অনুভবে মা,নারী ও উন্দাল

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

আমার একজন বন্ধু যে পেশায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি তার একটা কমেন্টে আজ বিকেলে হঠাৎ চোখ আটকে গেলো।
এক মাস লকডাউনে বাসায় বন্দি।
তাই এই একমাস রান্নাঘরে রান্না করতে করতে সে ক্লান্ত।
অভ্যাস নেই।।অভ্যস্ত নয়।
এমন হওয়ারই কথা।
কর্মজীবী নারীরা যাদের বাইরের কাজ করে ঘরে ফিরে আবার রান্না করতে হয় তাদের যন্ত্রনা বুঝি কয়জন আমরা।

তবে আমার মনটা অনুভবে আবেশিত হয়েছে অন্য জায়গায়।

আমার মায়ের চেহারা ভেসে উঠলো তখন।
রান্নাঘরে মা।
ঘেমে একাকার গরমে।
কাপড়ের আঁচলে ঘাম মুছছেন, রান্না করছেন।
এক মাস দুই মাস নয়, বছরের পর বছর।
বাবা অনেক সময় চিৎকার, চেঁচামেচি করতেন, সারাদিন রান্নাঘরে কি করেন মা।
অসুস্থ তারপর ও চিন্তা রান্না কি হবে।
জ্বরে পুড়ে যাচ্ছেন কিন্ত তারপর ও রান্না করছেন।
সেই যে আমার বাবা বিয়ে করে মা কে নিয়ে সংসার শুরু করলেন, তারপর জীবনের বেশি সময় মনে হয় রান্নাঘরেই কাটিয়ে দিলেন।

কখনো কি বিরক্ত, ক্লান্তি আসতো না?
কিন্ত দেখিনি তো।।

মাংস ছিলো মায়ের প্রিয়।
মাংস কাটাকুটি করে রান্নার পর উনার আর খেতে ইচ্ছে করতো না।।অনেকবার দেখেছি।
মনে হয় কাঁচা মাংসের ঘ্রাণটা নাকে লেগে থাকতো।

আমার মায়ের মতই অনেক মায়ের জীবন।
অনেক নারীর জীবন।
তাদের ছুটি নেই।
বিরক্তি নেই।

বাচ্চাদের স্কুল ছুটি, বাবার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে, হয়তো মা বোন কে দেখতে ইচ্ছে করে,ভাইদের সংসারে মেহমান হতে ইচ্ছে করে কিন্ত ঘরের কর্তার অফিস আছে,লোকটি কি খাবে এই চিন্তায় অনেক নারী রান্নাঘরের চারপাশেই জীবন কাটিয়ে দেন।

সবাই কে রান্না করে খাওয়ান।।সবাইকে খাওয়ানোর পর অনেকের ভাগে আর কিছুই জুটেনা এমন আমার নিজ চোখে দেখা।।

দাবদাহের জীবন নারীদের।
এখানে বিশ্রাম নেই,ভ্রমণ নেই,আনন্দ নেই।
শুধুই দিয়ে যাও, বিলিয়ে যাও মায়া সবাই।

আমরা পুরুষরা কি বুঝি?
অনেক পুরুষ ঘরে এসে চিল্লাফাল্লা করেন, বলেন কি কাজ করো সারাদিন, আরামে শুয়ে শুয়ে আমার অন্ন ধ্বংস করো।
বলেন না অস্বীকার করতে পারবেন পুরুষসমাজ?

পুরুষদের ভাবই আলাদা।।উনারা ইনকাম করেন।
টাকার গরম দেখায় নারীদের কে।

কিন্ত কখনো ভেবে দেখেছেন কি, সব কিছু এতো গোছানো কিভাবে?
আপনি হয়তো বাজার এর টাকা দিয়ে অফিসে চলে গেছেন,বাজার করা,কাটাকুটি, ধোঁয়া,রান্না করা, বাচ্চাদের সামলানো,ঘরে বৃদ্ধ মা বাবা থাকলে তাদের যত্ন ও খেয়াল রাখা,বাচ্চাকে স্কুলে, টিউশনে নিয়ে যাওয়া আনা, সব কিছুর পর উন্দালে গরমে সিদ্ধ হওয়া।
তারপরও হাসিমুখে আপনাকে দরজা খুলে দেয়,আপনি বাসায় এসে শান্তিতে তৃপ্তিতে পেটভরে খাবেন, এটা দেখে একটা প্রশান্তি পান সেই মানুষটা।
এতটুকুন ই পাওয়া।
আপনি খেয়েই শুয়ে পড়বেন,ফেসবুকে ব্যস্ত হবেন।
যেই নারীকে সব গুছাতে হয় আবার।।

সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সবার পরে ঘুমাতে যায় নারী।।

বিদেশের উদাহরণ দেই কথায় কথায়।।বিদেশে তো পুরুষরা নিজের কাজ নিজে করে।
অনেকেই নিজের রান্না নিজে করে খান।
অনেক পুরুষের ফ্যামিলি ব্রোকেন,নিজে রান্না করে বাচ্চাদের খাওয়ান।।

আমাদের দেশে আমরা পুরুষরা নবাব শ্রেণির।

নারীরা খেয়ে নয়,খাওয়াতে পেরে শান্তি পান
গত মাসে আমার মা দশদিন সিলেটে ছিলেন আমার কাছে।
এই দশদিন দেখলাম উনার রুম আর রান্নাঘরেই দৌঁড়ালেন শুধু।
ছেলেকে খাওয়াতে পারলেই, ছেলে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে এটা দেখাই সুখ একজন মায়ের কাছে।

অনেক পুরুষ আছেন, যারা ঘরের কাজে সাহায্য করেন,উনারা আবার বাইরে বন্ধুদের আড্ডায় কটুকথায় নিগৃহীত হন ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য।

নারীদের কাজের মূল্য দিতে শিখা উচিত। তাদের সাহায্য করা উচিত।
তাদের প্রতি মায়ার হাত বাড়ানো উচিত।
তাদের ও ক্লান্তি লাগে তা বুঝা উচিত।
তাদের কাজের সম্মানজনক স্বীকৃতি না দিলে জেনে রাখুন আপনি পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেননি এখনো।

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন