কল সেন্টার

মনসুর আলম

আমি যখন স্কুলে চাকুরী করতাম একবছরের জন্য স্কুলের ডিসিপ্লিনারি এবং ড্রেসকোড কমিটির সদস্য ছিলাম। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সবকিছুরই একটা ড্রেসকোড আছে – কোন অনুষ্ঠানে, কোন ধরনের পোষাক পরে যাওয়া যাবে, কর্মস্থলে কোন ধরনের পোষাক পরে যাওয়া যাবে ইত্যাদি। আমাদের টিচারদের জন্যও আলাদা ড্রেসকোড আছে, বিশেষকরে মেট্রিক পরীক্ষার ইনভিজিলেটর হিসেবে দায়ীত্ব পালনের সময় ড্রেসকোড খুবই সতর্কতার সহিত বিবেচনা করা হয়। এখানে মেট্রিক মানে বাংলাদেশের ইন্টার, এর আগে কোন পাবলিক এক্সাম নেই তবে ক্লাস ত্রি, সেভেন এবং নাইনে কিছু বিশেষ সাবজেক্ট যেমন: গণিত, ইংরেজি, ন্যাচারাল সাইন্স এগুলোর জন্য কমন পেপার ( পুরো প্রোভিন্সে একই প্রশ্নপত্র) ব্যবহার করা হয়। আমাদের কাজ হল সব শিক্ষক ড্রেসকোড মানছেন কি না সেটা পর্যবেক্ষণ করা, প্রয়োজনে ওয়ার্নিং দেওয়া এবং সরকার প্রদত্ত গাইডলাইন ফলো করা। পাশাপাশি ছাত্র/ ছাত্রীদের ইউনিফর্মের ফর্মেট এপ্রুভ করা ; জুতার রং, জুতার ধরণ, মোজা, প্যান্ট, শার্ট, মেয়েদের স্কার্ট, শীতকালীন সময়ে ওভারওল, জ্যাকেট, চুলের স্টাইল সবকিছু নির্দিষ্ট ফরমেটে নির্ধারণ করে দেওয়া এবং সে অনুযায়ী চলছে কি না সেগুলো লক্ষ্য রাখা। সবধরনের স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করে আমরা নির্দিষ্ট দোকানে দিয়ে দেই, ওরা সে অনুযায়ী ড্রেস রেডি করে রাখে ছাত্র / ছাত্রীরা সাইজ অনুযায়ী কিনে ফেলে।

পরবর্তী বছরের ড্রেস কেমন হবে? এনিয়ে আমরা মিটিং এ বসেছি। কমিটিতে আমার কো-মেম্বার বাকী দুইজনই নারী টিচার। ছেলেদের জন্য শার্ট / প্যান্ট, মেয়েদের জন্য শার্ট / স্কার্ট (স্কার্টের দৈর্ঘ্য একেবারেই কম/ হাঁটুর অনেক উপরে) এভাবেই চলে আসছে এবং আমার কো-মেম্বারদের কাছ থেকে সেই একই প্রস্তাব আসল। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা একটু ভিন্ন সমাজে, আমরা নারীদেরকে একটু রক্ষণশীল পোষাকে দেখে অভ্যস্ত। মেয়েদের শর্ট স্কার্ট মেনে নিতে আমার একটু অস্বস্তি লাগে যেখানে ছেলেদেরকে ফুল প্যান্ট দেয়া হচ্ছে। আমি একটু আপত্তি করলাম এবং ভিন্ন প্রস্তাবনা পেশ করলাম। আমার সহকর্মীরা আমাকে আরো স্টাডি করার পরামর্শ দিল। আমি ডিপার্টমেন্টাল গাইডলাইন, অন্যান্য সব স্কুলের স্পেশিফিকেশন ভিডিও সহ পর্যালোচনা করে দেখলাম মেয়েদের জন্য শর্ট স্কার্ট একটি অলিখিত আইন যা বদলাতে গেলে আমাকে পুরো সিস্টেমের সাথে যুদ্ধ করতে হবে এমনকি আদালতেও যেতে হতে পারে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাকে ‘মুসলিম’ ট্যাগ দিয়ে … বিশ্বে যা হয়, চরম মানসিক চাপে ফেলা হতে পারে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি স্পেশিফিকেশন এপ্রুভ করে সাইন করে দিলাম। নিজের জানার পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য এবিষয়ে আন্তর্জাতিক খোঁজখবর শুরু করলাম। যা দেখতে পেলাম আমার জন্য বেদনাদায়ক ছাড়া আর কিছুই নয়। কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের সবজায়গায় একই চিত্র। মেয়েদের স্কার্ট খুবই ছোট যেখানে ছেলেদের ফুল প্যান্ট। মেয়েদের শার্টের গলার কাট অনেক বড় ক্লিভ দেখা যায় যেখানে ছেলেদের ফরমাল শার্ট। এটি একটি উদাহরণ দিলাম মাত্র।

ইদানীং দুটি বিষয় খুবই আলোচিত হচ্ছে ভার্চ্যুয়াল জগতে।

-কিছুকিছু গানে নারীদের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে খুবই অশ্লীল উপমার ব্যবহার (সাম্প্রতিক গেন্দাফুল) ।

– স্বাস্থ্য বিষয়ক কল সেন্টারে ফোন করে করোনা নিয়ে কথা না বলে অশ্লীল, অপ্র‌য়োজনীয় কথা বলা। দশ লাখ কলের মধ্যে দুই লাখ কল অশ্লীল / অবান্তর। ভাবতে পারেন? এই দুর্যোগের সময় দুই লাখ (২০%) ফালতু কল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগীদের সেবা বিঘ্নিত করা সর্বোপরি নারী কর্মীদেরকে হ্যারাস করা – কতটা মানসিক বিকৃতি হলে এটা সম্ভব? খুবই অল্প পরিমাণে হলে এড়িয়ে যাওয়া যেত কিন্তু, এই বিকৃত, উন্মাদের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয় ; চাইলেও উপেক্ষা করা যায়না।

শপিংমলে, বাসে, পূঁজোর ভীড়ে, বর্ষবরণ উৎসবে ইত্যাদি নানা জায়গায় শয়তানি করে যারা নারীদের দেহ স্পর্শ করতে চান; কল সেন্টারে অহেতুক, অশ্লীল কল দিয়ে যারা মানবসেবা বিঘ্নিত করেন – তাদেরকে স্রেফ বিকৃত পশু বলা ছাড়া আর কোন উপায় আছে? পাগলা কুকুরদের যা করা উচিত এদের ক্ষেত্রে ঠিক তা’ই করতে হবে।

আমার লেখার উদ্দেশ্য সেটি নয়। আমি নতুন দুটি ডাইমেনশন উপস্থাপন করতে চাই যা ক্রিটিক্যালি বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

– বিকৃত মানসিকতার পশুদের নিয়ে কথা হয়েছে। আমার স্কুলের ইউনিফর্ম স্পেশিফিকেশন নিয়েও একটি উদাহরণ আমি দিয়েছি। এবার দেখুন ভিন্ন জিনিস :

– একটি দামী গাড়ির বিজ্ঞাপন দিবেন, সেখানে প্রায় উলঙ্গ (অর্ধেকের চেয়ে বেশি উলঙ্গ) একজন নারীর প্রয়োজনীয়তা কী? সেই নারী স্বাভাবিক পোশাক পরলে সমস্যা কোথায়? লেখার দৈর্ঘ্য ছোট রাখার জন্য বেশি উদাহরণ দিচ্ছিনা – আমাদের দেশের টেলিভিশন বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করলে দেখবেন নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যের বিজ্ঞাপনে নারীদেরকে বিকৃত করে, হেয় করে, অপ্রাস‌ঙ্গিক ছোট কাপড় পরিয়ে উপস্থাপন করা হয়। একই চিত্র দেখতে পাবেন সিনেমা, নাটক, ডেইলি এপিসোডের সিরিয়াল গুলোতে। পুরুষের পোশাক যেখানে প্রায় হিজাবের মত নারীদের পোশাক ঠিক বিপরীত এমনকি কাহিনীর চরিত্রের প্যাটার্নও একইভাবে পুরুষকে মহান করে- নারীকে করে দুষ্কৃতিকারী ( সবক্ষেত্রে নয়) । একটি অফিসের রিসিপশনিস্ট, সেক্রেটারি নারী’ই হতে হবে কেন? বিমানের ক্রু নারীদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে কেন? কল সেন্টারে কেন নারীদেরকে প্রায়োরিটি দিয়ে রাখতে হবে? নারীদেরকে যদি ক্ষমতায়ন, কর্মক্ষেত্রে বেশি অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করতে চাই তাহলে স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্রে (যেখানে পাগলা কুকুরদের অবাধ বিচরণ সীমিত) সেইসব ক্ষেত্রে প্রায়োরিটি দিয়ে তাদেরকে এম্পাওয়ার্ড করার চেষ্টা করতে অনীহা কেন? এই যে পরিকল্পিত অপমান আমরা নারীদেরকে করি ; আমরা কারা? নিজেদেরকে সভ্য, প্রগতিশীল বলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার আগে আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরী সেইসব বিকৃত রুচির পশুর সাথে আমাদের পার্থক্য কতটা? কীসের ভিত্তিতে?

– এই যে নারীদেরকে দিয়ে বিকৃত বিজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হয়, তাদেরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে নাটক সিনেমার চরিত্র নির্মাণ করা হয়, গানের কথায়, চিত্রায়নে তাদেরকে নগ্ন করা হয়, শিল্পীর তুলিতে নগ্ন করা হয় এইসব অন্যায়ের বিরোধিতা করে কাজটি বয়কট করার আগ্রহ নেই কেন? বিজ্ঞাপন কিংবা চরিত্র অপমানজনক- অপ্রাস‌ঙ্গিক আমি করবনা। গানের কথা অশ্লীল – আমি গাইবনা, নাচবনা, এত ছোট পোশাক পরবনা।

আমার যোগ্যতা আছে- আমি রিসিপনশিস্ট হবনা, অন্য পৌস্ট চাই। এই দৃঢ়তা নারীরা কেন দেখাতে পারবেননা?

চাকুরী, বিজ্ঞাপন কিংবা চরিত্র আগেই স্ক্রিপ্ট পড়ে তারপরে সিদ্ধান্ত নিবেন কাজটি আপনি করবেন কি না? আপনার চরিত্রের দৃঢ়তাই আপনার রক্ষাকবচ। কিছুকিছু পুরুষ আর কুকুরের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই – কেউ প্রশিক্ষিত, কেউ উদ্ভ্রান্ত আর কেউ লাওয়ারিশ নেড়ি কুত্তার মত।

হে নারী, আপনার অঙ্গুলি হেলনে যে পুরুষ উঠবস করে, জিহ্বা বের করে লালা ঝরায় সেই পুরুষ সিস্টেম করে আপনাকে উলঙ্গ করে নাকি প্রশ্রয় পেয়ে দুঃসাহস দেখায়? নিজের শক্তিকে জানুন, সেটি যদি না পারেন অন্তঃত নিজের দুর্বলতা জানুন। আপনার এক ইশারায় বাঘে মহিষে একঘাটে জল খেতে পারে মানুষরুপী কুকুর কোন ছাড়? আপনাকে শুধু বলতে হবে; ‘না ‘ – No means no.

লেখকঃ সাহিত্যিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশী, সাউথ আফ্রিকা
০৩/০৪/২০২০

 

আরও পড়ুন