বেকার তারুণ‍্যের দুর্ভোগ

রাউফুল আলম

দেশের লক্ষ-লক্ষ ছেলে-মেয়ে শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির চেষ্টা করে। চাকরি খোঁজার বিষয়টা এমনিতেই মানসিক চাপের। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত‍্যাদি নানান চাপের মধ‍্য দিয়ে, দরিদ্র ও মধ‍্যবিত্ত শ্রেণীর অসংখ‍্য তরুণ-তরুণীকে একটা চাকরির জন‍্য বহু প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে হয়। একজন তরুণ যখন এমন মানসিক চাপের মধ‍্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সমাজের দায়িত্ব হলো কী করে তার পাশে দাঁড়ানো যায়। কী করে তাকে সাপোর্ট দেয়া যায়! কী করে তারুণ‍্যের এই কঠিন সময়টাকে কিছুটা সহজ করে দেয়া যায়। তাহলে এই তরুণরা যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তখন সমাজের প্রতি তাদের দায়বোধ বেড়ে যাবে। প্রতিজ্ঞাবোধটুকু আরো দৃঢ় হবে।

কিন্তু দুর্ভাগ‍্যজনক সত‍্য হলো, এই বেকার তারুণ‍্যের পাশে সমাজ কিন্তু নির্ভারতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতিগুলো তরুণদের এই মানসিক চাপকে হ্রাস না করে বরং বাড়িয়ে দেয়। যেমন, উচ্চ আবেদন ফি (এপ্লিকেশন ফি) চাকরি প্রত‍্যাশী তারুণ‍্যের জন‍্য একটা বড়ো চাপ। বছর বছর প্রতিষ্ঠানগুলো লাগামহীন ভাবে আবেদন ফি বাড়িয়ে যাচ্ছে। নিয়ম-নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীন এই বর্ধিত ফি বেকারদের জন‍্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। —এগুলো কী আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না? দুনিয়ার বহু দেশে চাকরি আবেদনের কোন ফি নেই। ইউরোপ-আমেরিকায় যতো চাকরির জন‍্য আবেদন করেছি বা ইন্টারভিউ দিয়েছি কোথাও আমাকে এপ্লিকেশন ফি দিতে হয়নি। উপরন্তু, কোন প্রতিষ্ঠান যখন আমার প্রোফাইল পছন্দ করেছে এবং ইন্টারভিউর জন‍্য ডেকেছে, তখন যাতায়ত খরচসহ আবাসন ও খাবারের যাবতীয় খরচ সে প্রতিষ্ঠান বহন করেছে। আমাদের তরুণরা তো এতকিছু আশা করেনি। এতো বেশি কিছু চায়নি। ওরা চায় আবেদন ফি সাধ‍্যের মধ‍্যে থাকুক। একজন বেকারের অর্থের অভাব আছে বলেই তো চাকরি খুঁজে। তাহলে তার কাছ থেকে কেন উচ্চ ফি নেয়া হবে?

উচ্চ আবেদন ফি’র পর আসে যাতায়ত দুর্ভোগ। দেশের বহু প্রতিষ্ঠান এখনো শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম বা বিভাগীয় শহর কেন্দ্রিক পরীক্ষা আয়োজন করে। দিনাজপুর থেকে যদি কেউ ঢাকায় একটা পরীক্ষার জন‍্য আসে, তাহলে তাকে অন্তত একদিন আগে আসতে হয়। দিনাজপুর থেকে ঢাকায় যাতায়তের খরচ বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়। আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কেউ না থাকলে রাত যাপনের জন‍্য আলাদা খরচ। —এই যে ভোগান্তি, দুর্ভোগ, মানসিক চাপ এগুলো থেকে কী তাদের কোন মুক্তি নেই? দেশে আজো কী আমরা প্রত‍্যেকটা জেলা শহরে পরীক্ষাকেন্দ্র (Examination Center) গড়ে তুলতে পারি না? পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো বছর জুড়ে নানান পরীক্ষার জন‍্য ব‍্যবহৃত হবে। প্রতিটি জেলায় সম্ভব না হলেও অন্তুত একটা জোন ভিত্তিক শুরু করা যায়। শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক পরীক্ষার বিষয়টার মুক্তি দরকার। সময়ের সাথে সাথে পরীক্ষাগুলোর ধরণ বদলানো উচিত। কম্পিউটার ভিত্তিক পরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন। ইংল‍্যান্ড, সারা দুনিয়াতে আইএলটিএস পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করছে। আমেরিকা সারা দুনিয়াতে জিআরই, এসইটি ইত‍্যাদি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের এই পরীক্ষাগুলো দেয়ার জন‍্য তো কাউকে বাংলাদেশ থেকে লন্ডন কিংবা আমেরিকা যেতে হয় না। তাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তো ফাঁস হয় না। —আমরা কেন অনুরূপ পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছি না? চাকরির পদসংখ‍্যা অনুসারে ভাইভার জন‍্য প্রার্থী নির্ধারণ করা হোক। দশটা পদ থাকলে বিশ বা ত্রিশজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত ভাইভার জন‍্য রাখা হোক। একটা পদের বিপরীতে চূড়ান্তভাবে দুই-তিনজন যোগ‍্য প্রার্থীর বেশি রাখার কোন প্রয়োজন হয় না। এতে করে অন‍্যান‍্য প্রার্থীদের সময়, অর্থ ও দুর্ভোগ হ্রাস পায়। ভাইবা পরীক্ষাগুলোও শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক না করে অন‍্যান‍্য স্থানে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। অনলাইনে ভাইবা নেয়ার ব‍্যবস্থাও চালু করা উচিত।

শিক্ষাজীবন শেষ হলেই একজন তরুণের সাথে বেকার শব্দটা জুড়ে যায়। কিন্তু কেউ তো চিরদিন বেকার থাকে না। আজ নয়তো কাল চাকরি খুঁজে পায়। শুরু করে কর্মজীবন। কর্মজীবনের মধ‍্যদিয়ে তো ওরা দেশেরই সেবা করে যায়। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। দেশের জন‍্য অবদান রাখে। তাহলে, বেতনভুক একজন কর্মাচারীকে কী করে রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আরো ঘনিষ্ঠ করে আলিঙ্গন করা যায়, সেটার মধ‍্য দিয়ে কিন্তু রাষ্ট্রের দায়বোধের বিষয়টুকু ফুটে উঠে। বেকারদের পাশে দাঁড়ানোর কাজটা ঠিক তেমনই! কারণ আজকের বেকার তারুণ‍্য, কাল দেশেরই সম্পদ! তাদের মেধা, শ্রম, আগ্রহ (মটিভেশন), নেশা এই বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের সম্পদে রূপ দেয়ার জন‍্য সেরকম নীতি-নির্ধারণই প্রয়োজন!

লেখকঃ কলামিস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

(লেখাটা প্রথম আলোয় পূর্ব প্রকাশিত)

 

আরও পড়ুন