আমার মা আমার মহীয়সী !!!

নাসরিন সুলতানা কেয়া

পত্রিকার নামটা দেখে খুব পছন্দ হলো! মহীয়সী, আসলেই সত্যি প্রতিটা নারীই এক একজন মহীয়সী! কেউ সন্তানের কাছে, কেউ তার ভাই এর কাছে, কেউ স্বামীর কাছে! ক্ষেত্র ভেদে মেয়েদের রূপ ধরণ বদলায়! আজ আমি এমন একজনের গল্প শুনাব যে শুধু মহীয়সীই নয় সে তার গুণে অন্যনা!

চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয় আমার মার! বাবা মার বড় মেয়ে বলে দায়িত্বও অনেক বেশি! ছোট্ট চার ভাইয়ের দেখাশুনা করা, মায়ের কাজের সাহায্য করা। তার উপর পীর বংশের মেয়ে তাই বেশি পড়াশোনা করার চেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়াটাই উত্তম! বিয়ে হয়েছে এক গৃহস্থ ঘরে যাদের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, ফসলে ভরা জমি! হে আমার মা স্বামীর বাড়ি এসে যৌথ পরিবার আর স্বামীর কৃষি কাজ করতে করতেই দিন শেষ হয়! কোনদিন কাউকে তার মনের কষ্ট বলার মতো কেউ ছিল না । আমার দাদী ছিল আগের দিনের শাশুড়িরা যেমন হয় তেমন !! আমার মার খুব শখ ছিল পড়াশোনা করার কিন্তু বাবার বাড়িতে পাড়েনি দায়িত্ব আর শাসনের জন্য; আর শশুর বাড়িতে তো চিন্তা করাই দায়!!! বাড়ির মেয়েরা যখন স্কুলে যেত তখন সে চেয়ে থাকতো ওদের দিকে ওদের রেডি করিয়ে দিত, বই হাতা গুছিয়ে দিত এতেই তার আনন্দ ! সারাদিন কাজ শেষে রাতে যখন ঘুমাতে যেত তখন ফুফুদের বই চুরি করে পড়তো! এর পর পনেরো কি ষোল বছর বয়সে মা হয়ে যান! শুরু হয় তার নতুন যুদ্ধ!!!

সন্তান হওয়ার পর তার একটাই লক্ষ্য নিজের জীবনে যা পারেনি সন্তানদের দিয়ে তা পুরোন করে ছাড়বেন। পর পর সন্তান হতে লাগল আর তাদের লেখা পড়ার বয়সও হতে লাগল। পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পরই শুরু হলো মেয়েদের আর পড়াশোনা করার দরকার নেই! পরের বাড়ি চলে যাবে বরং সংসারের কাজ শিখলে অনেক কাজে আসবে! আমার মা এবার আর হাল ছাড়তে রাজি না। বাবার বাড়ি বেড়ানোর নাম করে নিয়ে যায় আপাদের আর সেখানেই রেখে আসে আমার বড় দুই বোনকে! কিন্তু যাওয়ার সময় দাদী জামাকাপড়ও বেশি দেয়নি যাতে বেশি দিন থাকতে না পারে! নানা আর মামাদেরকে মা বলে এসেছিল আমার মেয়েদের পড়াতে হবে যেমন করেই হোক! আমার মামারা আমার মার অন্ধ ভক্ত ছিল বোন বলেছে আর ভাগিনীরা কাছে থাকবে এটা তাদের জন্য আনন্দই বটে। এক কাপড়েই শুরু হলো আমার বোনদের পড়াশোনা! এদিকে বাড়ি ফিরার পরতো আমার দাদীসহ সবাই আম্মার উপর ক্ষেপা; কেন এটা করল? এমনেতেই কাজের শেষ নেই দাদী আরও বেশি করে আম্মাকে কাজ দিত আর বলতো তুমি তোমার মেয়েদের পড়াবা আর ওদের কাজগুলো কে করবে? সব তুমি একা করো!!!! উত্তরে আমার মা কিছুই বলতেন না শুধু নিরবে কাজ করতেন আর চোখের পানি ফেলতেন। শুধু দাদা আর আব্বা আমার মাকে সমর্থন করতেন তাও চুপিচুপি! দাদীর সামনে কেউ কখনো কিছু বলতে পারতো না! আস্তে আস্তে সংসার বড় হতে লাগল আর সবার অত্যাচার বাড়তে লাগল, খাওয়া, পড়া, কাজ ইত্যাদি নিয়ে । পরে এক সময়  এই যৌথ পরিবার ভেঙ্গে গেল, আমার চাচা আর আমাদের সংসার আলাদা হয়ে গেল! আমাদের পাচঁ বোন আর দুই ভাইকে নিয়ে আমাদের আলাদা সংসার!

এটা কষ্টের হলেও আমার মার জন্য সুখের কারণ ছিল, এখন আর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে কোন বাধা থাকবে না! আমার মা প্রতিদিন রাতে আমাদের গল্প শুনাতো ওমুকের ছেলে ওমুকের মেয়ে এতো ভাল রেজাল্ট করেছে! তোরা বড় হয়ে এর চেয়েও ভাল রেজাল্ট করবি! টিভিতে দেখাবে, পত্রিকায় আসবে, সাংবাদিক আসবে, সারা গ্রামের মানুষ দেখবে। তোরা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়বি যেন সবাই দেখতে আসে! অবাক হয়ে আমরা ভাইবোন মার গল্প শুনতাম! পরীক্ষার আগে বলে দিত কীভাবে লিখব, কোনটি আগে লিখব, প্রশ্ন কমন না পড়লে মন খারাপ করা যাবে না! যেটা বেশি পাড়ি সেটা দিয়ে শুরু করতে হবে! মনে মনে শুধু বলতাম আম্মা এতো কিছু জানে কি করে??? আম্মা জানি কতো পড়াশোনা করেছে!!! আমার বড় তিন ভাই বোন পড়াশোনা করেছে মামার বাড়ি থেকে ছোট্ট ভাই পড়েছে একটা মাদ্রাসায় হোস্টেলে থেকে; আর আমরা বড় দুইজন কিছু দিন বাড়িতে এর পর বাহিরে থেকে পড়াশোনা করি। শুধু আমি এস এস সি পর্যন্ত বাবা মার কাছে থেকে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেছি! আমার বাবা, মা রোদ, বৃষ্টি, ঝড় মাথায় নিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন রাত ভরে একা একা এতো কষ্ট করলেও কোন দিন আমাদের তা করতে দেয়নি! বাহিরের মানুষ দিয়ে সব কাজ করিয়েছে যদি কখনো যেতাম মা বলতো এসব কাজ তোদের জন্য না! সময় নষ্ট না করে বেশি বেশি পড়াশোনা কর যাতে তোরা বড় হলে আমার আর একাজ করতে না হয়! আমার ভাই যখন হোস্টেলে থাকত আম্মা ওর জন্য প্রতি সপ্তাহ খাবার পাঠাত আব্বাকে দিয়ে, আব্বা হোস্টেল থেকে এসে শুধু কান্না করতো আর বলতো কতো কষ্ট করে পড়াশোনা করছে আমার ছেলেটা!!! মুড়ি, চিড়া দুধ, ডিম যা যা দেওয়া যায় সব দিত! হোস্টেলের খাবার খুব খারাপ ছিল! আম্মা নামাজ পড়ে সবার জন্য আলাদা আলাদা করে দোয়া করত আমি শুনতাম আর ভাবতাম কবে আমি বড় হব আর আমার মার কষ্ট শেষ হবে????

বাড়ির লোকের সাথে সাথে গ্রামের লোকজনও আমার বাবাকে বলত তোমার মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে লাভ কি বরং জমি কিন ভবিষ্যতে লাভ হবে! আমার বাবা বলত জমি না কিনে আমার যে জমি আছে তাতে গাছ রোপন করছি এর ফল তোমরাও খেতে পারবে! আর আমার গাছে যখন ফল আসবে তখন শুধু একটা জমি কেন চাইলে গ্রামও কিনতে পারব! আব্বার এসব কথার মানে কিছুই বুঝতে পারতাম না তখন! জিজ্ঞাসা করলে বলত গাছ বড় হলেই বুঝতে পারবা এখন বুঝে কাজ নেই!! সত্যি সত্যি আস্তে আস্তে আমার বাবা, মার লাগানো গাছ বড় হতে লাগল । আমার মেজ বোন একটা গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক হলো! গ্রামের যার যখন যে সমস্যা আপার কাছে যায় আপা তার সাধ্য মতো সবাইকে সাহায্য করে! বড় ভাই বিডিআর এর চাকরি হলো সরকারি চাকরি সবাই অবাক! ছোট্ট ভাই দাখিলে ৬ষ্ট তম বোর্ড স্ট্যান্ড করে, আলেমে ৫তম এবং ফাজেল এ প্রথম স্ট্যান্ড করে! সব পত্রিকায় তাঁর ছবি আসে, প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার দেয় আর সে নিউজ বাড়িতে টিভি ভাড়া করে এনে সারা গ্রামের লোক দেখে!!! আর আমার মা গোপনে তাঁর আনন্দ অশ্রু ফেলে!!!

সে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক! আমার তিন নাম্বার বোন মাষ্টার্স শেষ করে আপার স্কুলের শিক্ষক, চার নাম্বার বোনও মাষ্টার্স শেষে করে একটা কলেজের লেকচারার, সর্বশেষ আমি থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার! এখন আমরা জানি আমার বাবার সব গাছে ফল ধরেছে সত্যি কতো হাজার হাজার মানুষ তার ফল খাচ্ছে! আমরা এটাও জানি আমার মা পড়াশোনা করেনি বললেই চলে! তবুও তার প্রায় সব ছেলে মেয়ে মাষ্টার্স পাশ! তারা শুধু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেতে পড়েনি এখন পড়ায়!!!! তাই আমার চোখে এর চেয়ে মহীয়সী নারী আর কোথায় পাব!??? ভবিষ্যতে আমি ও আমার সন্তানের কাছে এমন মহীয়সী নারী হয়েই বেচেঁ থাকতে চাই!

আমার বাবা আর বেচেঁ নেই তার বৃক্ষের ছায়া তলের শিতল বাতাস সে বেশি দিন খেতে পারেনি! শুধু মা আছেন তাদের সবার মধ্যেমনি হয়ে। দোয়া চাই তার জন্য সে যেন সুস্থ থাকে আমাদের মাঝে!

 

(লেখকের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা)

লেখকঃ সাহিত্যিক এবং থানা শিক্ষা অফিসার  

আরও পড়ুন