জনৈক কর্মজীবী মায়ের আত্মকথন

প্রতিদিন সকালবেলা বের হওয়ার সময় বুকটা ধরে আসে। বাচ্চাটা আজকে মা-কে জামা পরতে দেখে নিজেই নিজের নতুন জামাটা বের করে এনে দ্রুত পরার চেষ্টা করছিল ছোট্ট হাতে। যেহেতু তাকে-তো খালি গায়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে না, জানে সে। নতুন জামা পরা ছোট্ট বাচ্চাটাকে যখন গৃহপরিচারিকার কোলে দিয়ে বের হয়ে আসছি কচি ঠোঁট উল্টে কী যে অভিমানী দুঃখী কান্না।

সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছি আর বুকের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস আটকে রাখছি। হৃদপিন্ডের শেকড় বাকড় উপড়ে ফেলা যন্ত্রণা! কী কষ্ট! কী কষ্ট!

রিকশা বন্ধ বেশিরভাগ জায়গায়। অনেকখানি হেঁটে অনেকটা পথ রিকশায়, কাঁদা পানি পার হয়ে অফিসে এসে নিজের চেয়ারে বসতে না বসতেই অফিস সহায়ক এসে একটা চিঠি ধরিয়ে দিল। শোকজ লেটার। গতকাল একটু আগে বের হয়ে গিয়েছিলাম বলে জানা ছিল না। গত সপ্তাহে একটা রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ে জমা দিতে পারিনি। এই চিঠির যথোপযুক্ত উত্তর না দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে!! ৩/৪ টা ব্যাংকে যাওয়ার কথা, সেখান থেকে তথ্য যোগাড় করে উপযুক্ত প্রমাণক সহ রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। শহরের ৩ দিকে ৩ টা ব্যাংক। অফিস কোন গাড়ি দিবে না, ব্যক্তিগত যাতায়াত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ছিল ঝড়বৃষ্টি আর মাসের সেই বিশেষ সময়! তবে এটা নিয়ে আমি এই মুহূর্তে বিচলিত না। পুরো মনটা ছেঁয়ে আছে সকালবেলার সেই দৃশ্যটাতে। ছোট্ট দুইটা হাত, একটা নতুন জামা, অভিমানী দুটো চোখ।

বেঁচে থাকলে এই বাচ্চাটা একদিন বড় হবে, নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে, আমিও বুড়িয়ে যাবো। কিন্তু এই যে প্রতিদিনকার এই দুঃখগুলো এগুলোতে আমার জীবন আটকে থাকবে তখনো।

বলতে দ্বিধা নেই চাকরি করার জন্যই আমার রান্নাঘরে চুলা জ্বলে। শিশুর বাবার ঠিকানা আলাদা। তার কাছ থেকে কোন খরচ নেওয়ার প্রয়োজন হয়না আমাদের। তাকে নিয়ে চিন্তিত নই আমি। আমার সন্তানের দায় এবং দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য আল্লাহ্তায়ালা আমাকে দিয়েছেন এইজন্য শুকরিয়া তাঁর কাছে। আমাকে কেন্দ্র করে আরো কিছু মানুষের কিছু আয় হয় রোজ- আমার গৃহপরিচারিকা, রিকশাওয়ালা, নীচের সবজিওয়ালা, ভিক্ষুক এমন আরো কতোজন। আরো বড় বিষয়, যে দেশ আর গ্রামের বাড়িতে থাকা যে অসুস্থ মা আমাকে জন্ম দিয়েছে তাদেরকেও সেবা দিতে পারছি অল্পস্বল্প, তাদের জন্য অবদান রাখতে পারছি। আমার উপরতো তাদেরও হক আছে।

অদ্ভুত একটা কারণে কর্মজীবী নারীদের একটু বাঁকা চোখে দেখা হয়। স্পষ্ট মনে আছে কিশোরী বেলায় যখন হঠাৎ পিরিয়ড হয়ে যেতো স্কুলে, তখন দৌড়ে একজন নারী শিক্ষকের কাছেই চলে যেতাম স্যানিটারি প্যাডের জন্য। পুরো স্কুলে যদি কেবল পুরুষ শিক্ষকই থাকতো নিজের বাড়ন্ত মেয়েটিকে কতোটা নিশ্চিন্তে স্কুলে পাঠাতে পারতেন? বুকে হাত দিয়ে বলুনতো নারী শিক্ষক, নারী আয়া আছেন বলেই একটু স্বস্তি কি পান না? গাইনি বা পাইলস জাতীয় সমস্যায় এখনো তো নারী চিকিৎসক-ই খুঁজি। বিদেশে যাওয়া আসার সময় হোক হজ করেই ফেরত আসা, একজন নারী কাস্টমস কর্মকর্তা থাকেন বলেই শরীরের সংবেদনশীল স্থানগুলোতে পুরুষ কর্মকর্তার হাত পড়ে না সার্চ করার নামে। একজন হজ্বফেরত নারীকেও পুরুষ কর্মকর্তার নিকট বেপর্দা হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে একজন নারী কাস্টমস কর্মকর্তা। এই যে এতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আছেন বলেই অন্যান্য নারীদের জীবন স্বস্তির হয় তা কেউ অনুভব করে না।

আমি একজন কর্মজীবী গৃহিনী। হ্যাঁ ঠিক এই বিশেষণে পরিচিত হতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। গৃহিনী এই অর্থে কারণ একটা গৃহ আছে আমার যার দায়িত্ব ও দেখাশোনার ভার আমার। কর্মজীবী কারণ জীবিকা নির্বাহের জন্য আমি একটা কাজ করি এবং সে কাজ থেকে আমার অর্থ আয় হয়। আমার দুই বছর বয়সী সন্তান, আমি, আমার গৃহপরিচারিকা আর দেশে থাকা অসুস্থ মা এই নিয়ে আমার পরিবার।

সপ্তাহের ছুটির দুদিন দুই হাতে কাজ করি, আমরা একসাথে ঘুরতে যাই, মজা করি, খেলি কিন্তু অন্য পাঁচদিন আমার সন্তান আমাকে ছাড়াই দিনের বেশিরভাগ সময় থাকে। এই সময়টা তাকে ভীষণ মনে পড়ে, কষ্ট হয়। জানি, এভাবেই শক্তপোক্ত হয়ে আমার সন্তান একদিন বড় হবে। ছোট ছোট না পাওয়া গুলোর সাথে সমঝোতা করতে শিখবে। নেগেটিভ বিষয়গুলোর সাথে যুদ্ধ করবে নিজে নিজে। পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াবে। সকালে মায়ের ছেড়ে যাওয়াতে দুঃখ পাবে কিন্তু সন্ধ্যার ফিরে আসাটাও হবে তার জন্য বড় আনন্দের। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করাটাও শিখে নিচ্ছে সদ্য দুই বছরে পা দেওয়া এই ছোট্ট মানুষটা। অপেক্ষা, ধৈর্য্য এই মানবিক বিষয়গুলোতে অভ্যস্ত হচ্ছে। যেমন চাওয়া হয় জীবনতো তেমন হয়না সবসময়। হয় না- এই না হওয়াকেও তো adapt করতে হয় জীবনে। আমি বা আমার মতো আরো মায়েরা করছে না? ওকে-ও তো করতে হবে। জীবনতো এমন-ই।

লেখকঃ ফরিদা আখতার, কর্মজীবী মা

আরও পড়ুন
1 টি মন্তব্য
  1. সাবিহা নূর বলেছেন

    খুব ভালো আর গভীরতা ভরা লেখা। শ্রদ্ধা অনেক লেখক এর প্রতি,আর ভালোবাসা বাবুটার জন্য

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.