশীল পোষাক করি শুধুমাত্র আমার প্রভুর নির্দেশ মানার জন্য।
ব্যাস।
আর কোনো কারণ নেই।
আমার প্রভুর নির্দেশের বড়ত্বের সামনে যুক্তি হিসেবে ‘ভাইরাস প্রোটেক্টিভ’, ‘রেপ প্রোটেক্টিভ’ ‘স্কিন এন্ড হেয়ার কেয়ারিং’ বিশেষণ প্রয়োজন হওয়া মানে শুধুমাত্র ‘আল্লাহর নির্দেশ’ হওয়াই পর্দা করার জন্য যথেষ্ট না হওয়া।

অবশ্যই এর বাড়তি কিছু বেনেফিট আছে, কিন্তু সেগুলো অ্যাবসল্যুট না। সব জায়গায় সবার উপরে খাটে না। তাই প্রধাণ কারণ হিসেবে সেগুলো আসতেও পারে না।

যেমন আমি যদি বলি পর্দা করলে কখনো রেপ হবো না, টিজিং-য়ের স্বীকার হবো না, তাহলে কখনো যদি পর্দা করেই সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা রেপের স্বীকার হই তখনই পর্দার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন আসতে পারে পর্দা করেও মেয়েরা রেপ ভিক্টিম হচ্ছে কেন? তাহলে পর্দা করে লাভ-টা কী হলো?

আসলে কি তাই?

পর্দা কোন রেপ/হ্যারাসমেন্ট প্রোটেক্টিভ জ্যাকেট নয় যা দেখলেই রেপিস্টরা দৌড়ে পালাবে আর বলবে ‘পর্দাশীলদের রেপ করি না!’ বরং একজন রেপিস্ট যার উপরেই সুযোগ পাবে তাকেই রেপ করবে, সেখানে পোষাক ম্যাটার করে না, ম্যাটার করে সুযোগ। সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে পর্দার নিচে আসল নারী মাংসপিন্ডটি বের করে ফেলতে রেপিস্টের দুই মিনিটও লাগে না।

পর্দা আমাকে এখানে রেপিস্টের থেকে সুরক্ষা দিতে পারেনি বলেই কি তাহলে এটি অকেজো বিধান হয়ে গেলো?
হয়নি আমরা সবাই জানি। কিন্তু পর্দা করার রিজনিং হিসেবে যখন আমরা রেপ/হ্যারাসমেন্ট থেকে বাঁচার যুক্তি দেখাই, নারীরা পর্দা করলেই ইভটিজিং হবে না যুক্তি দেই, তখন পর্দা করেও এসবের স্বীকার হওয়া মাত্রই পর্দার এই সো কলড ‘প্রোটেক্টিভনেস’ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। এই সুযোগটা আমরাই করে দেই।

অথচ আমরা যদি বলতাম পর্দাশীল পোষাক মেয়েরা কোনোকিছু বাঁচতে নয়, শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ মানতে পড়ে, তাহলে পর্দার উপর এই অযৌক্তিক প্রশ্নগুলোই আসতো না।

আল্লাহর নির্দেশ মানতে গেলে দুনিয়াতে যেমন কিছু প্রিভিলেজও বোনাস পাওয়া যায় তেমনি অনেক কটাক্ষ-ও বোনাস পাওয়া যায়। অনেকে যেমন সম্মান করে তেমনি অনেকেই আবার ঠিক এই কারণেই চরম অসম্মানও করে। সূর্যালোক থেকে হিজাব যেমন চুলকে প্রটেক্ট করে তেমনি দিনের লম্বা একটা সময় হিজাব পড়ে থাকা অনেকের চুল পড়ারও কারণ হয়। দীর্ঘসময় নিকাব পড়ে থাকায় স্কিনে অনেকের চুলকানিও হয়।

তো কী হয়েছে?

এসব সমস্যা কী তাহলে মেয়েদের হিজাব থেকে দূরে সরে যাওয়ার যুক্তি? যদি তা না হয় তাহলে মেয়েদের হিজাব পড়ার যুক্তিও এর বিপরীতগুলো হতে পারে না।

মুসলিমাহ-রা পর্দা করে শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ মানতে। এর অবস্টাকলগুলোও হাসিমুখে মেনে নেয় প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য। নিকাব করোনা প্রটেক্টিং মাস্ক না। করোনা প্রটেক্ট করতে আমার নিকাব পড়তে হবে না। নিকাবকে আমি করোনা প্রোটেক্টিং মাস্কের সাথে তুলনা দিলাম তো আসলে নিকাবকে ছোট করলাম। এর বিশাল উদ্দেশ্যকে (আল্লাহর সন্তুষ্টি) আমি পিঁপড়ার মত ছোট বানিয়ে দিলাম!

তেমনি পিপিই পড়লে ইসলামোফোবদের সমস্যা হয় না বোরখা/জিলবাব পড়তে কেনো হয় যুক্তি খাটালাম তো আসলে আমি বোরখা/জিলবাবকেই ছোট করলাম।

এই মাস্ক/পিপিই পৃথিবীতে আসা সাময়িক একটা সমস্যার সাময়িক পোশাক, কিন্তু পর্দার পোষাক চিরন্তন, শাশ্বত। এই পিপিই/মাস্ক একসময় চলে যাবে, কিন্তু পর্দার পোষাক ঠিকই রয়ে যাবে।

তখন ইসলামোফোবদের কটাক্ষ খন্ডন করতে কোন যুক্তি আনবেন?

এর কোনোই দরকার নেই।

কারো কাছে নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, রেপ/হ্যারসমেন্ট থেকে বাঁচতে, চুল/স্কিন প্রোটেক্ট করতে সত্যিকার পর্দাশীল-রা কখনো পর্দা করেনি, করবেও না।

সত্যিকার পর্দাশীল-রা শুধুমাত্র তাদের প্রভু-র আদেশ মানতেই পর্দা করবে। তাতে যারা কটাক্ষ করে তাদের কটাক্ষের জবাবে পর্দার পিছনে নতুন কারণ দেখানোর কোনো দায় আমাদের নেই। কারণ দেখিয়ে তাদের কাছে প্রগতিশীল সাজারও আমাদের কোনোই প্রয়োজন নেই।

তাই এইসব খোঁড়া যুক্তি দিয়ে ইসলামোফোব-দের দাঁতভাঙা জবাবের নামে ইসলামের ট্রু স্পিরিটের কোমর ভাঙা বন্ধ করুন।

লেখকঃ কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন