মিয়ানমার অভ্যুত্থানঃ কি ঘটছে এবং কেন ঘটছে?

এম আর রাসেল 

মিয়ানমারে গত এক মাস যাবত ঝামেলা চলছে। সামরিক বাহিনী ফ্রেবুয়ারির ১ তারিখ একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। অং সান সুচি-সহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গ্রেফতার করেছে। বিগত বছরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অং সান সূচির দল ৮০ শতাংশ ভোট পায়। সামরিক বাহিনীর এই ফলকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে অভ্যুথান ঘটায়। মিয়ানমারের জনগণ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভোক্ষ করছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৮ জন মারা গিয়েছে। জান্তা সরকার বিভোক্ষকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি করছে।

মিয়ানমারের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

মিয়ানমার বার্মা নামেও পরিচিত। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সাথে ভারত, বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমান্ত রয়েছে। দেশটিতে ৫৪ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। বেশিরভাগ বার্মা ভাষায় কথা বলে, অন্য ভাষার মানুষও রয়েছে। ইয়াঙ্গুৃন হল বৃহৎ শহর, দেশটির রাজধানী নাইপিদো। দেশটির প্রধান ধর্ম বৌদ্ধ। দেশটিতে ১৩৫ টি নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত একটি গোষ্ঠী হল রোহিঙ্গা।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমার ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বলতে গেলে তখন থেকেই দেশটিতে সামরিক শাসন চলছে। ১৯৬২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ২০১১ পর্যন্ত একচেটিয়াভাবে সামরিক শাসন চলে। এরপর অং সান সূচির সাথে সামরিক বাহিনীর সমঝোতায় দেশটি গণতন্ত্রের পথে হাটতে শুরু করে।

মায়ানমারকে কেন বার্মা বলা হয়?

ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার ১৯৮৯ সালে বার্মা নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার করে। দুটি নামই একই তবে মিয়ানমার হল বাহ্য রূপ। প্রথম দিকে ব্রিটেন সহ কিছু দেশ সামরিক শাসনের বৈধতা প্রত্যাখান করে৷ কৌশল হিসেবে মিয়ানমার নাম ব্যবহার প্রত্যাখান করে। ধীরে ধীরে মায়ানমার নামটিই প্রচলিত হয়ে উঠে। ২০১৬ সালে সুচি বলেন কি নাম ব্যবহার হচ্ছে এতে কিছু আসে যায় না।

কি ঘটছে এবং কেন ঘটছে?

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে এক বছরের জন্য জরুরী অবস্থা জারি করেছে। এতদিন ধরে সামরিক বাহিনী বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। চলতি নির্বাচনে তারা মাত্রা ২০% ভোট পেয়েছে। সামরিক বাহিনী নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে পুনরায় নির্বাচনের দাবি তুলেছিল। নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথোপযুক্ত কোনো প্রমাণ নেই।

এমতাবস্থায় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। অং সান সুচি এখন গৃহবন্দি আছেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ওয়াকিটকি রাখা, কোভিড-১৯ আইন অমান্য করে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ প্রভৃতি অভিযোগ উত্থাপন করে মামলা দায়ের হয়েছে। তিনি ভিডিও এর মাধ্যমে কোর্টে হাজির হয়েছিলেন। এছাড়া অনেক এনএলডি কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

এখন কে ক্ষমতায়?

সামরিক বাহিনীর প্রধান মিং অং হ্লাই ক্ষমতা নিয়েছেন। গণতন্ত্রের পথে মিয়ানমার যাত্রা শুরু করলেও তিনি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে টাটমাডার ক্ষমতাকেও সংহত করেছেন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের উপর সামরিক হামলা চালানোর অপরাধে তিনি আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছেন। অনেক দেশ তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে৷

অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম পাবলিক ভাষনে তিনি ক্ষমতা দখলের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সামরিক বাহিনী জনগণের পক্ষে এবং একটি সত্য ও সুষম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি কাজ করবেন। তিনি আরও বলছেন জরুরী অবস্থা শেষ হলে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনগণ জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে বিভোক্ষ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে৷ এই বিভোক্ষ তথাকথিত স্যাফ্রন বিপ্লবের চেয়েও বিশাল আকার ধারণ করেছে। ২০০৭ সালে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল তা স্যাফ্রন বিপ্লব নামে পরিচিতি পেয়েছে।

শিক্ষক, আইনজীবী, ছাত্র, ব্যাংক কর্মমর্তা সহ সর্বস্তরের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বিভোক্ষ চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনী বিভিন্ন বিধি নিষেষ জারি করেছে। কারফিউ জারি করেছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, রাবার বুলেট এবং সরাসরি গুলি করছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৮ জন মানুষ মারা গিয়েছে।

অং সান সূচি কে?

১৯৯০ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে অং সান সূচি বিশ্বে বিখ্যাত হন। ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় সামরিক বাহিনী তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল। ১৯৯১ সালে সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৫ সালের মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি জয় লাভ করে।

রোহিঙ্গাদের উপর সামরিক হামলা

রোহিঙ্গাদের উপর অমানবিক নিযার্তনের বিরুদ্ধে সুচির নীরবতা তার আন্তর্জাতিক সুনাম নষ্ট করে। মায়ানমার রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী মনে করে। এমনকি তাদের নাগরিকত্বও অস্বীকার করে। বিগত কয়েক দশক ধরে অনেক রোহিঙ্গা নির্যাতন এড়াতে দেশ থেকে পালিয়ে গেছে।

২০১৭ সালে পরিচালিত এক অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মারা যায় এবং প্রায় ৭ লক্ষ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়৷ ২০১৯ সালে সুচি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হাজির হয়ে সামরিক বাহিনীর উপর আরোপিত গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখান করেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কি?

অনেক দেশ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক পুররুদ্ধারের পথে মারাত্মক আঘাত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সামরিক কর্মকর্তাদের উপর অবরোধ দিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। নিউজিল্যান্ড সকল ধরণের উন্নয়ন সহায়তা স্থগিত করেছে। চীন জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে৷ কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন বলছে এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার৷ আসিয়ান দুইপক্ষকেই শান্ত থাকতে বলেছে।

মূলঃ বিবিসি, ভাষান্তরঃ এম আর রাসেল

 

আরও পড়ুন