সরকারী প্রণোদনার পরও বেতন-বোনাসের জন্য গার্মেন্টস কর্মীদের আন্দোলন !

এস আকতার

আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকে আকাউন্ট ওপেনিং অফিসার হিসাবে কাজ করি । আর গার্মেন্টস এরিয়ায় ব্যাংকে চাকুরি করায় অনেক গার্মেন্টস কর্মীর স্যালারি আকাউন্ট খুলতে হয় প্রতিনিয়ত । করোনাকালিন সময়ে সাধারণ ছুটির সময়ও আমাকে সপ্তাহে প্রায় দিনই যেতে হতো, কারণ অফিসের কাছের একটা বড় গার্মেন্টসের কর্মচারীদের স্যালারি আকাউন্ট খুলতে হচ্ছে প্রতিদিন । সাধারণ ছুটির সময়ে প্রথম দিকে অফিস ১২.০০ পর্যন্ত এবং পরের দিকে ২.৩০ পর্যন্ত হলেও আমাকে প্রায় সময় অফিসে থাকতে হতো প্রায় ৪.৩০-৫.৩০ পর্যন্ত । ব্যাংকের প্রায় সব অফিসার চলে গেলেও আমাকে এবং আমার সহায়তাকারীকে থাকতে হতো অনেকক্ষণ । কারণ আকাউন্ট না হলে সরকারের দেয়া প্রণোদনার টাকা গার্মেন্টসের শ্রমিকরা নিতে পারবে না । সরকার শুধুমাত্র শ্রমিকের ব্যাংক আকাউন্টে টাকা দিবে বলে আকাউন্ট খুলতে প্রতিদন আসছিল ঐ গার্মেন্টসের অ্যাডমিনের অফিসাররা    গাদাগাদা ফিল আপ করা ফর্ম নিয়ে  । হা সেই অসহায় শ্রমিকদের ভাত-কাপড়ের কথা চিন্তা করে আমাকে কষ্ট করতেই হতো ! অবশ্য পরবর্তীতে সরকার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে । বিকাশ, এমক্যাশ এবং রকেটের মাধ্যমেও বেতন নিতে পারছিল গার্মেন্টসের মালিকরা তাদের শ্রমিকদের জন্য  ।

অফিসে এই দীর্ঘ সময় ব্যয় করার কষ্ট শেষ হতে না হতেই গত সপ্তাহে শুরু হয়েছিল নতুন এক যন্ত্রণা । গত সপ্তাহে অনেক কষ্টে ব্যাংকে যেতাম । গাজীপুরের টঙ্গি কলেজ গেট থেকে বোর্ড বাজার এইটুকু জায়গা (প্রায় ১০ কিলোমিটার) যেতেই সকাল সন্ধ্যা প্রায় ২-৩ টা করে গার্মেন্টসের কর্মীদের আন্দোলনের মুখে অফিস যাওয়া এবং আসা অনেক কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল । এমনিতে তো গণ পরিবহন নেই, তার উপর যে কয়টা রিক্সা-অটো চলতো জরুরী প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষদেরকে তাদের গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাবার জন্য সেই রিকশা এবং অটোগুলোকে আটকিয়েই তারা নিজেদের দাবী আদায়ের চেষ্টা চালাতো ।

অনেক গার্মেন্টসের মালিক তাদের কর্মীদের বেতন বোনাস নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেনি সরকার থেকে প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার পরও । তাহলে সরকার যে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিল সেগুলো নিয়ে আসলে কি করছে গার্মেন্টস মালিকরা? এটা সরকারি লোকদের ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার ।

যাই হোক অনেক কষ্টে আমি শুধুমাত্র এই সরকারি ছুটির সময়ই প্রায় ৪০০-৫০০ আকাউন্ট খুলেছিলাম একটা গার্মেন্টসের । এই আকাউন্টগুলো খোলা শেষ হলে এবং এগুলোতে টাকা প্রবেশ করার মাত্র কয়েকদিন পর শুনলাম সেই গার্মেন্টস বোর্ড বাজার থেকে কোনাবাড়ি চলে গেছে । রাতারাতি তাদের মেসিন, জিনিসপত্র সব কোনাবাড়ি স্থানান্তর করা হয় গত সপ্তাহেই । অফিস যাবার পথে সেই গার্মেন্টসের সামনেও শ্রমিকদের আন্দোলন দেখলাম বেতন-বোনাসের দাবীতে । বুঝতে পারছিলাম না ব্যাংক আকাউন্টে টাকা ঢুকেছে তার পরও ওদের এই দাবী কেন?  আসলে টাকা ঢুকলেও তার অধিকাংশই গেছে মালিকদের পকেটে । পরে জানলাম যে গার্মেন্টসের শ্রমিকদের শতভাগ বেতন- বোনাস না দিয়েই সেই গার্মেন্টস তার অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেছে ।

খেটে খাওয়া মানুষের ব্যাংক আকাউন্টে সরকারের প্রণোদনার টাকা আনার জন্য আমার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে শ্রম তার সবটাই যেন জলে গেল । বরং নিজেকে অনেক বেশী অপরাধী মনে হচ্ছিল ।  আমি যেন গার্মেন্টস মালিকদের প্রতারণায় সহযোগী হয়েছি গত কয়েক মাস ধরে । কিছু কিছু গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে  যতোটা সরকার শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ দিচ্ছে তার সবটা শ্রমিকরা পাচ্ছে না । অধিকাংশই চলে যাচ্ছে মালিকের পকেটে  । এই কিছু গার্মেন্টসের মধ্যে ছিল সেই গার্মেন্টসও যাদের শ্রমিকদের ব্যাংক আকাউন্ট খুলছিলাম আমি গত কয়েক মাস ধরে ।

এই আন্দোলনের সময়ে একটি গার্মেন্টস আন্দোলনরত কর্মীদের তাদের উর্ধ্ধতন অফিসার  এসে এভাবে ধমকের সূরে শান্তনা  দিয়ে বলতে “ একটু আগেই আমাদের এমডির সাথে আমাদের মিটিং হয়েছে ।  তোমরা তোমাদের আন্দোলন ছেড়ে দ্রুত তোমাদের কাজে যোগ দাও । তোমরা এখনই কাজে যোগ দিলে তোমাদের ১০০% বেতন-বোনাস দেয়া হবে । আর তা না হলে তোমরা ৫০% বেতন- বোনাসও পাবে না ।” এর পর শ্রমিকরা হয়তো কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আশ্বাস পেয়ে দৌড়ে ঢুকে পড়ে গার্মেন্টসের ভিতরে ।

প্রণোদনার পরও বেতন-বোনাসের জন্য গার্মেন্টস কর্মীদের আন্দোলন ! এই আন্দোলন তো চলবেই । কিছু হলেই আমরা শুধু সরকারকে দোষ দেই । অথচ এখানে সরকার যথেষ্ট পরিমাণে সহায়তা দিয়েছে । কিন্তু আমাদের সাধারণ আম জনতারাও লুটপাটে কম অভিজ্ঞ? তারাও তো লুটপাট করে খেয়ে ফেলে শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের ভাগের অংশ ।

লেখকঃ কলামিস্ট ও ব্যাংকার

 

আরও পড়ুন