উৎসবটা ত্যাগের

রফিকুল ইসলাম

মুসলিমদের জাতীয় জীবনে বৃহৎ দুটি উৎসব – আনন্দের দিন হলো ইদ – উল ফিতর, ইদ – উল আযহা। ইদ-উল আযহা এলেই এক শ্রেনীর নাস্তিক আর ধর্মবিদ্বেষীদের ইমানী চেতনা নবায়ন হয় প্রতিবছর। তাদের মুখে অই একই বুলি হয়ে যায় গো হত্যা, পশু হত্যা।
গত ২৫ জুলাই ধর্মপ্রান পরিবারের বিশিষ্ট নাস্তিক তসলিমা নাসরিন ফেসবুকে লিখলেন ” আল্লাহ বলে যদি কিছু থাকতেনই, যিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড বানিয়েছেন, বিলিয়ন বিলিয়ন গ্রহ, নক্ষত্র বানিয়েছেন, নিজের হাতে বানিয়েছেন মানুষ, তাবৎ প্রাণীকুল, — তিনি হয়তো এখন সামনে আসতেন আমাদের, বলতেন, তোমরা জন্তু জানোয়ার মেরে খাচ্ছো খাও, কিন্তু ভাই, নট ইন মাই নেম।

যদিও উনারা ” নাস্তিকরা” প্রতিদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে যে বিফ কাবাব, ফ্রাই, রেজালা গল্পের তালে তালে দু হস্ত ব্যবহার করে উদর পূর্ণ করে তা যেন এই গ্রহের নয়। মংগল গ্রহ থেকে সোজা তাদের প্লেট হয়ে প্রবেশ করে পেটে।

সত্যিকার অর্থে আজ মুসলিমরা যেমন আমাদের ইবাদাত গুলোর তাৎপর্য আর শিক্ষা উপলব্ধি করতে একদিকে যেমন ব্যর্থ অন্যদিকে নিজেদেরকে সত্যিকারের নির্ভেজাল মুসলিম হিসেবে নিজেদের ধর্মকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতেও খুব কম অংশেই সক্ষম।

কুরবানীকে আমরা সহজেই ইংরেজিতে Sacrifice আর বাংলায় ত্যাগ বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য উৎসর্গ নামেই বুঝি।
ইসলামের সমস্ত বিধানের অন্তরালে নিহিত থাকে বিরাট শিক্ষা ও উদ্দেশ্য। কুরবানী মুসলিম সমাজকে শেখায় কিভাবে ত্যাগের মহিমায় জীবন উদ্ভাসিত করা যায়। কারণ জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমাদেরকে ত্যাগী হতে হবে সফল মানুষ হবার জন্য , স্মরনীয় হবার জন্য, সার্থক জীবনের জন্য।

চলুন, কিছু সফল মানুষের ত্যাগের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেবার চেষ্টা করি। আজ পৃথিবীতে দানবীরদের নাম আসলেই হাতেম তাঈ এর নামটা চলে আসে। উনি যদি উনার অর্জিত সম্পদ মানুষের জন্য ব্যয় না করে আমাদের মত দুহাতে বুকের সাথে আকড়ে ধরে রাখতেন তাহলে নিঃসন্দেহে এমন স্মরণীয় হতে পারতেন না।

বায়োজিদ বোস্তামীর নাম শুনে নাই এরকম মানুষ খুব কমই এ সমাজে পাওয়া যাবে। উনি উনার মায়ের সেবায় যদি রাতের ঘুম ত্যাগ করে পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে না থাকতেন তাহলে পিতামাতার সেবার কথা আসলেই বায়োজিদ বোস্তামীর নামটা শুনা যেত না। জীবনে উনি অনেক অবদান রেখেছেন কিন্তু ছোটবেলার একটি রাতের ত্যাগ তাঁকে সুপারস্টার বানিয়েছে।
আব্দুল কাদির জিলানী র. যদি সম্পদের মায়া ত্যাগ করে ডাকাতদের কাছে সত্যবাদীতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আজ বাংলাদেশের মতো হয়তো অনেক দেশেই তিনি স্কুল ও হৃদয় পাঠ্যে জায়গা করে নিয়েছেন।

আবু হুরায়রা রাঃ সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন মুহাজির ভাইগন অধিকাংশ সময় ব্যবসায়ীক কাজে বাজারে ব্যস্ত থাকেন। আনসার ভাইয়েরাও আর্থিক কারবারে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি আহলে সুফফার গরীব ব্যক্তি, ক্ষুধার্ত না হলে রাসুল সাঃ এর কাছে থাকতাম, তারা ভুলে গেলেও আমি মনে রাখতাম। একবার কথা প্রসংগে রাসুল সাঃ বললেন ” আমার কোন কিছু বলার সময় যদি কেউ তার বস্ত্র বিছিয়ে দেয় আর কথা শেষ হবার পর গুটিয়ে নেয়, তাহলে আমি যা বলব তা সবই সে নির্ভূলভাবে মনে রাখতে পারবে”। আবু হুরায়রা রাঃ বলেন ” আমি আমার গায়ের চাদর বিছিয়ে রাখলাম এবং তিনি কথা শেষ করলে আমি তা গুটিয়ে আমার বক্ষে চেপে ধরলাম। সে সময় থেকে আমি রাসুল সাঃ এর কোন কথাই ভূলিনি”। (বুখারী- ১৯০৪)
যদি হযরত আবু হুরায়রা রাঃ ক্ষুধার জ্বালা সহ্য না করে, সম্পদের মায়া ত্যাগ না করে, রাসুলুল্লাহর সাহচর্যে না থাকতেন তাহলে হয়ত এত অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করতে পারতেন না।

বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী এক ভাই কথা প্রসংগে বলছিলেন ” আমার ছোট ভাই একজন ঢাবির শিক্ষক আরেক ভাই জাপানে PhD করছে, আমি বড়, আমিও খুব ভাল ছাত্র ছিলাম, দু ভাইকে অনেক ভাল অবস্থানে নিয়ে আসব বলে আমার জীবনে অনেক কিছুই ত্যাগ করেছি, কিন্তু আমি সফল, গর্বিত”। এ রকম ত্যাগের নিদর্শন আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

সত্যিকার অর্থে মানব শিশুর সুচনা লগ্ন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন ত্যাগ। কখনো নিজের জীবনের বৃহত্তর স্বার্থে কখনো অন্যেকে সফল করার জন্য। বিশ্বাসীদের সকল ত্যাগ পার্থিব ও পরকালীন উভয় জীবনের জন্য।
আমাদেরকে ত্যাগী হতে হয় পরিবারের জন্য, ত্যাগী হতে হয় সমাজ-দেশের জন্য। একজন শিক্ষককে ত্যাগী হতে হয় ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য, একটি শিক্ষিত মনুষ্যত্ব সম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য। গবেষককে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিতে হয় মানব জাতির কল্যানের জন্য। চাষী মজুরদের কাঠ ফাটা রোদে আর তীব্র শীতেও থাকতে হয় মাঠে।
এভাবে সকল পেশায় নিয়োজিত মানুষদের প্রতিনিয়ত ত্যাগী হতে হয়।

কুরবানী একজন বাবাকে শেখায় কিভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য জীবনের সবচেয়ে প্রিয়বস্তুকে বিলিয়ে দিতে হয়। একজন সন্তানকে শেখায় রবকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের জীবনকে কিভাবে উৎসর্গ করতে হয়। আর একজন মমতা ময়ীকে শেখায় রবের নির্দেশ পালনে হতে হয় ত্যাগী, সহযোগী।

কুরবানি সত্যিই নিছক পশু কুরবানী নয়, নয় শুধু মনের পশুত্বের কুরবানী।
এ কুরবানী ত্যাগী হতে শেখায়, ভবিষ্যতের জন্য জমানো সম্পদ বানভাসি ও অভুক্ত, গৃহহীন নিঃস্ব -অসহায় মানুষের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিতে শেখায়। শেখায় সত্যের প্রতিষ্টায় জীবন বিলিয়ে দিতে, শেখায় সুখী সমৃদ্ধ পরিবার সমাজ রাষ্ট্র গঠনের জন্য নিরন্তর পথ চলা, মানবতার জন্য নির্ঘুম রাত কাটানো।

আসুন কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা গ্রহন করে হই ত্যাগী। যে ত্যাগ আমাকে আপনাকে এনে দেবে অনাবিল শান্তি।

লেখকঃ শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও পড়ুন