শাশুড়ী ভাল না মন্দ?

সুস্মিতা মিলি

আজ বছর ঘুরে আবার মা দিবস এলো।সবাই যার যার মতো মাকে নিয়ে লিখেছি।আমাদের শাশুড়ীও একজন মা।

আজ তাই আমি আমার শাশুড়ীকে নিয়ে লিখতে বসলাম।আমার শাশুড়ী যখন তার স্বামীকে হারিয়েছিলেন তখন আমার হাজবেন্ডের বয়স দুইমাস দশদিন। আটজন ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে তখন তিনি জীবনের কঠিন দুঃসময় পার করেছেন।আমি তার ছোট ছেলের বউ।
সতেরো বছর আগে বিয়ের পর শশুড়বাড়ী যখন গেলাম তখন তিনি বৃদ্ধ।আমার স্বামী বিয়ের প্রথমদিন একটা কথা আমাকে বলেছিলেন।তিনি বলেছিলেন
“আমার মা ভয়ংকর বদমেজাজি মহিলা,তুমি যদি তার খারাপ আচরন গুলো মেনে নিতে পারো, তাহলে কথা দিচ্ছি জীবন চলার পথে আমি কখনো তোমার দোষ খুঁজে বেড়াবো না।”
আমি খুবই দুষ্ট একটা মেয়ে,কিন্তু আজতক ভাল আছি আমাদের প্রথমদিনের ডিলের কারনে।
আমার বিয়ের পর থেকে শাশুড়ীমা আমার সাথেই থাকেন।তাকে আমি কতটুকু ভালোবাসি জানিনা কিন্তু তার ছেলেকেতো আমি ভালোবাসি।যে মা আমাকে তার ছেলে দিয়েছে
(আমিও তাকে তিনটা নাতি নাতনি দিয়েছি)।তার চেয়ে আমি বেশি দিয়েছি। তার সাথে খুব কঠিন হওয়া কি সম্ভব??
আমার শাশুড়ী অনেক রাগি মহিলা,আমিও কম নয়।বিয়ের পর তিনি একদিন একটা বিষয়ে আমার সাথে রাগ করছেন, তখন তার ছেলে ঘরে আসলো, তিনি মাকে হাসিমুখে বললেন
,মা একটা বিয়ে করতে আমার ৩১ বছর লাগছে,৮০ হাজার টাকা লোন হইছে,এখন বউ চলে গেলে আরেকটা বিয়ে করতে করতে আমি বুড়া হইয়া যামু।
মা বলেন বউ পাগলা ছেলে,আমি বলি মা সুহাগী পুলা।
এভাবেই কাটছে আমাদের জীবন।উনি আমার সাথেই থাকেন বেশির ভাগ সময়।এখন উনার বয়স ৯৫/৯৬।বিছানায় থাকেন।রাত্রে বিছানা ভিজিয়ে চিকন সুরে ডাকেন মাগো ও মা আমার বিছানা তো ভিজা ভিজা লাগে।ছোট বাচ্চার মতন ২/৩বার বিছানা ভিজান।মাঝে মাঝে পায়খানা করে কাপড় নষ্ট করেন।আমার প্রথমে খুব খারাপ লাগতো, কিন্ত আমার মা আমাকে সাহস দেন।বলেন “তুমরা যখন ছোট ছিলা পায়খানা করতা, তখন কি তুমরারে আমি ফালাই দিছি?”
তরকারি খেতে পারেন না,ছোট বাচ্চার মত দুধভাত কচলে খাওয়াতে হয়।প্রতিবেশিরা বলেন,যে আমার অনেক পূন্য হবে, সত্যি কথা আমি পূন্যের জন্য কিছু করিনা।আমি যাকে ভালোবাসি তাকে খুশি করার জন্য করি।
পরিশেষে বলবো আমাকে তিনি মা ডাকেন,কিন্তু মেয়ে মনে করন না।আমিও উনাকে মা ডাকি কিন্তু আমি কি উনাকে নিজের আম্মা মনে করি??
সুতরাং কাটা কাটি।উনি তার ছেলেকে ভালোবাসেন আমিও তার ছেলেকে ভালোবাসি।আর তার ছেলে দুজনকেই ভালোবাসে।ছেলেকেই দুজনকে বিশ্বাস দিতে হবে যে, ভয়ের কিছু নেই,আমি পাশে আছি।

উনি এখন আমার অভ্যাসে পরিনত হয়েছেন।উনি যেমন কোথাও গিয়ে থাকতে চাননা আমিও বছরে শুধু একবার বাপের বাড়ী যাই।ঝগড়া করার জন্য হলেও একসাথে থাকি।আল্লাহ উনাকে ভালো রাখুক।

শাশুড়ী ভাল থাকবে যদি ছেলে ভাল হয়।ভালোবাসা একতরফা হয়না গিভ এন্ড টেকের বিষয়।
মা ওল্ডহোমে যাবে কেন?কেন ছেলে এই সুযোগ দেবে তার বউকে?
মা যদি তার সকল সন্তানকে এক আঁচলের নীচে রাখতে পারেন, তাহলে মা কে কেন তার ছেলেরা বন্টন করে পালন করবে ??
প্রত্যেক ছেলে কেন মনে করেনা, মা শুধুই আমার।

[গতবছর মা দিবসের দুইএকদিন পর আমি যখন আমার শাশুড়ী মাকে নিয়ে এই লেখাটা লিখেছিলাম। তখন উনি বেঁচে ছিলেন।আমার বাসাতেই ছিলেন। আজ বছর ঘুরে আবার মা দিবস এলো। কিন্তু তিনি চলে গেছেন পরপারে। সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে দোয়া করবেন আমার শাশুড়ী মায়ের জন্য।]

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন