মায়াবিনীদের গল্প

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

চাচা হাসতে হাসতে বললেন, এই বুড়া বেটির পেছনে পয়সা খরচ করে কি লাভ?ব্যামার তো কমে না। মরে গেলে আরেকটা বিয়ে করতাম। নতুন জোয়ান বউ আনব। বেমারি আর কত টানব??
চাচী লজ্জায় মাথা নিঁচু করে রাখছেন।
আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

চাচাকে বললাম, আপনি মরেন না কেন??আপনি মরলে চাচী আরেকজন চাচা খুঁজে নিবেন।
তখন চাচা খুব রাগত স্বরে বললো, আমি মরব কেন?
সে মরুক, তার ডায়াবেটিস কন্ট্রোল হয়না, ওজন কমেনা।

আমি বললাম, চাচা এইসব মেন্টালিটি ঠিক না।
উনি আপনার স্ত্রী। আপনাকে ৬টা বাচ্চা উপহার দিয়েছেন। আপনার সংসারের কেন্দ্র উনি। আপনার সংসারটা আগলে রেখেছেন উনি। আর আপনি মনে মনে এইসব চিন্তা করেন?

ঠিক না চাচা? ঠিক না?

আপনি মরলেও চাচী আরেকজন চাচা খুঁজে নিতে পারবেন এই চিন্তাটাও করবেন।

চাচা আমার প্রতিবাদী কথা শুনে চুপসে গেলেন।কি অদ্ভুত পুরুষ প্রজাতি আমরা।

বউ মরলে বউ পাবো। এমন কি ভাবি, আমি মরলেও বউ জামাই পাবে।??

শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ পড়ে আমার মেডিকেয়ার সেন্টারের করিডোরে দাঁড়িয়ে এক রুগীর ছেলের সাথে গল্প করছিলাম। হঠাৎ চোখ গেল রাস্তার দিকে। তাকিয়ে দেখি নাবিলা সিএনজি থেকে নামছে।
সাথে মাসির হাতে খাবারের টিফিন এর ব্যাগ।। সে দূর থেকে আমাকে দেখেই মুচকি হাসি দিল। আমি তার হেঁটে আসার দৃশ্যটা ভিডিও করলাম।

সে একদম আমার সামনে এসে কপট করে বললো, আমি পারবো না প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসতে।। প্রতিদিন ১২ কিমি পাড়ি দিয়ে আমার জন্য লাঞ্চ নিয়ে আসতো সে।
নিজে বাসায় খায়না, আমার সাথে খাবে বলে।

একদিন সকালে ঘুম ভাঙলো নাবিলার কান্নার শব্দ শুনে। আমি ছিলাম গভীর ঘুমে। সে জেগে গেছে আগে। একা একা সে আমাদের কাল্পনিক মেয়ে জুনাইরাকে খুব মিস করে কান্না শুরু করল। কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙলে জিজ্ঞেস করি, কাঁদছ কেন?
উত্তর না দিয়ে আরো ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে ছিল।
বললো, আমাদের জুনাইরা কবে আসবে?
আমি বললাম, আসবে, আল্লাহ যখন পাঠাবেন?
তারপর বলে যদি জুনাইরা না আসে, তুমি কি আরেকটা বিয়ে করবে?

আমি বললাম না, কোন দিনও না?
সে কান্না করতে করতে আমার জন্য রুটি বানালো, ডিম ভাজলো, গোসল এর জন্য গরম পানি করে দিল।

কি অদ্ভুত মায়াবী সেই দৃশ্য।
মেয়েরা মায়ার এই পৃথিবীতে নিজেদের ভুলে ভালবাসার মানুষের জন্য মায়া বিলিয়ে যেতে পারে, যেটা পুরুষরা পারেন না।

আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাদের কোল জুড়ে আমাদের নয়নের মনি বেহেশতের ফুল জুনাইরাহকে দান করে আমাদের মানব জীবন পূর্ণ করে দিলেন।

এই যে আমরা টেবিলে নাস্তাটা রেডি পাই, শীতকালে গোসলের গরম পানিটা পাই, আলমারিতে জামাকাপড় গুলো গুছানো পাই, এত এত পেতে পেতে আমরা অনেকে দিতে ভুলে যাই।

আমি আজ ভাবলাম, ব্রেকফাস্টে আমার পাউরুটি তে নাবিলা সবসময় জেলি মাখিয়ে দেয়, আমি তো কোন দিন তার পাউরুটিতে জেলি মেখে দিলাম না।
আমি যখন ঘুমে তখন সে উঠে সব রেডি করে রাখে। কোন জামা গায়ে দিয়ে যাব, ঘড়িটা, বেল্ট, মোবাইল এর চার্জ, মানিব্যাগ, চশমা সব সে গুছিয়ে চোখের সামনে রাখে। আমি কিছু ক্ষেত্রে এত আলসেমি করি, গোসলের পর টাওয়ালটা রোদে দেইনা, ভিজা টাওয়ালটা সোফায় ফেলে চলে যাই।
এমন তো হল না,নাবিলা গভীর ঘুমে,আমি উঠে তার জন্য নাস্তা বানাইছি,অন্তত ফ্রোজেন দুইটা পরটা ভেজে রাখছি।

কিছুকিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের বোধ খুব কম।
আমিও তার ব্যতিক্রম নয়।

মেয়েরা হল মায়াজাল।

আমার এক বান্ধবী একবার তার জামাই এর সাথে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে গেল প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে।।
কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ফোন দিল, আমি আর এই সংসার করব না। ওর বাচ্চাদের সে সামাল দিক।
এই অপমান আর সহ্য হয়না।
একদিন বান্ধবীর জামাই অফিস থেকে ফিরছে তাড়াতাড়ি। সবাই দুপুর এর চিকেন কারি দিয়েই ডিনার খেয়ে নিল। বান্ধবীর ইচ্ছে করছিল না চিকেন খেতে।
ফ্রিজ থেকে এক টুকরো ইলিশ মাছ ভেজে একা একা ভাত খাচ্ছে। জামাই দেখলো।
কয়েক লোকমা ভাত খাবার পর জামাই কথা শুনানো শুরু করল?
জামাই বললো, লজ্জা করে না বসে বসে ইলিশ দিয়ে ভাত গিলছো?
তোর বাপের টাকায় কিনছি নাকি মাছ?
কেমন একটা হিংসুটে আচরন করল জামাই।
বউ একা এক টুকরো ইলিশ মাছ ভাজা খাচ্ছে, সেটা তিনি সহ্য করতে পারলেন না।
বান্ধবী না খেয়ে চুপ করে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
চোখের জল ভাতে মিশে একাকার।
অশ্রুজলে ইলিশ টুকরো আরো নোনা হয়ে উঠল।।
আমাকে যখন বললো, যেই সংসারে এক টুকরো ইলিশ একা ভেজে খাওয়া যায়না সেটা কে কি সংসার বলে?

বান্ধবীকে অনেক বুঝিয়ে বাসায় ফিরালাম।
রাতে ফোন দিলাম, কি করছে জানার জন্য।
বললো, জামাই এর জন্য বিরিয়ানি রান্না করছে।
ইলিশ বিরিয়ানি।। এটা তার জামাই এর খুব পছন্দ।

আমি বললাম, বাহ, সুখী হও, সুখী হও, বলে ফোন রেখে দিলাম।।
ভাবলাম, মেয়েদের মন আসলেই আজব জিনিস।

রিহা, পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। প্রথমে আমার রুগী ছিলেন এলার্জিক রাইনাটিস এর। এখন বন্ধু।। ইংরেজি সাহিত্যের এই মেয়ে বিয়ের ৬ বছর পর জেনে গেছেন তার স্বামী তাকে মাতৃত্বের স্বাদ দিতে পারবেন না।
একজন মেয়ের জীবনে সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি মা হতে পারা। যেসব মেয়েরা মা হতে পারেন না সমাজ তাদের অপূর্ণ নারী মনে করেন। কারণটা যদি পুরুষ এর জন্য হয় তারপরও এই অভব্য সমাজ দায়টা মেয়েটার উপরই দিতে চায়।

আমাকে একবার ইনবক্স এ ১৩ টা বাচ্চার ছবি দিয়ে রিহা বলে, স্যার দেখুন এগুলো সব আমার জুনিয়র কাজিনদের বাচ্চা।

প্রতিটা বাচ্চা জন্ম নেয়, আমি শুনে কাঁদি।
আমার ভিতরটা হাহাকার করে উঠে, শুন্য মনে হয় নিজেকে। একা একা এই সব বাচ্চাদের ছবি দেখি।
রিহার ফ্যামিলি ওর মা হবার এই তীব্র ইচ্ছা দেখে তাকে তার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে আরেকটা বিয়ে করতে উৎসাহ দিয়েছে বারংবার।

কিন্ত রিহা যে তার স্বামীকেও ভালবাসে।
তাকেও ছাড়তে পারবে না, মা ও হতে পারবে না।
মেয়েটা বাঁচে কেমনে?

কিন্ত আমাদের মাঝে কতজন পুরুষ এই স্যাক্রিফাইসটা করবেন??
বাচ্চা না হলে মা, বাবা, বন্ধু, পরিচিতজনরা উস্কানি দিতে থাকে আরেকটা বিয়ের জন্য।।
আমরা পুরুষরাও অনেকে সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।।
কিন্ত আমাদের বুঝা দরকার ছিল মায়াবিনী নারীর মন।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও ডাক্তার

আরও পড়ুন