আম্মু

শাকিলা আক্তার পাঁপড়িঃ

ইদানীং আমরা যখন ছবি তুলি, আম্মু কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যদি বলি একটা ছবি তোলো আমাদের সাথে। ব্যস, এক কথায় রাজি হয়ে যায়।

কিন্তু আগে সে মোটেও এমন ছিল না। শত বলে কয়ে একটা ছবিও তোলা যেত না। বললেই বলতো, আরে তোরা তোল। আমার ভালো লাগে না। আমাকে টানার কি দরকার। সে মানুষটা এখন এমনভাবে কেন তাকিয়ে থাকে আমি অগোচরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করি।

১৪ বছর আগে আব্বু যখন মারা যায় কতই বা বয়স ছিল আম্মুর! ৩৪/৩৫! এরপরে সাইকোলজিক্যালি আম্মু খুব ডিস্টার্বড হয়ে যায়। আমি আর ছোট বোন কলি দীর্ঘদিন ভেবেছিলাম, আম্মু বুঝি সাইকোলজিক্যাল পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা দুবোন নিজেরা বলাবলি করতাম, শোন্ আমার মনে হয় আম্মু পাগল হয়ে যাচ্ছে।

আমরা তিনজন নিজেদের চাঁপা কষ্টগুলোর কথা কাউকে না বলে একরকম চলছিলাম তখন। ধীরে ধীরে সময় নামক পরশ পাথর আমাদের ক্ষততে তার প্রলেপ দিতে থাকে। সময়ের হাত ধরেই আঘাতে আঘাতে নিজেদের মধ্যে গুমরে মরার সেসব বিচ্ছিরি দিনগুলো আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠি আমরা।

তারপর বছর না ঘুরতেই খুব অসুস্থ আম্মুকে একদিন হাসপাতালে নেয়া হয়। সব লক্ষন দেখে ডাক্তার আমার মামা-মামীকে ডেকে নেন। জানতে চান, পরিবারে কারো ক্যান্সার ছিল? অভাগী আম্মুর মা আর স্বামী তো সেই করাল গ্রাসেরই স্বীকার। হাসপাতালে আমি সেদিন চিৎকার করে কাঁদি। ঠিকভাবে রাঁধতে না জানা আমি চোখ মুছে, হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাবার নিয়ে হাসপাতালে যাই। সাতদিন পরে বায়োপ্সির রিপোর্ট হাতে পাবার পর ডাক্তারের কাছে যাবার আগে ডিকশেনারি খুঁজে রিপোর্ট পড়তে বসি। বুঝতে পারি আল্লাহর অশেষ ইচ্ছায় সেটা নেগেটিভ এসেছে।

চবি তে চান্স পাবার পর অনেকেই বলেছে পরিবারে কোন পুরুষ মানুষ নেই। অতোদূরে মেয়েকে পড়তে দিতে হবে না। আম্মু কর্ণপাত করেনি। কুমিল্লা থেকে রাত আড়াইটায় তূর্না নিশীথা ট্রেনে করে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছে একা ভর্তি হয়ে আসবার জন্য। শুধু কি ভর্তি? অবারিত স্বাধীনতাও কি নয়!

শুধু সেবারই নয়, এর আগেও ধ্বংসাবশেষের মুখ থেকে আমায় ফিরিয়ে এনেছে আম্মু। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আব্বু ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পরে। এরমধ্যে রেজাল্টের পর এইচএসসি তে ভর্তির তোড়জোড় শুরু হয়েছে মাত্র। এরই মাঝে অনেক আত্মীয় বললো আমি যেহেতু আব্বুর ভীষণ আদরের বড় মেয়ে সেহেতু আমার বিয়ে দিয়ে আব্বুকে দেখিয়ে দেয়া হোক। কারণ তখন আব্বুর কাছে হাতে গোণা কয়েক মাস সময় আছে মাত্র।

পড়াশুনার বাইরে সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে একেবারে ছোট্ট থেকে আমার এক নিবিড় মেলবন্ধন ছিল। তার সুবাদে ক্যারিয়ার ভাবনা ছিল চরমে। আর এসব কিছু বংশানুক্রমিকভাবে আমি আব্বুর কাছ থেকেই পেয়েছি। খুব ছোট থেকে শুক্রবার সকালে আমাকে নিয়ে আব্বু খবরের কাগজ পড়তে বসতো। সেখান থেকে ছবি দেখে আঁকতে বলতো। হাতের লেখাটাও হাতে ধরে শিখিয়েছিল আব্বু। সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার ভেতরে তৈরি হওয়া স্বপ্নলোকের প্রধান কারিগর ছিল আব্বু। সেই আব্বু আত্মীয়দের অমন খোঁড়া যুক্তিকে চরম আপত্তি নিয়ে অগ্রাহ্য করবে এটাই আমাদের সহজতর ধারনা ছিল। কিন্তু জরাগ্রস্ত জীবনটা নিয়ে আবেগের কাছে হার মেনে আব্বু প্রকাশ করলো মেয়ের বিয়ে দেখা যাবার ইচ্ছে!

ঢাল হয়ে দাঁড়ালো আম্মু। বললো- জীবনের কঠিন পরীক্ষায় আমরা হুমকীর সম্মুখীন হয়েছি বলে মেয়েটাকে ভাসিয়ে দিব? তুমি চিন্তা করো না। আমি ওদের দেখে রাখবো। আম্মুর কথার ভরসায় ভর করে আব্বু চলেই গেল চিরতরে।

আম্মুর মুখে শুনেছি, আমাদের ছোটবেলায় বিটিভিতে  “ভরা নদীর বাঁকে” নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। এক বিকেলে সে অনুষ্ঠানে বিয়ের পর মেয়ের বিদায়ের আয়োজন দেখাচ্ছিল। আব্বু টিভির সামনে থেকে উঠে বারান্দায় চলে যায়। আম্মু পেছন পেছন গিয়ে দেখে আব্বু কাঁদছে। কাঁদার কারণ জানতে চাইতেই বললো- আমার মেয়েদের এভাবে বিদায় আমি কোনদিন দিতে পারবো না। তো কে দিবে? উত্তরে বলেছিল, আমি সব আয়োজন করে দিয়ে কোথাও চলে যাবো, তুমি বিদায় দিবা।

হ্যাঁ আম্মুই বিদায় দিয়েছিল। তবে জীবনের কঠিন হিসেবের কাছে হার মেনে কোন আয়োজন রেখে যেতে পারেনি আব্বু। মাসের বেতন আর যৎকিঞ্চিত সঞ্চয়ের টাকা ক্যান্সারের চিকিৎসায় খরচ হয়ে আব্বুও যখন নাই হয়ে গেল আমরা তখন আবিষ্কার করলাম পেনশানের টাকার সম্বলটুকু ছাড়া এক কানা কড়িও আমাদের অবশিষ্ট নেই। সেই সম্বল যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখে আম্মু মহা সমারোহে  আমাদের দু’বোনের বিয়ে দিয়েছে আব্বুর প্রত্যাশা মতোই।
ওপার থেকে আব্বু দেখেছে কিনা জানিনা। দেখে থাকলে হয়তো আদরের মেয়েদের বিদায়ের কষ্টে আড়ালে চোখ মুছেছে।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই যে এতো এতো কৃতজ্ঞতা বোধ এর কোনটাই কাজ করে না আম্মু সামনে থাকলে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি রাগ, অভিমান, অবহেলা বোধ হয় আম্মুকেই দেখিয়েছি ।
আমি অধম, অকৃতজ্ঞ সন্তান!

দশ বছর চলতে থাকা নিজের সংসারে যখন শুটকি দিয়ে লতি কিংবা লেবুপাতা দিয়ে ছোট মাছ রাঁধবার সময় আম্মুকে ফোন করে রেসিপি জানতে চাই আম্মু সব পদ্ধতি একে একে বলে যায় আর আমি নিশ্চুপ থাকি। নিজেকে বড় অকর্মণ্য মনে হয়।
কুমিল্লা থেকে তালের পিঠা বানিয়ে যখন ঢাকায় পাঠায়  সে পিঠা মুখে পুরে নিয়ে স্বাদের চাইতে বেশি টের পাই মনের মধ্যে কিছু একটা আলোড়ন আমার চোখ ভারী করে দিচ্ছে।

বেচারী আম্মু দিনমান ফোন দিতেই থাকে, দিতেই থাকে। বিরক্ত হয়ে অনেক সময় ফোন রিসিভই করিনা।
এখন কি করছি?
খেয়েছি কিনা?
তার নাতনী পৃথ্বী কি করে?
পৃথ্বী কথা বলবে কিনা?
পৃথ্বী কি খেয়েছে?
পৃথ্বীর বাবা কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিনে কতবার দিবো আমি? মোবাইলের ভিডিও কলে কথা শেষ হয়ে যাবার পরেও লাইন না কেটে তাকিয়েই থাকবে। আমি ধমকে ফোন রেখে দেই।

নানান অসুখে জর্জরিত হয়ে আছে আম্মু। শারীরিক নানা জটিলতায় মুষড়ে পরেছে। অসুস্থতা নিয়েও ডাক্তারের কাছে যায় না। পরে থাকে আমি নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাবার জন্য। আমি নিয়ে গেলে নাকি সাহস পায়, নইলে ভয় লাগে। স্বার্থপর সাংসারিক ব্যস্ততা আমায় ছুটি দেয় না। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে আত্মীয়রা নিয়ে যায়। বাচ্চার স্কুলের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে সবাই যখন আরাম করে আমি তখন ছুট দেই ডাক্তার পারায় আর ব্যাংকে।

মাঝে মাঝে মোবাইলের স্ক্রিনে আম্মুর নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবতে থাকি, আজ ফোন রিসিভ করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাই। অথচ একদিন হয়তো এমন সময় আসবে যখন তার সাথে একবার কথা বলার জন্য মোবাইলে আম্মু নামে সেভ করা নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়ে হাত কাঁপবে আর আমি অঝোরে কাঁদবো!

আম্মুও কি এসব ভেবেই আমরা ছবি তোলবার সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে!

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন