উপলব্ধির জায়গা থেকে

সালমা তালুকদার

সেদিন পার্লারে গিয়ে দেখি, পার্লারের মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে একটা নাটক দেখছে। আমি আজকে ৭/৮ বছর টেলিভিশন দেখি না। হাতের মুঠোয় পত্রিকা, পছন্দের নাটক,সিনেমা সবই আছে। তাই বসে টেলিভিশন দেখার ধৈর্য্য,সময় কোনোটাই নেই।

মেয়েগুলো বললো,” আপা নাটকটা দারুণ! আপনি দেখেন না?” আমি বললাম, ” আমি তো টেলিভিশন দেখি না।” ওরা খুব অবাক হলো। তারপর অতি উৎসাহে নাটকের গল্পটা বর্ননা করতে থাকলো।

নাটকের নাম “শ্রিময়ী।” ঐ মুহূর্তে যে পর্বটা চলছিলো তাতে দেখাচ্ছিল, একজন নারীর স্বামী অসুস্থ বলে বাড়ীর কেউ তাকে বাইরে বের হতে দিবে না। অথচ ঐ লোক রিতীমত পাগল হয়ে গেছে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করার জন্য। লোকটির আবার বড় বড় বিবাহযোগ্য একাধিক সন্তানও আছে। কিন্তু স্বামীর ব্যাথায় ব্যথিত স্ত্রী তাকে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ী থেকে বের করে আনলো। এবং প্রেমিকার সাথে দেখা করিয়ে দিলো। মহান এই নারী তার জীবন যুদ্ধ এভাবেই করে যাচ্ছে। সে তার শ্বশুর, ছেলে মেয়ে, আত্মীয় স্বজন সবার কাছে মহান।

যাই হোক যারা এই সিরিয়ালটি দেখেন তারা বুঝে গেছেন এতক্ষনে। সেদিনের পর থেকে অনেকের কাছেই এই নাটকটি সম্পর্কে মুগ্ধতা প্রকাশ করতে দেখেছি। যারা এখনো দেখেননি তাদের অনুরোধ করবো একবার হলেও ইউটিউবে সার্চ দিয়ে নাটকটি দেখবেন। এবং একবার হলেও চিন্তা করবেন এমন নাটকে বুঁদ হয়ে থেকে আমরা আমাদের অগ্রজ মহীয়সী নারীদের অপমান করছি কিনা! বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীদের মানসিক মুক্তির কথা বলে গেছেন। সেই মানসিক মুক্তি পেতে প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়া লাগে না। শুধু ব্যক্তির ইচ্ছে এবং সময় দরকার। আমরা নারীরা কি আজো মানসিক সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি? পারিনি। পারলে পুরুষ অথবা নারী কেউই অকপটে স্বীকার করতো না,

“নারীদের কষ্টের কারণ নারীরাই।”

এমন একটা নাটক যেখানে একজন নারীকে সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে স্বামীর অন্যায়কে প্রশয় দেয়ার উদাহরণ দেয়া হয়েছে সেটা থেকে আমরা আসলে কি শিখছি! তারচেয়ে বড় কথা আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা আমরা শুধুই বসে বসে কাটাচ্ছি। যখন নাটক দেখা শেষ করি তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ি। একবারও পেছন ফিরে দেখি না কতগুলো সময় জীবন থেকে ঝড়ে পড়লো!

একটা ভালো বই। যার প্রতিটা লাইনে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমরা সেটা চোখে দেখেও যেন দেখছি না। কারণ টেলিভিশনের স্ক্রীনের দিকে তাকানো যত সহজ বই পড়া ততো সহজ না। বই পড়তে মনোযোগ লাগে, সময় লাগে, নিরিবিলি পরিবেশ লাগে। যা আমাদের একেবারেই নেই। আমরা নারীরা দাবী করি, সংসার সন্তান সামলে বই পড়তে আমরা পারি না। অথচ পাশের বাসার ভাবীর সাথে আরেকজন ভাবীর একান্ত ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করতে আমাদের সময় নষ্ট হয় না। অন্যের ঘরে কান অথবা চোখ পেতে কথা শুনতে আমাদের সময় নষ্ট হয় না।

যাই হোক, বলতে চেয়েছিলাম আমরা নারীরা আসলে নিজেদের মুক্তি চাই না। যে ছোট ছোট রিপুগুলো আমাদের মনটাকে সংকীর্ণ করে রেখেছে তা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। তাই নারীদের মধ্য থেকে হিংসা, অহংকার এই খারাপ দিকগুলো এখনো সরতে পারছে না। কারণ আমরা নিজেরাই এদের পরম আত্মীয় বানিয়ে সাথে নিয়ে ঘুরছি। অনেককেই জিজ্ঞেস করা হয় মাঝে মাঝে, “বই পড়েন কিনা।” অকপটে স্বীকার করেন তারা, “সংসার সামলে বই পড়ার সময় নেই।” অথচ তাদের মুখেই সংসারের টানাপোড়েনের জনপ্রিয় নাটক সম্পর্কে প্রশংসা শোনা যায়। ব্যাপারটা এমন যে নিজেদের জীবনে যা ঘটছে তাই নিয়েই পড়ে থাকা। ব্যাপারটা অনেকটা জাবর কাটার মত হয়ে গেলো।

একটা ভালো বই মানসিক উন্নতি ঘটাতে কতটা প্রভাব বিস্তার করে তা যদি একজন মানুষ জানতো, তাহলে সব ফেলে বইয়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকতো। জীবনটা অনেক ছোট। এই ছোট জীবনে মানসিক উন্নতিটা অনেক জরুরী। তাহলে আর শত কঠিন বিপদে ভেঙ্গে পড়তে হবে না। বইয়ের লাইনগুলো শক্তি জোগাবে। আর এ ধরনের ভাঙ্গা গড়া নাটকের কাহিনী গুলো মনটাকে কেবলই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়।

নারীদের মানসিক উন্নতি অনেক জরুরী একটা বিষয়। আর মানসিক উন্নতির জন্য চাই প্রচুর বই পড়া। বাসে, পার্কে, ঘরের কাজের অবসরে বই পড়তে হবে। একঘেয়ে মনে হলে ইউটিউব খুলে নাটক,সিনেমা দেখাই যায়। কত হাসির নাটক, গঠনমূলক নাটক ঘুরছে অনলাইনে। শুভ কামনা রইলো নারীদের জন্য।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন