করোনা পরিস্থিতিতে কুরবানীঃ নিজস্ব চিন্তা ভাবনা (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

জামান শামস

কোরআন-হাদিসের বর্ণনায় ইসলামী সব বিধানের স্তরবিন্যাস সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও উম্মতের ফকিহ ও আইনবিদরা কোরআন-সুন্নাহে গবেষণা করে বিধানাবলিকে বিভিন্ন স্তরে রূপ দিয়েছেন এবং সেগুলো সুবিন্যস্ত করেছেন। শরিয়তের আদেশ-নিষেধ ও বিধানাবলি স্তরভেদে বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। আদেশসমূহ যথা—ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব । আর নিষেধসমূহ যথা—হারাম ও মাকরুহ তাহরিমী। আর কিছু জিনিস রয়েছে আদেশ-নিষেধ কোনোটিই নয়, বরং শুধু বৈধতার পর্যায়ে পড়ে,সেগুলোকে মুবাহ বলে।এগুলো প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা বৈশিস্ট্য ও মর্যাদা রয়েছে।

ফরজ ও ওয়াজিব প্রায় একই অর্থবোধক। এ শব্দ দুটির অর্থ: আবশ্যক, অপরিহার্য, জরুরি। কেউ যদি ফরজ বা ওয়াজিব পরিত্যাগ করে তাহলে গুনাহগার হবে আর অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে।
তবে একদল ফকীহ এ দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাদের মতে, ফরজ থেকে ওয়াজিব তুলনামূলকভাবে কম মর্যাদার। কেউ ফরজ অস্বীকার করলে কাফির হয়ে যাবে কিন্তু ওয়াজিব অস্বীকার করলে কাফির হবে না বরং ফাসিক হবে।নামাজের ক্ষেত্রে ফরজে ভুল হলে নামাজ বাতিল,ওয়াজিবে ভুল হলে সহু সিজদা দিয়ে ত্রুটি সংশোধন করা হয়।

সুন্নাহ রাসুলুল্লাহ সাঃ যে আমল নিজে করেছেন,করার জন্য আদেশ করেছেন বা সম্মতি দিয়েছেন।কোন ঈমানদার বান্দা সুন্নাহর পূর্ণাংগ অনুসরণ ব্যতীত ভালো মানের মুসলমান হতে পারে না । আর অস্বীকার করলে রেসালাতের উপরই ঈমান থাকে না।কাজেই ফরজ,ওয়াজিব ও সুন্নাহ ফিকহি পরিভাষায় পৃথক পৃথক স্টেটাস বহন করলেও কোনটিই অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের নয়।ইসলামে প্রবেশ করতে আমরা যে কলেমা উচ্চারণ করি তার মাধ্যমে এই তিনটি পরিপালনের স্বীকৃতিও দেয়া হয় যদিও বাস্তবক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো কুরবানী করা কি বাধ্যতামূলক ?

আমরা যে মাযহাবের অনুসারী,হানাফি মতানুসারে কুরবানী ওয়াজিব এবং বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলি মিস করা উচিত নয়,করলে অবশ্যই লংঘনজনিত গুনাহ হবে। তার ব্যাপারে রাসুল সাঃ বলেছেন,সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

ঈমাম শাফেয়ীর মত অনুসারে, কুরবানী হ’ল সুন্নতে মু’আকদা। এর অর্থ এটি একটি নিশ্চিত সুন্নাহ হিসাবে অত্যন্ত সুপারিশ করা হয়, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

সর্বাধিক সুপরিচিত মালেকী এবং হাম্বালি মতামত হলো কুরবানী সুন্নত মুআকদাহ; তবে কিছু মতামতে তারাও বলেছে এটি বাধ্যতামূলক।

আপনি কোন ফিকহি স্কুল অনুসরণ করেন না কেন, কুরবানী সম্পাদন করা একটি মহান পুরষ্কার বহন করে কারণ এটি নবী করীম (সঃ) ব্যক্তিগতভাবে করেছিলেন এবং তাঁর অনুসারীদেরও এটি করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।

তবে কুরআনে হাকীমে কুরবানীর বিষয়ে অত্যধিক গুরুত্ব স্বত্তেও কোন ফিকহি স্কুলই এটিকে নামাজ রোজার মতো ফরজ বলেনি।তবুও বলবো ফিকহি মাসআলা মানুষের জন্য আমলকে সহজতর করেছে কিন্ত এর মানে কুরবানীর স্পিরিট ও উদ্দীপনাকে কম্প্রোমাইজ করা নয়।একথা বলা সংগত নয় যে যেহেতু এটা ফরজ না কাজেই অবস্থার প্রেক্ষিতে স্থগিত বা বাতিল করা যেতে পারে।

বলাবাহুল্য, কুরবানী নামায রোযার মতো ফরয আমল নয়, তবে এটি অন্যান্য সুন্নতে মুয়াক্কাদার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত কুরবানী করেছেন, কোন বছর কোন কারণেই বাদ দেননি। (আলইস্তিযকার) আর হযরত আলী (রা.)কে আদেশ করেছেন (ইন্তেকালের পরেও) তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করতে। তাই তিনি প্রতি বছর নিজের কুরবানীর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী করতেন। (মুসনাদে আহমদ ও সুনানে আবু দাউদ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের মধ্যে এই ইবাদত ‘তাওয়ারুছ’ ও ‘তাওয়াতুর’এর সাথে চলমান রয়েছে এবং প্রতিবছর ইসলামের একটি প্রকাশ্য ও সম্মিলিতভাবে আদায়যোগ্য ইবাদত হিসাবে তা আদায় করা হয়েছে।

কুরবানী স্থগিত হলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে

একথা সুস্পস্ট যে আল্লাহ না করুন,কুরবানী সামর্থ থাকা সত্তেও ইচ্ছাকৃতভাবে করতে পারলেন না তবে তাহলে তিনি একটি আবশ্যকীয় হুকুম লংঘন করলেন।তবে অনিচ্ছাকৃত ভাবে কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে,যেমন তিনি সফরে ছিলেন বা পশুর হাটে পশুর সংকট হয়, তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫)

এটা তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিন্ত জাতীয় পর্যায়ে কুরবানী উপলক্ষে যে কয়েকশত কোটি টাকার অর্থনীতি,তার কি হবে?সামান্য কয়েকটা পরিসংখ্যনে বিষয়টি আন্দাজ করা যেতে পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে দেশে খামারের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯১টি। ২০১৯ সালে গরুর খামারের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৭হাজার ৪১৬টি। এবার এ সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।গত তিন বছর ধরে আমাদের দেশি পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা মিটানো হচ্ছে। গত বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ। এরমধ্যে ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লাখ ছাগল-ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশু। কোরবানিতে পশু জবাই করা হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ। গত বছরে প্রস্তুতকৃত প্রায় ১২ লাখ পশু অবিক্রিত থেকে যায়।এর সাথে যুক্ত হবে এই বছরের জন্য পালনকর্তার আরো গরু,মহিষ,ছাগল ভেড়া সব মিলিয়ে প্রায় দেড কোটি।কুরবানী স্থগিত হলে অবিক্রিত এত পশু পুনরায় এক বছর পালনের খরচ মিটানো খামারীদের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার।কুরবানী অর্থনীতির সাথে যুক্ত আরো বহু মশলা,বটি-দা,পশুখাদ্য ইত্যাদি পেশাও নিঃসন্দেহে ক্ষতির মধ্যে পড়বে।

মনে রাখতে হবে,একদিকে পশু কেনা-বেচা, এরপর চামড়া কেনা-বেচাসহ ঈদ-উল-আযহা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তাহলে করনীয় কী ?

করোনার থাবা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশসহ পূরো বিশ্বই সকল ধরণেরর সতর্কতা পরিপালন করে চলেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মেনে স্থবির হয়ে পড়া দেশগুলি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে শুরু করেছে।তবে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলা কঠিন।তবুও জীবনতো আর থেমে থাকে না।অর্থনীতিকে সচল রাখার স্বার্থেই ব্যাংক কর্মীরা প্রতিদিন অফিস করছেন,গার্মেন্টসসহ সকল উৎপাদন স্থাপনায় কল চলছে,বাহিনীর লোকেরাও ব্যস্ত,ব্যস্ত আছে হাট-বাজের,দোকান ও শপিং মল।মসজিদগুলোতে নিয়ম মেনে প্রার্থনাও চলছে।স্বাস্থ্য নিয়ে যাদের কাজ,তাদের কেউ বলেননি এগুলোসহ সবকিছুতেই তালা ঝুলাতে।তবে সকলেই বলেছেন বাইরে বেরুলে সুরক্ষা লাগবে।সেটা হলো- অন্যপক্ষের মুখে মাস্ক পরা,হাত জীবাণুমুক্ত রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।এইটুকুই বিধি।কুরবানীর হাটসহ বাইরে অভিযোগ সিস্টেম নিয়ে নয়,মানা না মানা নিয়ে।
মানুন,তবে ভালো থাকুন।

আগেই বলেছি,এবার খামারীদের আশংকা বাজার তেমন জমবে না,কারণ বাজারে ক্রেতা নেই ।যে মধ্যবিত্তরা কুরবানী পশুর বড় খরিদ্দার, তারা এবার রিক্তহস্ত।সব জায়গায় হাটও বসছে না।কাজেই করোনা মহাসংকট তৈরী করবে এমন আশংকার কোন যুক্তি নেই।যারা হাট বসাবেন তারা নিশ্চিত করুন লোকদের যাতে ঘেঁষাঘেষি না হয়।তিন দফা যেন পরিপালিত হয়-ক্রেতা বিক্রেতা নির্বিশেষে।

দ্বিতীয়তঃ যাদেরকে জবেহ,কাটাকুটি ও বানানোর কাজে লাগানো হবে তাদের পূরো দেহ জীবাণুমুক্ত করে নেয়া যেতে পারে।এটি অবাস্তব কিছু নয়।আমাদের দেশের বড় বড় ফার্মিং গুলোতে যে কোন বহিরাগত প্রবেশে এই ব্যবস্থা আছে।তাদের পরিধেয় বস্ত্র ও উপকরণগুলোও জীবাণুমুক্ত করে নিন।

তৃতীয়তঃকাজের পূরো সময় মুখে মাস্ক থাকতে হবে।চা বিড়ি বন্ধ থাকবে।এই সময়ে বাইরে তৃতীয় কারো সাথে সাক্ষাৎও নিষিদ্ধ করুন।কাজ শেষ হবার পর পূরো এরিয়া নিজ দায়িত্বে জীবাণুমুক্ত করে নিন।

অনেকে এ দাবি তুলছেন যে, বিশাল গরুর হাট না বসিয়ে অনলাইনে পশু কেনাবেচা করা যেতে পারে।কিন্ত আমাদের দেশের বাস্তবতায় এটি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটি এখনও শহর থেকে শহরতলী ও গ্রাম-পল্লীতে সেভাবে বিকশিত হয়নি। গ্রামের মানুষ অনলাইনে কেনাবেচার বিষয় ও পদ্ধতি সেভাবে এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। এ পদ্ধতিতে কেনাবেচা অনেকটাই কঠিন হয়ে যাবে।

পরিশেষে আবার কুরআনের একটি আয়াত স্মরণ করি,মূলতঃ কুরবানী করার সময় আপনি আমি সবাই তা তেলাওয়াতও করি।
‎قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِي.
‘‘নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য’’
(সূরা আনআমঃ১৬২)

আসুন, আমরা স্বাস্থ্য বিধি মেনে আল্লাহকে সন্তষ্ট করার নিয়তে এবারের কুরবানীতে শামিল হই।ইনশাআল্লাহ তিনি আমাদের কবুল করবেন।

প্রথম পর্ব- করোনা পরিস্থিতিতে কুরবানীঃ নিজস্ব চিন্তা ভাবনা (প্রথম পর্ব)

লেখকঃ কলামিস্ট ও বিশিষ্ট ব্যাংকার

আরও পড়ুন