মায়ের হাসি যেন অমাবস্যার চাঁদ !

ফারজানা মাহবুবা

গতমাসে বড্ডা’র বয়স আটবছর হলো। অর্থাৎ আমার মা হওয়ার বয়স এখন আট বছর।এই আট বছরে কী শিখেছি কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবো,ভুলেও বাচ্চা হওয়ার আগে বাচ্চাকে আইডিয়াল ওয়েতে কীভাবে পালা যায়, কী কী করতে হবে- এসবকে ভুলেও মাথায় জায়গা দিবেন না!কোনো ধরণের বাচ্চা পালার প্ল্যান প্রোগ্রাম করবেন না।জাষ্ট নিজেকে একটা মন্ত্র পড়িয়ে নিবেন নামতার মত করে।মন্ত্রটা হলো- জাষ্ট সার্ভাইভ!আপনি নিজে প্যারেন্ট হিসেবে সার্ভাইভ করা প্লাস বাচ্চা মানুষের বাচ্চা হিসেবে সার্ভাইভ করা।দ্যাটস ইট।বাচ্চা সুস্থ আছে?চেক।দ্যাটস ইট। বাচ্চাকে আইডিয়াল বাচ্চা বানানোর যে বিদঘুটে চিন্তা মাথায় ছিলো, ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিন।

মানুষ নিজেই জানে না সে কেমন ধরণের প্যারেন্ট হবে,সেখানে সে কীভাবে চিন্তা করে সে তার বাচ্চা কেমন হবে তা ঠিক করতে পারবে?!আমার আজন্ম ধারণা ছিলো আমি খুব ফান প্যারেন্ট হবো।খুবই সিলিবিলি মা, যার কাছে মেয়েরা স্বস্থি পাবে,দুনিয়ার আবদার করবে,যে হবে তাদের মাথার উপর বটগাছ।হ্যা, বটগাছ হয়েছি ঠিকই,কিন্তু সেই বটগাছ হওয়ার প্রক্রিয়ায় কোথায় যেন আস্তে আস্তে নিজের হাসিটুকু ফেলে এসেছি।কোথায় যে ফেলে এসেছি! এখন আর একে খুঁজেও পাই না!

বড্ডার আটবছরে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি,আমি যেমন মা হবো ভেবেছিলাম তার ধারে কাছেও আমি নেই!তাই নিয়ে খুব যে মন খারাপ তা না।আমি যে সার্ভাইভ করেছি এতদূর, এতেই আমি খুশী।কিন্তু মন খারাপ হয় একটা কারণেই,দুই মেয়েকে নিয়ে বিদেশে ফার্ষ্ট জেনারেশন মা হিসেবে সার্ভাইভ করতে গিয়ে নিজের হাসিটুকু খোঁয়াতে চাইনি আমি।

একবার হোষ্টেলে পূর্নিমা রাতে খুব কাছের বান্ধবী আমাদের হলের রুমের বারান্দায় ফ্লোরে বসে দুনিয়ার আজগুবী সব খেঁজুরে আলাপের সময় জিজ্ঞেস করেছিলো, তুই যদি কখনো আলাদীনের প্রদীপ পেয়ে যাস, কী চাইবি?আমি এক সেকেন্ড দ্বিধা না করে বলেছিলাম, আম্মুর হাসি!আম্মুর হাসি আমাদের জীবনে মৃগনাভি অম্বরের চেয়েও দূর্লভ ছিলো।পাঁচ সন্তান, রাজনীতি, সংসার, স্বামী, সমাজ সব মিলিয়ে আম্মুর জীবনে কোনো হাসি ছিলো না।খুব সেনসিটিভ সন্তান ছিলাম বলেই হয়তো,নাকি মেঝো বাচ্চাগুলো এমনই হয়,আম্মুর মুখের হাসি না থাকাটা আমার টীনেজ সাইকিতে অসম্ভব গভীর প্রভাব ফেলেছিলো।খালি ভাবতাম, জীবনে নিজে কখনো মা হলে আমি আমার সন্তানদের সাথে খালি হাসবো!কারণে অকারণে হাসবো!বান্ধবীরা আমার হাসি নিয়ে কত কিছু বলতো!এ্যাশ বলতো, এত ক্যালাবি না, তোর কদুবিচির মত দাঁত দেখায় যায়!মুসানি বলতো, কদুবিচি হোক বা লাউ বিচি, তুই হাসি থামাবিনা! তোর হাসি খুব সুন্দর!তাইতেই গর্বে আর লজ্জায় ফেটে যেতাম যেন!

পাড়ার ছেলেটা যে চিরকুট লিখে পাঠিয়েছিলো ক্লাস সেভেনে, তাতে লেখা ছিলো, তোমার হাসি একদম মাধুরী দীক্ষিতের মত! আমি আমার টেবিলের সামনে একটা মাধুরী দীক্ষিতের ছবি টাঙ্গিয়ে রেখেছি,দেখলেই মনে হয় তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছো!সেই চিরকুট পেয়ে পুরাই বেহাল অবস্থা, কারণে অকারণে হাসি!ফ্রেন্ডসদের জন্য আমাকে হাসানো খুব ইজি ছিলো।হিমু কতবার বিরক্ত হয়ে ধমক দিতো আমাকে, তুই আমার সাথে যখন থাকস এত হাসবি না, মানুষ ভাববে তোর সাথে আমার কিছু । এই কথায় আমি আরো হাসতে হাসতে গড়ীয়ে পড়ে যেতাম! অথচ এত সহজ সেই হাসিকে আজকে কোথাও খুঁজে পাই না।

মেয়েদের বাবা আর দুই মেয়ের সাথে কালকে রাতে বসে “পেলে” মুভিটা দেখছিলাম।বড্ডা এক পর্যায়ে বললো, ‘মা, দেখো পেলে’র মা খালি তোমার মত টেনশান করে! শী ইজ অলওয়েজ ওরিড’!অবাক হইনি ওর কথা শুনে।এর আগেও সে অনেকবার আমাকে বলেছে, ‘মা, তুমি কখন নাইস মা হবা? তুমি সারাক্ষণ খালি বকা দাও!’

প্রত্যেকবার নিজের সাথে নিজে প্রতিজ্ঞা করি, একটু কম বকবো মেয়েটাকে।একটু কম দৌঁড়াবো মেয়েদের সামনে।একটু বেশী ফান করবো ওদেরকে নিয়ে।একটু হলেও হাসবো ওদের সাথে।কীসের কী! যে লাউ সেই কদু পর মুহুর্তেই।সবচে বড় ট্রাজেডী হলো, এই যে ঘুম থেকে উঠে ঘুমানো পর্যন্ত দৌঁড়াচ্ছি, চেঁচাচ্ছি, ক্লান্ত হচ্ছি, তারপরও আবার দৌঁড়েই যাচ্ছি, সবই কিন্তু মেয়েদের জন্যই বলতে গেলে। খুব সহজ বলা, ‘এত দৌঁড়াও কেনো, থামলেই তো পারো!’হাসি।আসলেই কী মা-রা থামতে পারে?দম বেরুতে বেরুতে নাকের ডগায় চলে আসলেও মা ঠিকই মরতে মরতে ভাবে, ফ্রীজে কী খাবার আছে? আমি মরে গেলে রাতে বা কালকে ওরা কী খাবে?বড়টার স্কুলের কাপড়গুলা ধুঁতে দিবে কে?ছোটটার ব্যাগে ওর বাবা মনে করে পানির বোতলটা দিবে তো?

মা-রা এজন্যেই মা।একবার মা হয়ে গেলে সে মেয়ের জীবনে আর থামাথামি থাকে না।সে রাতদিন মেশিনের মত চলে।কারণ সে চলে বলেই সংসার চলে।সে যেন ঠিক কেন্দ্রবিন্দু, যাকে কেন্দ্র করে সন্তান, সংসার, স্বামী, সমাজ চারপাশে যার যার জায়গায় ঠিকঠাকমত থাকে!আর সেই কেন্দ্রবিন্দু হতে হতে,মেয়েটা ভুলেই যায় সে কেমন মেয়ে ছিলো!এক পর্যায়ে গিয়ে মনে হয়, সে যেন জন্ম থেকেই মা! আজন্ম ধরে যেন সে মা’র দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে!যে মেয়েটা কথায় কথায় খিলখিল করে হাসিতে গড়িয়ে পড়তো, সেই মেয়েটা আশেপাশে হাজার মাইলের ভিতরেও কো-থা-ও নেই আর!

তাই বলছিলাম,যে আপনি, আমি নিজেরাই জানি না আমরা আসলে বাস্তবে বাচ্চা হওয়ার পরে কেমন প্যারেন্টস হবো, কী করে ভাবি ‘এমন করলে বাচ্চা অমন হবে, অমন করলে বাচ্চা এমন হবে, এটা করতে হবে! ওটা করতে হবে!’ইন রিয়েলিটি,আপনি আমি আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করলেও এক ফোঁটা নিশ্চিত করতে পারবো না বাচ্চারা আসলে বড় হয়ে কেমন হবে!

গতবছর বড্ডার পড়ালেখা নিয়ে খুব আনসেটল অবস্থায় ছিলাম।প্রাইভেটেই পড়াবো, নাকি পাবলিকে নিয়ে আসবো?ইসলামিক স্কুলেই রাখবো, নাকি মেইনস্ট্রীম স্কুলে দিবো? খালি হিসাব নিকাশ করছিলাম । কোথায় কী ধরণের স্কুলে দিলে আউটপুট কেমন হবে!তারপর নিজেই আবার রিয়েলাইজ করলাম, কী বোকা আমি!কী পাগলের মত ভাবছি অমুক জায়গায় মেয়ে পড়লে অমুক রকম হবে!আদৌ কি কেউ বলতে পারে সন্তান আসলে কেমন হবে?!

ঐ যে পরিবারটার ছেলেটা এত ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করতে করতে বড় হলো,সবাই ভাবছিলো ছেলেটা এক্সট্রাঅর্ডিনারী কিছু করবে,কোনো ধরনের কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ ছেলেটার মেন্টাল প্রবলেম দেখা দিলো!ছেলেটা এখন রিহ্যাবে।ছেলেটার মা যার সাথেই দেখা হয় তাকেই খালি বলে, একটু দু’আ করবেন ও যেন জাষ্ট স্বাভাবিক হয়ে উঠে। আর কিচ্ছু চাই না, শুধু একটু স্বাভাবিক মানুষের মত স্বাভাবিক হোক।

ঐ যে মেয়েটা,বাবা মা’র সাত ছেলের এক মেয়ে, অসম্ভব আদরে আল্লাদে বড় হওয়া মেয়েটা জিদ ধরলো তাদের দারোয়ানের ছেলেকেই সে বিয়ে করবে, নাহলে সে বিষ খাবে!মা বলে দিলো, বিষ খেয়ে মরে যা, তাও ঐ ছেলের সাথে তোকে বিয়ে দিবো না।মেয়েটা ঐ ছেলের সাথেই পালিয়ে গিয়েছিলো।লাষ্ট শুনেছিলাম পরিচিত একজন মেয়েটার জন্য সবার কাছে টাকা সাহায্য চাচ্ছে। ওর বাচ্চা হবে। কী যেন কমপ্লিকেশান। চিকিৎসায় অনেক টাকা দরকার। বাবা-মা ভাইরা ওকে ত্যাজ্য করে দিয়েছে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই।এরপর কী হয়েছিলো আর জানি না। কে যে জীবনের কোন পজিশনে গিয়ে কী করবে,কেমন হবে,কিছুই আমাদের হাতে নেই।কিচ্ছু না!

মা হওয়ার আট বছর বয়স আমার।এখনো আমি শিশু-মা!তাই ভুল চুক যাইই করেছি, নিজেই নিজেকে মাফ করে দিয়েছি।এখন থেকে তাই কয়েকটা জিনিসকে ঠিক করে নিয়েছি।যেভাবেই হোক ওদের মধ্যে বইয়ের প্রতি ভালবাসা জন্মিয়ে দেয়ার টপ প্রায়োরিটি ট্রাই করতে হবে।আর তা করতে গিয়ে নিয়ম করে রেগুলার লাইব্রেরীতে নেয়া, প্লাস নিজে আবার খেয়ে না খেয়ে বই পড়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ বাচ্চারা কান দিয়ে শুনে শিখে না, চোখ দিয়ে দেখে শিখে।আর আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় বলে, জীবনে আর কিছু থাকুক না থাকুক, সাথে যদি বই থাকে, জীবনে এট লিষ্ট সার্ভাইভ করা যায়।

যেভাবেই হোক ইসলামের জাষ্ট বেসিক রিকয়ারমেন্টসগুলো শেখানোর পাশাপাশি এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানোর ব্যবস্থা করতেই হবে।জীবনে যখন দরকার হবে তখন অন্ততঃ তার স্কিল থাকবে নিজেকে গাইড করার।আমি তাদের হাতে টুলস দিতে পারি শুধু, বাকীটা তাদের নিজেদের উপর।

মেয়ের আট বছর বয়সে নিজের সাথে নিজে এই প্রতিজ্ঞাগুলো করেছি।এই আট বছরে ফান মা হইনি, সামনেও হতে পারবো কিনা জানিনা।আমার ধারণা, ফান মা হতে না পারার অন্যতম একটা কারন হলো- নিজের কাছ থেকে নিজেরই মা হিসেবে হাই এক্সপেক্টেশান্স আর রিয়েল লাইফে তার ধারে কাছেও থাকতে না পারার ব্যার্থতা।

আট বছরের শিশু-মা হিসেবে তাই অন্যান্য সম্ভাব্য মাদেরকে পরামর্শ,মা হিসেবে নিজের উপর কোনো ধরনের এক্সপেক্টেশান্স রাখবেন না।কারন বাচ্চা হওয়ার পর মা হিসেবে জাষ্ট সার্ভাইভ করাটাই যেখানে বেশীরভাগ সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়,সেখানে প্রীপ্ল্যান প্রোগ্রাম থাকলে সেগুলো কিছুই করতে না পারার ব্যর্থতা আপনার ডিপ্রেশানে যোগ হয়ে আপনাকে আরো পাগল করে দিবে। সো, নিজেকে বলুন- জাষ্ট সার্ভাইভ!

আজকে সারাদিন ভেবে মেয়ের জন্য একটা উত্তর রেডী করেছি।কালকে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতে যেতে গাড়ীতে বলবো,আল্লাহ যখন মেয়েদেরকে বাচ্চা দেন, তখন তার এক্সচেইঞ্জে তাদের থেকে কিছুদিনের জন্য তাদের হাসি-খুশীটা ফেরত নেন। বাচ্চারা বড় হলে তখন আস্তে আস্তে সেই হাসি-খুশীটাকে ফেরত দেন।

এই মেয়ে যে বিটলা!আল্লাহই জানে উলটা কী প্রশ্ন করে বসবে!সে যাই হোক, মেয়ের আট বছর বয়সে এখন বসে বসে ভাবছি, নিজের সেই খিলখিলিয়ে গড়ীয়ে পড়ে যাওয়া কারণে অকারণে অহেতুক হাসিটাকে কীভাবে ফেরত আনা যায়!?

লেখকঃ মোটিভেশনাল লেখক, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.