মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েরা যেভাবে অবহেলিত !

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

কোনো মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপ করার টাকা যোগাড় করতে পারে না তখন বাবা মা পাগল হয়ে যায়। মা হয়তো গলার চেইনটি খুলে দেয়, বাবা হয়তো গ্রামের জমিটা, গোয়ালের গাভিটা, প্রিয় মোটরসাইকেলটা বেচে দেয়, বেচার মতো কিছু না থাকলে মোটামুটি বড়লোক আত্মীয়দের হাতে পায়ে ধরে টাকাটা যেভাবে হোক যোগাড় করে। আত্মীয়রাও ছেলের পড়া আটকে যাচ্ছে শুনলে একদিন পাশ করে চাকুরী করবে ভেবে টাকা দিতে সংকোচ করেনা।

ঠিক একই পরিবারের একটা মেয়ের বেলায় কী ঘটে? খুব আহামরি কোনো পরিবারের কথা বলছিনা, নিতান্তই মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের কথা বলছি। মেয়েটার বেলায় বাবার কোনো হুশ থাকেনা মেয়ের পরীক্ষার টাকা যে তাকেই দিতে হবে।বাবা ভাবে পরীক্ষা দিতে পারলে দিবে না দিতে পারলে নেই।এতো পড়ে কী হবে?সেই তো সুফল আরেক পরিবার ভোগ করবে! ছেলের পেছনে খরচ করা বিনিয়োগ আর মেয়ের জন্য খরচ করা অপচয়। সেই মা’ই মেয়ে কানের দুলটা বিক্রির জন্য চাইলে দিতে দিতে অভিশাপ দিবে।হতচ্ছাড়ির জন্য কানটা খালি হলো ভেবে বুক চাপড়াবে, উঠতে বসতে খোটা দিবে। এই মেয়েটার কোন আত্মীয়সজন ও এক টাকা দিয়ে মেয়েটার পড়ার ব্যবস্থা করবেনা। কারন কবে শোধ করতে পারবে টাকা, আদৌ কোনোদিন পারবে কিনা ব্যাপারটা সন্দেহজনক।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মেয়েটা তারপরেও কোনোরকমে যদি কোনোদিন উঠে দাড়ায়, শিক্ষিত হয় তখন শক্তি কমে যাওয়া বুড়ো বাবা মায়ের দায়িত্ব নিতে বাধ্য। মেয়ে পরের সংসারে থেকেও বাবা মায়ের সংসারে অক্সিজেন সরবরাহ করে যায়, বাবার চিকিৎসা ভাই বোনদের পড়ালেখা, বিয়ে শাদী, চিকিৎসা যাবতীয় কাজে সাধ্যমতো বোঝা বয়ে যায়। অসহায় সেই মেয়েটা হয়তো একদিন ভেবেছিল একদিন সবাইকে মনে করিয়ে দিবে তার সাথে কী অন্যায় হয়েছিল। কিন্ত অসহায় বাবা মা ভাই বোনদের দেখলে তার ভালোবাসাই বেশি শক্তিশালী হয়, ক্রোধ হয় স্তিমিত।
তবুও কথা থেকেই যায়। সেই পরিবারের অগ্রাধিকার পাওয়া ছেলেটা শিক্ষিত হয়েও বাবা মায়ের তেমন কোনো কাজে আসেনা। মেয়ে সন্তান কেমন আদরের তা আমাদের রাসূল (সা) শিখিয়ে গিয়েছেন নিজের কন্যাদেরকে ভালোবেসে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মেয়েরা বাবা মা সহ তাবত ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছ থেকে যে মানসিক কষ্টগুলো পায় তার আসলে কোন প্রতিষেধক হয়না।এই জন্যই এই সবরের এই কস্টের প্রতিদান একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন।ছেলেদের জান্নাত হুরদের সাথে,মেয়েদের কী সেটা সারপ্রাইজ, সেটা হয়তো অনেক বেশি অনিন্দ্য কিছুই। হযরত আসিয়া (রা) তাই তো এই দোয়াই করতেন যেন আল্লাহ জান্নাতে তার কাছাকাছি একটা ঘর বানিয়ে দেন। ঘরহীন আপনহীন নারী জাতির এরচেয়ে বড় সান্তনা হয়তো আর হয় না ।

লেখকঃ পিএইচডি গবেষক, আংকারা বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক ও সহযোগী সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.