লুপাসের জন্য ডিভোর্স যেভাবে

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

চাঁদপুর থেকে বোগদাদ বাস দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে কুমিল্লার পথে।জানলার পাশের সীটে মেয়েটি বসে ছিলো।পাশে তার বৃদ্ধ বাবযেবাবার চেহারাটা মলিন।জমেয়েটি উদাস নয়নে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।বাতাসে তার চুল উড়ছে।।বিয়ের পর বাবার বাড়ি ফেরা।সাথে সারাজীবনের সঙ্গী ও আপনজন হিসেবে তার স্বামীর থাকার কথা ছিলো।কত আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিলো।
তার বান্ধবীরা উন্মুখ হয়ে আছে তার কাছে বাসর রাতের মধুর গল্প শুনবে।।

কিন্ত মেয়েটির কোন মধুর গল্প নেই।তার গল্প আজ শুন্যতায় ভরে গেছে।।হাতে এখনো মেহেদীর রঙ,আলপনা গুলো কেমন মলিনতায় ভরে গেছে।।

বিয়ের তিনদিন পর সামিয়া( ছদ্মনাম) বাসায় ফিরছে বাবার সাথে। যেই মানুষটার হাত ধরে বাড়ি থেকে ৮০ কিমি দূরের অচেনা একটা বাড়িতে গিয়েছিলো সেই বাড়ি ও বাড়ির মানুষগুলোকে আপন করে নিবে বলে।
সেই বাড়িটাই তার হবার কথা ছিলো স্থায়ী বাড়ি।
সেই মানুষ ও সেই বাড়িকে পিছনে ফেলে ফিরে আসলো তার ছোট্ট এক জানালার সেই রুমটিতে।

বাসায় ঢুকে কারো সাথে কথা বলতে চাইলো না সামিয়া।
সামিয়ার আগমনে সবাই খুশি খুশি চেহারা নিয়ে শ্বশুরালয়ের গল্প শুনতে আসলো।
কিন্ত সামিয়া কারো সাথে কথা বলতে নারাজ।
সামিয়ার মা দরজার নক করেই যাচ্ছেন কিন্ত সে দরজা খুললোনা সারা বিকেল।।

সন্ধ্যার একটু পর নিজ রুম থেকে বের হলো সামিয়া।
তারপর মা কে বললো,তাকে কিছু খেতে দিতে।
মা তড়িঘড়ি করে নুডুলস ও চা নিয়ে দিলেন সামিয়াকে।
সে নুডুলস খেয়ে চা খেতে খেতে তার বাবাকে বললো,বাবা কষ্ট পেওনা।
আমার এই বিয়ে টিকবেনা।
সে বলেছে, ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিবে।

সামিয়ার মা চিৎকার দিয়ে বললাম,কি বলিস তুই এগুলো?
সামিয়া শান্তভাবে বললো, যা হতে যাচ্ছে তাই বলছি।
তুমি তো পাগল হইছিলা বিয়ে দিতে?
এখন বিয়ের স্বাদ মিটলো?

সামিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,বাবা আমার না বড় বোন আছে,না বড় ভাই আছে।
আমাদের তিন বোনকে তুমি মানুষ করার জন্য নিরন্তর কষ্ট করে যাচ্ছো সারাজীবন।
এতগুলো টাকা খরচ করে বিয়ে দিলে কিন্ত তুমি একটা ভুল করেছো তা হলো আমার রোগটা নিয়ে তাদের সাথে আগেই কথা বলা দরকার ছিলো।
আমি এসএলই বা সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমেটোসাসে ভুগছি তা জানালে কি ক্ষতি হতো বাবা।।
আমি অনেক চেয়েছি কিন্ত তোমরা না করলে তাই বলতে পারলাম না।।

বাবা, আমি যে লুপাসের জন্য করটান ট্যাবলেট খাই তার সাইড ইফেক্ট হিসেবে আমার পেটে কিছু দাগ দেখা দিয়েছিলো যাকে স্ট্রায়া বলে।।

লজ্জা করে লাভ নাই বাবা।
আমার পেটের সেই স্ট্রায়া দেখে আমার হাজবেন্ড সন্দেহ করছে আমার নাকি আগে বিয়ে ও বাচ্চা হয়েছে।
প্রেগন্যান্ট মহিলাদের পেটে এমন স্ট্রায়া বা স্ট্রেস মার্ক হয় যাকে স্ট্রায়া গ্রেভিডোরাম বলে।

আমি তাকে বুঝিয়ে বলেছি।
বলেছি তাকে ডাক্তারের সব কাগজ পত্র দিবো।
প্রয়োজনে সে একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলেও জেনে নিতে পারে।

কিন্ত সে আমাকে স্পর্শ করেনি।
আমার চরিত্র নিয়ে তার ব্যাপক সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সে বললো, সে নিশ্চিত আমার নাকি বাচ্চা হয়েছে।।
সে আমার সাথে সংসার করবেনা।
তাদের আত্মসম্মান আছে, সমাজে তার সম্মান আছে তাই সে চুপচাপ আমাকে ফিরে আসতে বললো।
বাকিটা তার অভিভাবকরা তোমার সাথে বসে ফায়সালা করবেন।।

সামিয়ার বাবা অনেক দৌড়ঝাঁপ করলেন।ছেলে পক্ষের আত্মীয়দের সাথে দেখা করলেন।
ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান দেখালেন।।
বললেন, আমার মেয়ে পবিত্র।।
পেটের এই দাগ স্টেরয়েড এর সাইড ইফেক্ট।
কিন্ত কেউ তা শুনতে চাইলো না।

বিয়ের ঠিক ৩০দিন এর মাথায় সামিয়া ডিভোর্স পেপার পেয়ে গেলো।লুপাস তার স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে গেলো।সত্য এই ঘটনাটি আমার কুমিল্লার এক ছোট বোনের সাথে ঘটেছিলো গত বছর ।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও ডাক্তার

আরও পড়ুন