আজ “বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস”, যেভাবে আত্মহত্যায় উদ্যত ব্যক্তিকে রক্ষা করবেন

লিনা খাতুন

“বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে আজ ১০ সেপ্টেম্বর গোটা বিশ্বে নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কথা ছিলো । কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে থমকে দাঁড়ালো সবকিছুই। এতে মানুষের যেমন কোন নিয়ন্ত্রণ নেই তেমনি করে আত্নহত্যা বিষয়টিতেও ব্যক্তির থাকে না কোন নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু অপর ব্যক্তি চাইলেই একটি জীবন কে পারে এ থেকে ফিরিয়ে আনতে,পারে প্রতিরোধ গড়তে। কিভাবে!???! হ্যা তা আমি বলছি নিচের দিকে। করোনা প্যান্ডামিক শারীরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি এটি মানসিক স্বাস্থ্যেরও ব্যাপক অবনতি ঘটাচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়তই আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে । ইতমধ্যে নিউজফিডগুলো বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া আত্নহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের কাছে তুলে ধরেছে। তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের সকলের একযোগে কিছু করনীয় আছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রাই সব আত্মহত্যা চেষ্টাকারী, প্রচেষ্টার পূর্বে কোন না কোন ভাবে কিছু কিউ বা পূর্বাভাস জানিয়ে দেয় !!!
যেমনঃ চিরকুট লিখে, ফেসবুকে পোষ্ট দেয়, লাইভ করেও চেষ্টা করছে বর্তমানে।কাউকে ফোন করে ,হাসি ঠাট্টার ছলে,গল্প লেখায় রুপক ক্যারেক্টার দিয়ে, ডাইরি লিখে ইত্যাদি ।
তখন আমার কি করনীয় , যখন আমি দেখছি বা শুনছি যে কেও একজন জীবন মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে। সেটা হতে পারে আমার কোন ফ্রেন্ড, ফ্যামিলি, প্রতিবেশী ।
ভেবে দেখার বিষয়।

আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে এর গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করছি ।
একবার আমার কাছে খুব গভীর রাতে ফোন এলো। ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না। আমার ছাত্রী, ক্লাস এইটে পড়ে। কিছু অনুমান করতে পেলাম কেননা ও মাঝে মাঝেই পড়ার ফাঁকে আমাকে বলতো ওর কিছুই ভালো লাগে না। সুইসাড নিয়ে খুব কিউরিয়াস। এই সম্পর্কিত মুভি দেখতে পছন্দ করে ও। অবশ্য হঠৎ এতো রাতে আমাকে কল করার বিষয়টি আমার মনে পড়ে গেলো, আমিই ওকে আমার নম্বর দিয়ে বলেছিলাম যে কখনো এমন মনে হলে বা খুব খারাপ লাগলে যেনো আমাকে কল করে,যদি আর কোন কাউকে না পায়। সম্ভবত সে জন্যই। অতঃপর আমাকেই এগিয়ে যেতে হলো এবং ওর সাথে কথা বলতে থাকতে হলো কিছুটা টক থেরাপির মতো। আমারও আজ ইনসমনিয়া হচ্ছে বলে ছল করলাম ওর কাছে। এভাবে করে ধীরে ধীরে ওকে কিছুটা ডাইভার্ট করতে চেষ্টা করলাম অন্যদিকে । ঠিক যেমন টাইটানিক মুভিতে জ্যাক আস্তে আস্তে রোজ কে করেছিলো। আত্নহত্যার হাত থেকে রোজ সরে গিয়েছিল, তবে এরপর পরবর্তী প্রেম কাহিনী ছিলো , যাই হউক প্রেমের গল্প পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটা উদ্দেশ্য নয় ।

অর্থাৎ মূল কথা হলো তার সাথে যে কোন মূল্যে কথা চালিয়ে যেতে হবে । তবে খুবই সার্থকতার সাথে।যেনো সে ইন্সাল্টিং বা অপমানবোধ না করে। যেমনঃ আচ্ছা আপনি আত্মহত্যা করবেন , আমি বাধা দিচ্ছি না, তবে আপনি অন্ততঃ আপনার আত্মহত্যা করার কারণটা আমাকে কি বলতে পারেন? আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব খারাপ একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু কেও একজন আপনার পাশে আছে আপনার মনের বেদনার কথাগুলি শুনবার জন্য ! আপনি নিজেকে একা ভাববেন না, আপনি একা নন, আমরা আছি আপনার সাথে। আপনি এইরকম একটি অবস্থার মাঝেও আমাকে স্মরণ করেছেন তাতে করে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। সেই সাথে আপনিও অনেক ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার মোবাইল নম্বর খুঁজে বের করে কল করেছেন। নিশ্চয়ই কিছু বলবেন বলে হয়তো মনে করেছিলেন। এইভাবে কনভেন্স করে কথা শুরু করা যেতে পারে ।

মন খারাপ, হতাশা বা বিষণ্ণতানার একটি ন্যাচার হলো এটিকে একটু সময় দিলে কিছুটা হালকা হয়। কথা বলতে থাকলে নিশ্চয়ই সে আগের থেকে শান্ত হবে । বিভিন্ন মনোবিদ বা সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলররা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন যে lets talk বা কথা চালিয়ে যেতে পারলে তার মনোযোগ কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তখন আপনি তাকে জীবনের মূল্য সম্পর্কে তুলে ধরতে চেষ্টা করুন ( যদি সে কিছুটা শান্ত হয়)। এর ফাঁকেই কাওকে ছোট করে মেসেজ পাঠিয়ে দিতে পারেন ঘটনা স্থলে আসার । সেটা হতে পারে মা- বাবা, কাছের কোন বন্ধু। নিশ্চয়ই এতক্ষণে কেও আসবে । তবে এর পর অবশ্যই দ্রুত কোন ভাল সাইকোলজিষ্ট বা কাউন্সেলর এর সরনাপন্ন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতে হবে । যিনি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবেন।

আসলে করোনাকালে আমরাতো সাবাই কম বেশি ঘরেই আছি। আশেপাশের মানুষগুলোর আবেগ অনুভূতির কথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনার অভ্যাস করতে পারি । কেউ কোন কষ্টের কথা বলতে চাইলে কখনোই অবহেলা করবো না । হয়ত সেই অবহেলায় তাকে আত্মহত্যার পথে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে ।
সুতরাং তাকে বুঝতে দিই যে কেউ না বুঝলেও আমি তাকে বুঝি খুব সহমর্মিতার সাথে । তার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনি, গলার স্বর জেনুইন বা স্বাভাবিক রেখে কথা বলি, তার জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো তার সামনে মেলে ধরি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সফলতা, অর্জন এবং তার ভিতরের সুপ্ত প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেই। এভাবেই দেখা যাবে যে আমরা আস্তে আস্তে সবাই খুব কানেক্টেড বা পাশাপাশি থাকার একটা ভালো অনুভূতি নিয়ে জীবন যাপন করতে শিখবো। জীবনের মানে এবং জীবনের প্রতিও যে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে সেটা বুঝতে পারবো।

 

লেখকঃ কলামিস্ট ও এসিস্টেন্ট কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে কর্মরত আছেন –
UN migration agency, IOM
Cox’s Bazar, Bangladesh

আরও পড়ুন