প্রসঙ্গ সুইসাইড বা আত্মহত্যাঃ টিপ অফ দ্যা আইসবার্গ

ডাঃ মৌলী আখন্দ

১০ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড সুইসাইড প্রিভেনশন ডে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। প্রশ্ন হচ্ছে, সুইসাইড এমন কি গুরুত্বপূর্ণ যা প্রতিরোধে আলাদা একটি দিবস ঘোষণা করার প্রয়োজন পড়ল?
সুরাইয়া, ১৬ বছরের এস এস সি পরীক্ষার্থী। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবার সীমিত আয়ের মধ্যেই তার বাসায় তার জন্য দুধ রাখা হয়, তাকে সেরা কোচিং সেরা টিউটর দিতে তার মা বাবা সদা উদ্গ্রীব। আজকে তার এস এস সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে। মা বাবা অধীর প্রতীক্ষায় এ প্লাসের সুসংবাদের জন্য।
না, সুরাইয়া এ প্লাস পায়নি। সে ৪.৯ পেয়েছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন সবাই খোঁজ নিচ্ছে আর মা বাবা মুখ কালো করে উত্তর দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সুরাইয়ার ওপর।
পরদিন সকালে সুরাইয়াকে পাওয়া গেল নিজের ঘরে নিষ্প্রাণ অবস্থায়। বাসায় থাকা র‍্যাট কিলারের বোতলটা পাশেই গড়াগড়ি খাচ্ছিল।
সুরাইয়ার মৃত্যু কোনো শারীরিক রোগে ভুগে হয়নি। সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় আট লক্ষ মানুষ নিজের হাতে নিজের প্রাণ হানি ঘটান এবং আরও অনেকে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে রয়ে যান পরিসংখ্যানের বাইরে। প্রতিটি আত্মহত্যা এমন এক হৃদয় বিদারক ঘটনা যা শুধু ব্যক্তিকে নয় বরং একটি পরিবার, সমাজ এবং জাতির জন্য অপূরণীয় অমোচনীয় ক্ষতির কারণ।
বাংলাদেশে ১৩-১৭ বছর বয়সী ছাত্রদের মধ্যে প্রতি একশত জন ছেলের মধ্যে চারজন এবং প্রতি একশত জন মেয়ের মধ্যে ছয়জন মেয়ে আত্মহত্যা করে থাকে।
গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মা ও তাঁর পরিবার তাঁর সম্ভাব্য শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, বাচ্চার কাঁথা, ছোট ছোট মোজা, প্র্যাম, নিজের ম্যাক্সি এসব উপহার পেয়ে থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর সম্ভাব্য মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে কোনো প্রস্তুতি থাকে না। তারা সপরিবারে গুগল সার্চ দিয়ে নবজাতকের সুন্দর নাম খুঁজতে সময় ব্যয় করেন, নীলক্ষেত ঘুরে নবজাতকের সুন্দর নামের বই কিনতে অর্থ ব্যয় করেন কিন্তু মায়ের মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে গুগলে আধা ঘন্টা সময় ব্যয় করেন না কিংবা পড়াশোনা করেন না। গর্ভাবস্থা বজায় রাখতে প্রচুর প্রোজেস্টেরন হরমোন প্রয়োজন হয়। নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সাথে সাথেই সেই প্রোজেস্টেরন কমে গিয়ে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এই দুই হরমোনের তারতম্য নতুন মায়ের মনোজগতে সুবিশাল পরিবর্তন আনে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়ে সচেতন নয়। এর ওপরে থাকে সমাজের তথাকথিত “ভালো মা” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চাপ।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি সাতজন নতুন মায়ের মধ্যে একজন পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগে থাকেন। অনেক সময় প্রথম সন্তানের পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন পুরোপুরি না কাটতেই দ্বিতীয় সন্তান গর্ভধারণের জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং ওই মায়ের মানসিক সুস্থতা আরও বেশি হুমকির মুখে পড়ে যায়। যে সব মানসিক রোগীরা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় তাদের মধ্যে যতগুলো কারণ আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে প্রথম কারণ পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন। কেন? কারণ, প্রতি একশত জনে মাত্র ১৫ জন পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগী প্রফেশনাল চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
প্রতিকারের উপায়সমূহঃ
আত্মহত্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে সামাজিক চাপে। কাজেই সামাজিক চাপ হ্রাস এবং পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করাই হতে পারে আত্মহত্যা এড়ানোর প্রথম উপায়।
এছাড়াও কীটনাশক, ধারালো অস্ত্র, দড়ি, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি প্রচলিত আত্মহত্যার উপায়সমূহ নাগালের বাইরে রাখা,
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করা,
একবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ব্যক্তির ওপর তীক্ষ্ম নজর রাখা সুইসাইড প্রতিরোধের কার্যকরী উপায় হতে পারে।
প্রতিটি সফল সুইসাইডের ঘটনা পরিসংখ্যানে আসলেও আরও অনেক ব্যর্থ আত্মহত্যার চেষ্টা পরিসংখ্যানের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এ কারণেই আমরা বলছি যে ডুবে থাকা বরফখণ্ডের শুধুমাত্র উপরিভাগটাই আমাদের কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে। সিংহভাগই থেকে যাচ্ছে চোখের আড়ালে।
লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও ডাক্তার(এম বি বি এস ও এম পিএইচ)

আরও পড়ুন