কন্যা, জায়া ও জননীর কষ্টের সমাধান কোথায়?

আজিজা সুলতানা রোজী

বাজারের পাশ দিয়ে মূল রাস্তা।অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে চলছে “ সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন”।শিশু মমতা’র হার্টের প্রব্লেম।প্রচুর টাকার প্রয়োজন।দরিদ্র পিতার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব না।ইত্যাদি ইত্যাদি।একদিন শুনলাম, দুইদিন…শুনছি বেশ কিছুদিন ধরেই।বিত্তশালীদের বিত্ত আছে চিত্ত নেই, কিঞ্চিত চিত্ত আছে চিত্তশালীদের কিন্তু বিত্ত নেই।চিত্তের খরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।আর রাষ্ট্র চল্লিশ বছর পরও জনগণের চিকিৎসা সেবা দিতে অপারগ।সুতরাং শোন মাইকিং।আমি চাই মমতা দীর্ঘজীবন যাপন করুক।এটা তো শুধুই চাওয়া।সরল বিশ্বাসে যদি ধরেও নেই, সমস্ত টাকাই মমতা’র জন্য খরচ হবে, সে সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু তারপর…।আজকে মমতার বাঁচানোর জন্য এসব কিছু করা হচ্ছে। একসময় সবাই তিলে তিলে মমতাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে-এটাই বাস্তবতা।শিশু মমতা’র জন্য যে দয়ামায়া, বড় মমতার জন্য তা তো আর থাকবে না।

মমতার কথা থাক।খুব সাধারণ ঘরের একটি মেয়ে শিশুর কথা ধরি।যত্নের সাথে তাকে শিক্ষা দেবার কথা আমরা ভাবতেও পারি না।ভাল মানের স্কুল বা ইংলিশ মিডিয়ামে তার পড়ার সুযোগ হবে না।প্রাইভেট, কোচিং তো দূরের কথা, তার পিতামাতারও সময় বা যোগ্যতা নেই শিশুটির পড়াশুনায় সাহায্য করবার।বৈষম্য এখান থেকেই শুরু।কিছুদিন পর অবধারিতভাবেই চুকে যাবে লেখাপড়ার পাঠ অথবা চলবে খুড়িয়ে খুড়িয়ে, যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কি কেবল খোদাই জানেন।শিশুটির চারপাশে মিথ্যা, পরনিন্দা-পরচর্চা, ভেজাল, ঝগড়া-অকথ্য কথাবার্তা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, অমনুষত্বতা।চারিদিকে শকুনের দৃষ্টি। বাড়িতে, গাড়িতে, বেড়াতে, টিউশানিতে, গৃহকর্মীর কাছে কোথাও নিশ্চিন্ত-নিরাপদ নয়।অবক্ষয়ী সমাজের বদৌলতে, মদ-গাজা-ফেনসিডিলের ভীড়ে, মিডিয়ার কল্যাণে কিশোর বয়সের ভুল সে করতেই পারে।আত্মহত্যাও করতে পারে।অতএব এখানেই সমাপ্তি।

যদি সমাপ্তি না হয়, তাহলে পিতামাতার ঘাড়ে বোঝা।আত্মীয়-সমাজের ক্রমাগত খোঁচ-খোচানি।পাত্র কোথায়? মাথায় যৌতুকের বিশাল অংক, বিয়েতে করা চড়া সুদের ঋণ। শ্বশুরবাড়ীর শারীরিক ও মানসিক আপ্যায়নে ফাঁসের দড়ি বা আগুনের তপ্ততা। পিতামাতা ও মেয়ে সন্তানটির প্রতি লোভী ও আকাশচুম্বী প্রত্যাশী পরিবারের সীমাহীন চাপ এবং অসহনীয় অবিচার।এরপরও যদি বেঁচে থাকে, সন্তান ধারণের সময় অবহেলা, অপুষ্টি, হাতুড়ে ডাক্তার, কসাই ডাক্তার , দাই, নার্স, ক্লিনিকের দৌরাত্ম, গর্ভপাত, কন্যা সন্তান মেরে ফেলার হুমকি ইত্যাদির ধকল ত আছেই।জীবনে তালাকের ওয়ার্নিং পায়নি এমন নারী বোধ হয় বেশী নয়।তালাকপ্রাপ্তা হয়ে কিংবা স্বামীকে রোজগার করে খাওয়ানোর জন্য নামতে হবে সংগ্রামে।

যদি ধরি, মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে না।তার নিজের কষ্টের সাথে বখাটেদের উৎপাত, নিরাপত্তাহীনতা, রোজগারের চিন্তা। ক্রেতা আকর্ষণ, দালাল, দেহ-ব্যবসাসহ নানান রকম ফাঁদ থেকে মুক্তি মিললেও সারাদিনের সীমার অতিরিক্ত ক্লান্তি ও জব টিকিয়ে রাখার টেনশন থেকে তার মুক্তি নেই।আছে প্রলোভন ও ধোঁকার ছড়ানো জাল। নারী এখন সাবলম্বী।তারপরও বেঁচে থাকলে দুর্ভোগ, বস্তায় করে রাস্তায় ফেলে এসো।মমতা তোমাকে বাঁচিয়ে কি লাভ? তিল তিল করে মৃত্যুমুখী করার জন্যই আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।এত একটি খন্ডচিত্র মাত্র।

শিক্ষিত নারীর কষ্ট, অশিক্ষিত নারীর কষ্ট, গৃহিণী নারীর কষ্ট, চাকুরে নারীর কষ্ট, ধনীর দুলালীর অপ্রাপ্তি, গরীবের মেয়ের লাঞ্ছনা, শিশু মেয়ের কষ্ট, কিশোরী মেয়ের সমস্যা, যুবতীর দুখ, প্রৌড়ার হতাশা, বৃদ্ধার আকুতি যুগ যুগের বঞ্চনার ইতিহাস। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)মেয়েদের জীবন্ত কবর দেয়া থেকে উঠিয়ে এনে সর্বোচ্চ সম্মানাসনে বসিয়ে ছিলেন।সেটা অবশ্য অতীত।আবার আমরা ফিরে গেছি জাহেলী সমাজে।বর্তমানেও আমাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়-

১. সন্তান বলে-মা তুমি এসব বুঝবে না।সে ভাবে মা রান্না করবে, কোচিংয়ে নিয়ে যাবে, তার যত্ন নিবে, চাকুরি করবে এইতো।সে দেখেছে তার পিতা, দাদী, ফুপী কেউ মাকে মূল্যায়ন করেনি, সম্মান করে কথা বলেনি।সেও মাকে মূল্যায়ন করা, সম্মান করে কথা বলা শিখেনি।

২. পিতা, ভাই, বর বলে তুমি তো মেয়ে মানুষ।এসবে তোমার যাওয়া উচিত না, এসব বিষয়ে তোমার কথা বলা উচিত না, তুমি এসব বুঝবে না।মোটকথা, তুমি যতই কাজ দেখাও তুমি মেয়ে, মানুষ না। অথচ কারোরই সব বিষয়ে দক্ষতা থাকে না-এটাই সত্যি। বিষয়টা নারী-পুরুষের নয়।প্রত্যেকের কথা ও কাজে অন্যের শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।

৩. প্রতিষ্ঠানের বস, কলিগরা কখনো ঠাট্টা করে বলেন, চাকুরী ছেড়ে দিলেই তো পারেন। কখনো সিনসিয়ারিটি বা ক্ষমতায়নের দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেন। অথচ তারা কখনো ভাবেন না নারী ডাবল দায়িত্ব পালন করে চলেছে।ভবিষ্যতের নাগরিক তাদের হাতেই লালিত-পালিত হচ্ছে।তাদের সহযোগিতা মানে ছাড় দেয়া নয়, সমাজ বিনির্মাণে অংশ নেয়া, যার বিকল্প নারী ছাড়া নেই।শিশুর সুকুমারবৃত্তি কমে যাবার এও বড় কারণ।

৪. পরিবারের সমস্ত কাজ নারীকেই করতে হবে বলে পিতা, দাদী ও ফুপীর অভিমত।

৫. শরীয়ত মোতাবেক মোহরানা এবং সম্পত্তির অধিকার নিয়েও নানা কথা। ভাইরা বলবেন, সম্পত্তি নিলে বাড়িতে আর আসা হবে না।কিঞ্চিত দিয়ে তা বিক্রি করার জন্য চাপ দেয়া, সম্পত্তি পেলে তা হয়ে যায় হাসবেন্ডের অথবা পুত্রের।
আধুনিক শতাব্দী নারীর সৌন্দর্যের মুল্যায়ন করেছে, বাইরে তার কাজেরও কিছুটা স্বীকৃতি দিয়েছে।কিন্তু মানুষ হিসেবে তাকে সম্মান, শ্রদ্ধা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখনো মমতারা মৃত্যুপথযাত্রী, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।মানুষ তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।কেউ তাদের অবদমিত করেছে, কেউ ভুল পথে নামিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।তাদের জন্য ভাবার, কিছু করার কি নেই সঠিক পথে?

লেখকঃ সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.