অসহায় রুপা

নীলিমা শামীম

প্রতিদিন একাজ,ওকাজ  করতে করতে কেউ কাউকে সময় দেবার সুযোগ হয়ে উঠেনা তাই, সপ্তাহের শুক্রবার বিকালটা আমি মাহবুব, বাচ্চাদের সাথেই ঘুরি।আজ ইচ্ছে ছিলো বাবা অসুস্থ তাই  প্রথমে শাহ আমানত মাঝারে  পরে বাবার বাসা যাবো ফেরার পথে রেস্টুরেন্ট এ খাবার ইচ্ছা  আজ খুব তারপর ও কিছু সময় দেই আমার খুব প্রিয় অসহায়  মহিলাদের।
দুপুরে কাজের মহিলাটি মানে ছু’টা বুয়া রুপা বললো আন্টি আজ আপনার দুস্থ কল্যান সমিতিতে যামু আমি। ওকে, বলেই শেষ করলাম। কাজ শেষ করেই চলে গেলো রুপা, বাসায় রইল তানু আর হালিমা ওরা আমার বাসায় থাকে। মাহবুব কে বললাম,

-এই শুনো তুমি যাও আজ আমার যেতে মন চাইছে না। সে নির্দ্বিধায় চলে গেলো ড্রাইভার নিয়ে। বিকেলে রুপা এলো দুস্থ কল্যান সমিতিতে যাবার উদ্যেশে
রুপা, তানি,ও হালিমাকে নিয়ে বসলাম ওদের জীবন সম্মন্ধ্যে কিছু জানার ইচ্ছায়।
প্রথমে রুপা বল, তোর কি সমস্যা?
রুপা —ছোট কালে মা মারা গেছে এর পর বাবা আরেকটা বিয়া করছে তারপর বাড়ি বাড়ি কাজ করে করে বড় হয়ে বিয়া করছি এক মেডিক্যালের দারোয়ানকে। একে একে তিনটা ছেলে হইছে ।তিনটাকেই বিক্রি করছে কোলেও নিতে দেয়নায়। একদিন রাতের ডিউটি শেষ করে আসার পথে ট্রাকে এক্সিডেন্ট করছে, মেডিকেলে ভর্তি করালাম চিকিৎসা ফ্রি কিন্তু ওষুধের দাম অপারেশন
খরচ বহন করতে  নিজের একটা কিডনি বিক্রি করলাম ওর চিকিৎসা খরচ যোগাইছি কারণ সোয়ামী না বাচলে ভাত কে খাওয়াইবো! ঝিয়ের কাজ করে ওর খাওন জোগার করতে হইত একদিন শুনি—-
হাসপাতালের পাশে তার বড় বউ আছে  তার ছল বল আছে তাই আমার গুলারে বেইচ্ছা দিছে।
ওর কথা শুনে রীতিমত হতবাক হয়ে গেলাম!
-কি বলছিস এইগুলো আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না রুপা?
-দেহেন মিছা কথা কইতাছিনা একটুও, এইডাই আমাগো জীবন আপনেরা তো অহনো
মায়ের ফেডে! দুনিয়া দেখছেন সুখ আর শান্তির একদিন স্টেশনে যাইয়েন গো মামানি–+
শরীরের কাপর খুলে দেখালো কিডনির স্থান টা সার্জারি করা। তারপর বললো রোজ নাকি গাজার টাকা দিতে হয়, না হলে খুব মারধর করে রুপাকে।আমি বললাম এখন বাচ্ছা কই পাইলি রুপা কইলো এইবার বড় কষ্টে বাচ্ছাটা রাখছি প্রথম স্বামীরে ফালাইয়া অন্য একটা বিয়া করছি সে ওও গাজা খায়।  আসার সময় পাশের বাসার ভাবিরে বলি পাহারা দিতে।তবু শরীরে সহ্য হয়না মাইর খাউন আর ।
ওকে বললাম-

-তোকে আমার কাছে তানিয়া রিয়াদের মত রাখবো যদি স্বামী ছেড়ে চলে আসিস!
সেইদিন চলে গেলো রাতে খেয়ে ও খাবার নিয়ে! পরেরদিন এলোনা আর!

একদিন রক্তাক্ত অবস্থায় মাথায় কাপড় বেধে আসলো আমার বাসার  কাজে, জিজ্ঞেস
করতেই ফ্যাল ফ্যাল করে কেদে বলে-

– মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে ১০০ টাকার জন্য ।আর বেতনের হিসাব চায়।

আমি বললাম বলে দিস বেতন ৩হাজার ছুটা বুয়া  বলে দিস-

-দিনে -রাতে থাকলে ৫০০০ দিব।

রুপা বললো,

-না না বলছি ২০০০ টাকা বলছি কাজে আইলে বাচ্ছাটারে ভাবির ঘরে থুই আসি তারে ১০০ টাকা দেই তাই।

আমি বললাম,
-বিয়ে না করে হাতের কাজ শিখলে তো তোর শরির মন দুটাই কষ্ট পাইতি না।
সে রাজি  হয়ে গেলো কি করে স্বামী নামক নরপিচাস কে ছেড়ে আসবে সন্তানটা মানুষ করার আশায়। শুরু হয় সেদিন থেকে রুপার নতুন। পথ চলা শিশু সন্তান রাজীবকে মানুষ করার তাগিদে। সেদিন থেকেই আমার ছোট্ট আশ্রমে  নিজেকে জড়িয়ে সেখানকার মুল দায়িত্ব্যে আসে  রুপা বেগম বাচ্ছাদের দেখা শুনা সময় মত পড়ার তাগিদ দেয়া আর রান্না করে খাওয়ানো। বেবি আক্তার আছে মহিলাদের হাতের সেলাই ও বুননের কাজ শিখাই।

হায়রে রুপা কি করলি দুই বিয়ে করে শুধু বংশ বারাইলি সকালে চাই গাজার টাকা, বিকালে চাই ভাত,  রাত্রি কালে চায়রে সাথে  সোয়ার অজুহাত।  মাস ফুরাইলে নয় মাসে নতুন জন্ম প্রভাত।কাজ করেই যদি খাবি রুপা  বাচ্চা কেনো তবে স্বামীর
সোহাগ নাইবা নিলি দেহখানি ভালো রবে  উপদেশে ভরে না মন, মন ভরে সোহাগে, সকাল বিকাল হাড় ভাংগা খাটুনি করতে ভালো লাগে।।কিডনি বেচলি স্বামীরে বাচাইতে বাচ্ছা বেচলি ঔষধ খাইতে আজ মরলি তুই কাল কি হবে ভাবলিনারে এই দুদিনের জগতে আজো সময় আছে রুপা আর পারিনা তোর চোখের পানি দেখতে ওরে ছেড়ে আয়রে রুপা
আমি আছি সব সময় তোর সাথে।।

একদিন রুপার স্বামী আমার বাড়ির দারোয়ান ও ড্রাইভারকে বিচার দিল রুপার ঠিকানা দিতে! দুজনেই এলো সেই আবদার নিয়ে আমার দরবারে কিন্তু সাহস পেলো না!!
রুপার খোজে পাগল প্রায় হয়ে গেলো সেই আশ্রমে। রুপা জানালো তুমি কে তোমাকে চিনি না এই কথায় সে রুপাকে মারতে হাম হাম করে ঘরে ঢুকতে অন্য নারীরা বাধা দিলো! খবর পেয়ে আমি রুপাকে আইনের আশ্রয়ে পাঠালাম সেলাইমাস্টার বেবির সাথে! দুজনে গিয়ে একটা জিডি করলো ওই মাদকসেবীর নামে! তারপর আর কখনো রুপার সম্মুখীন হয়নি রুপার স্বামী! রাজীব এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে আমার নিঃড়ানিতে, রুপাও বেশ সচ্চল বুটিকের কাজ করে প্রতি সপ্তাহে নিউমার্কেট এ সেলাই ও কারুকাজ করা কাপড় ডেলিভারী দিয়ে হাত ভরা টাকা নিয়েই ফিরে বাসায়! আমাকে খুবই শ্রদ্ধা করে এটাই প্রাপ্য আমার! জীবনের অনেক সময় অনেক ফালতু কাজে ফেললেও অসহায়ত্বের
সহযোগিতা করাটা আমার কাছে আল্লাহর রহমত স্বরূপ মনে হয়!!

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন