ইউ এনও এর উপর হামলা ও ভবিষ্যৎ অশনি সংকেত

 

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে ঢুকে যেভাবে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে, তা আমাদের যেমন বিক্ষুব্ধ করেছে, তেমনই বিস্মিত করেছে। রোমহর্ষক অঘটনটিতে আমাদের বিক্ষুব্ধ হওয়া সঙ্গত এই কারণে যে, সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় কেউ যদি তার ঘরের ভেতর নিরাপদ না থাকে, তাহলে নিরাপত্তা আছে কোথায়? এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, বুধবার রাতে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখকে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত ভেবেই হামলাকারীরা ফেলে রেখে যায়। সাতসকালে তাদের গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া না হলে প্রাণহানিও ঘটতে পারত। তাদের ওপর হামলা প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও আশঙ্কাজনক। আমরা জানি, মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদ ইউএনও। একটি উপজেলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রায় সবকিছু সরকারের পক্ষে নির্বাহ করে থাকেন তিনি। বিষয়টি কেবল দায়িত্বের গুরুভারের নয়, ভাবমূর্তিরও গুরুত্বের। এমন নজির উপজেলা পর্যায়ে অহরহই মেলে যে, ইউএনওর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেও সাধারণ মানুষকে সাহস সঞ্চয় করতে হয়। এমন একজন প্রভাবশালী অবস্থান ও ভাবমূর্তির প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন নিজের বাসভবনে মনুষ্য হামলায় মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তখন নাগরিক হিসেবে আমরা বিক্ষুব্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিস্মিত হই বৈকি। আমরা বিস্মিত এই কারণেও যে, উপজেলা প্রশাসনের আবাসিক এলাকা এমন অরক্ষিত ছিল কেন? একজন মাত্র পাহারাদার ইউএনওর বাসভবন পাহারায় থাকবেন, এটা সুবিবেচনার পরিচায়ক হতে পারে না। আমাদের মনে আছে, সর্বসাম্প্রতিক জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি উঠেছিল। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে সেই দাবির যৌক্তিতাই প্রমাণিত হলো। বিলম্বে হলেও এই হামলার পর ইউএনওদের নিরাপত্তার যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা সাধুবাদযোগ্য। এক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। মনে রাখতে হবে, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসককে এমনসব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়- যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের স্বার্থের বিপরীতে যেতে পারে। ভুলে যাওয়া চলবে না জঙ্গিবাদী প্রপঞ্চের কথাও। আমরা দেখেছি, ইউএনও ওয়াহিদা খানমও ঘোড়াঘাটের দায়িত্ব গ্রহণের পর অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, মাদক ও চোরাচালান রোধে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু তিনি ও তার পিতার ওপর হামলার নেপথ্যে কী কারণ কাজ করেছে, এখনও স্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে একাধিক সন্দেহভাজন আটক ও মূল সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত যে, হামলার অঘটনটি নিছক চুরির জন্য হতে পারে না। তার বাসভবন থেকে মূল্যবান কিছু খোয়া যায়নি বলেও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত হামলাকারী প্রমাণিত হলেও তার নেপথ্যের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে খুঁজে বের করতে হবে। আমরাও মনে করি, এই হামলা নিছক দুর্বৃত্তপনা হতে পারে না। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই নানা মাত্রায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। কিন্তু তাদের দাপট এতটা বেড়ে যাওয়ার কথা নয় যে, একজন ইউএনওর বাসভবনে ঢুকে হত্যাচেষ্টা চালাবে। তেমনটি যদি সত্যিই প্রমাণ হয়, তা হবে অশনিসংকেত। আমরা দেখতে চাইব, এই হামলার পেছনের সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখা হবে। আংশিক তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত উপসংহারে পৌঁছলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে। মনে রাখা জরুরি, এই হামলা নিছক একজন ব্যক্তি বা একটি উপজেলা প্রশাসনের ওপর নয়। এক্ষেত্রে গভীর অনুসন্ধান, সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোপক্ষভাবে দায়ীদের সবার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই। ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার তদন্ত, বিচার ও শাস্তি যদি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত না হয়, তাহলে মাঠ প্রশাসনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাবে।

 

কামরুল ইসলাম রাশেদ – সাহিত্যিকও কলামিস্ট।

আরও পড়ুন