পরিবেশ ভাবনা

আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। পুলিশ একাডেমী স্কুলে। একাডেমীর প্রিন্সিপাল তখন ডিআইজি পদের কোন অফিসার হতেন। এখন অবশ্য এডিশনাল আইজিপি সেখানকার প্রিন্সিপাল হন।

স্বাভাবিকভাবে ঐ স্কুলের সভাপতিও হন প্রিন্সিপাল মহোদয়ই। তিনি দু-তিন মাসে একবার স্কুলটি ভিজিট করতে আসতেন। আমাদের ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করতেন। খোঁজ খবর নিতেন।

একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন বড় হয়ে আমরা কে কি হতে চাই। দিদার নামে এক সহপাঠী আইসক্রীম বিক্রেতা হতে চেয়েছিলো। সাইফুল হতে চেয়েছিলো, সুইপার (ও বলেছিল “মেথড়” হবো)।

আমরা ঐ বয়সেও লজ্জায় “থ” হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ কেউ দাঁত দিয়ে জিব কামড়ে ধরেছিলাম। শিক্ষক মহোদয়, হাসি হাসি মুখ করে থাকলেও তাঁর চোখ দিয়ে আগুন বেরুচ্ছিলো। রাগের আগুন। প্রিন্সিপাল মহোদয় বের হলেই যে ছেলেটিকে অগ্নিদগ্ধ হতে হবে তা ঐ বয়সেই বুঝতে পারছিলাম।

প্রিন্সিপাল মহোদয়, একটুও রাগলেন না। অবাকও হলেন না। স্বাভাবিক গলায় বললেন, ” কেন তুমি মেথড় হতে চাও?”
সাইফুল বললো, ” আমাদের টয়লেট ভরে গেলে ওরা নোংরা পরিষ্কার করে। ওদের থাকা খুব জরুরী। ওরা না থাকলে আমাদের ঘরবাড়ি তো গন্ধে ভেসে যাবে।
সবাই বলছে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাহলে টয়লেট পরিষ্কার করবে কে! তাই আমি মেথড় হবো।”

প্রিন্সিপাল সাইফুলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে, কাঁধে দু’হাত দিয়ে ঝাঁকিয়ে তাকে আদর করতে করতে বলেছিলেন, “সাব্বাস ব্যাটা। এই তো চাই। ভিন্নভাবে ভাবতে শিখো।
তোমার টার্গেট আমার খুব ভালো লেগেছে। তবে কি জানো, টয়লেট পরিষ্কার করতে ওতো পড়ালেখা দরকার হয় না। তুমি যেহেতু পড়ার সুযোগ পাচ্ছো, তুমি আর একটু উঁচু টয়লেটের মেথড় হও। আমরা আমাদের নোংরা দিয়ে সমাজটাকে টয়লেট বানিয়ে ফেলেছি। তুমি এই সমাজের নোংরা পরিষ্কারের দায়িত্ব নিও। কি পারবে তো?”
সাইফুল কি বুঝেছিলো জানি না, মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়েছিলো।

সে ঘটনার পরের বছর। আমরা ক্লাস থ্রীতে পড়ি। একদিন স্কুলে এসেই শুনলাম, সাইফুল মারা গেছে। মারা যাওয়া বিষয়টা তখন ভালো বুঝতাম না। টিচার চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলেন, ” মারা যাওয়া মানে, সে আর তোমাদের পাশে বসবে না। তোমাদের সাথে খেলবে না। তোমাদের আর দেখা হবে না।”

আমরা টিচারদের সাথে দল বেঁধে সাইফুলের মরদেহ দেখতে গিয়েছিলাম। সাইফুল, সেই দুরন্ত সাইফুল, নির্বাক শুয়ে ছিলো। মুখটা কি ভীষণ ফর্সা! আমরা সব সময় সঠিকটা বুঝতে পারিনা। তাই রক্তশূণ্য সাদা মুখটাকে ফর্সাই ভেবেছিলাম। যে সাইফুল একটুও চুপচাপ থাকতো না, লাফালাফি ছুটোছুটি করতো সারাক্ষণ, সে আমাদেরকে কাছে পেয়েও একটুও নড়লো না। পেন্সিল দিয়ে গুঁতো দিলো না। মেয়েদের চুল ধরেও টানলো না।

আমরা টিচারের কাছে শুনেছিলাম, সাইফুলের ক্যান্সার নামে একটি অসুখ হয়েছিলো। তাতেই সে মারা যায়। সেই থেকে ক্যান্সারকে আমি ঘৃণা করতে শিখেছিলাম।

২০১৮ সাল। একটা রিপোর্টে চোখ আটকে গিয়েছিলো। সে বছর পৃথিবীতে ৯৮ লক্ষ মানুষ মারা যায় এই ক্যান্সারে। আমার কাছে মনে হয়েছিলো এক বছরে ৯৮ লক্ষ সাইফুল মারা গেলো। সেই দুরন্ত সাইফুল। আমার বন্ধু সাইফুল।

তখন ঐ রিপোর্টে ক্যান্সারের কারণ নিয়ে পড়েছিলাম। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, সাইফুল মরেনি। আমরা তাকে মেরেছি। সামনের কয়েক বছরে আরো কয়েক কোটি সাইফুলকে আমরা হত্যা করবো। ক্যান্সার দিয়ে।

আমি কোমল পানীয় খেয়ে বোতলটি রাস্তায় ফেলে দিচ্ছি। ওয়ান টাইম গ্লাস, প্লেট, প্লাস্টিক ব্যবহার করছি সব সময়। সেগুলো অপচনশীল থেকে যাচ্ছে। ওজন স্তরে এ্যাটাক করছে। প্রকৃতি তে যা আসার কথা, আসছে না। যা যাবার কথা, যাচ্ছে না। রোগ বাড়ছে। ক্যান্সারের মতো অস্ত্রে আমি হত্যা করছি সাইফুলদের।

প্রকৃতিকে আর কত নষ্ট করবো আমরা। এই কয়দিনের করোনা ভাইরাসের কারণে আমরা ঘরবন্দী। আমরা যখন ডেরায় ঢুকেছি, প্রকৃতি তখন জেগে উঠেছে। নিউইয়র্কের আকাশ ধোঁয়া মুক্ত পরিষ্কার হয়েছে। জানালার শার্সির ফাঁক দিকে পরিষ্কার আকাশ দেখছে বিশ্ববাসী। কালো ধোঁয়া নেই। কক্সবাজারে আমাদের ঘরে ঢোকার সুযোগে, সী-বীচের কোল ঘেঁষে ডলফিনরা জলকেলিতে মেতেছে। আকাশ ঢেকে ডানা মেলছে পাখিরা সবখানে।

আমরা সাইফুলদের হত্যা করবো নাকি আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যাবো সুন্দর এক পৃথিবী, তা আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের সন্তানরা পরিষ্কার আকাশ পেতে পারে, পাখির গান শুনে ঘুম থেকে জাগতে পারে, ডলফিনের সাথে সাঁতার কাটতে পারে, যদি আমরা চাই। আমরাই পারি এ বিশ্বকে নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য করে যেতে।

ভালো থাকিস সাইফুল। তুই সমাজ পরিষ্কার করবি বলে সম্মতি জানিয়েছিলি। সমাজ তোকে বাঁচতে দেয়নি। তোদের হত্যা করেছে, আমাদের অপরিসীম বিলাসিতার জিহ্বা।

 

আসাদুজ্জামান জুয়েল- সাহিত্যিক ও গবেষক   

আরও পড়ুন