ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায় ঠগিদের কথা

ইব্রাহীম খলিলঃ

খটখটে দুপুর, আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। হীরেন প্রামাণিক পা চালিয়ে চলছিল। আরও তো ১০ ক্রোশ পথ হাঁটতে হবে। রাতের মধ্যে জব্বলপুর পৌঁছাতে না পারলে তো মুশকিল! নইলে এমন বিরানভূমির মধ্যে কোথায় রাত কাটাতে হবে কে জানে! আর সঙ্গে টাকাকড়িও আছে। হীরেন শুনেছে এলাকাটা ভালো নয়। আরও তাড়াতাড়ি পা চালাল সে।

খানিক হাঁটতেই সামনে যেন কাদের হল্লামাস্তির শব্দ ভেসে আসতে থাকল। একটু খুশি হয়ে উঠল হীরেন। যাক, সঙ্গী পাওয়া গেল তবে! এদ্দুর পথ আর একলা হয়তো হাঁটতে হবে না। দেখা গেল, ৩০-৪০ জন তীর্থযাত্রীর একটা দল ওরা। তাদের পাণ্ডা রোহিতলাল বেশ অমায়িক, মিষ্টভাষী। হীরেনকে আশ্বাস দিল, তারা থাকতে কোনো সমস্যাই হবে না, বাকি পথটুকু একসঙ্গে যাওয়া যাবে।

রাত নামল। আগুনের ধারে সবাই গোল হয়ে বসে খোশগল্পে মগ্ন। নতুন সঙ্গীদের হীরেনের খারাপ লাগছে না। হঠাৎ একমুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল সবাই। রোহিতলাল গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘তামুক লেও’। খানিক পরেই দেখা গেল, একদম হাওয়া হয়ে গেছে হীরেন। একজন মানুষ চিরতরে হারিয়ে গেল পৃথিবীর বুক থেকে।

শুধু হীরেন না, এ রকম লাখ লাখ লোক পথ চলতে চলতে হারিয়ে যেত সারা জীবনের জন্য। সময়টা বড় অন্ধকার। ভারতবর্ষে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোটে আসন গেড়ে বসেছে। সপ্তদশ শতকের শেষদিকে ভারতজুড়ে তখন অস্থিরতা, আশঙ্কা। এর মধ্যেই উধাও হয়ে যেতে থাকল অনেকে। কিন্তু কারা এসব পথচলতি যাত্রীদের গুম করে ফেলছে? কে তারা?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই এমন এক গুপ্ত সংগঠনের নাম বলতে হবে, যাদের কাছে খুন করাটা চোখের পলক ফেলার মতোই সোজা। তাদের বলা হতো ‘ঠগি’। একজন ইংরেজ ইতিহাসবিদ হিসাব করে দেখিয়েছেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝ পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে অন্তত ৪০ হাজার লোক হারিয়ে গেছে চিরতরে এবং এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে আরও প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকে। এবার হিসাব করে দেখো, সংখ্যাটা কিন্তু কোটি ছাড়িয়ে যাবে!

বলা হয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকরতম গোপন খুনিদের দল এই ঠগিরা। কিন্তু তারা আসলে কে? আর কেনই বা তাদের এই ভয়ংকর নেশা? ঠগিরা চলত দলবেঁধে। কখনো ব্যবসায়ী, কখনো তীর্থযাত্রী, আবার কখনো সেনাদের বেশে চলত। চেহারায়, পোশাক-আশাকে আর দশজনের সঙ্গে মোটেই তাদের পার্থক্য করা যেত না। তাদের সাধাসিধে মুখ দেখলে কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারত না এরা এমন ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে।

সবচেয়ে অবাক হবে কীভাবে এরা খুন করত জেনে। ছুরি, দা-জাতীয় কোনো ধারালো জিনিস নয়, কোনো আগ্নেয়াস্ত্রও নয়। তারা যেটা দিয়ে খুন করত, সেটা আদতে কোনো অস্ত্রই নয়। বিশ্বাস করো আর না-ই করো, একখণ্ড রুমাল দিয়েই তারা খুন করেছে অগণিত লোককে। হলুদরঙা এই রুমালের দৈর্ঘ্য ৩০ ইঞ্চি, ১৮ ইঞ্চি দূরে একটি গিঁট, তাতে বাঁধা রুপার মুদ্রা। এই রুমাল গলায় পেঁচিয়েই তারা ফাঁস পরিয়ে দিত। একবার গলায় পরলে সে ফাঁস থেকে নিস্তার পাওয়ার সাধ্য ছিল না কারও। রক্তপাত ছিল ঠগিদের মধ্যে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

হত্যার ঠিক আগে দলপতি একটা সংকেত বা ‘ঝিরনী’ দিত। এর পরেই মুহূর্তের মধ্যে একজন উঠে শিকারের পা চেপে ধরত, একদল মাথা ঠেসে ধরত আর একজন এসে ফাঁস পরিয়ে দিত। যে ফাঁস পরিয়ে দিত তাকে বলত ‘ভুকোত’। কাজ শেষ হয়ে গেলে শিকারকে কবর দিয়ে চলে যেত। যাওয়ার আগে করত কী জানো, মৃতদেহের শিরদাঁড়া ও হাঁটু ভেঙে দিত। যাতে পরে দেহটা ফুলে উঠতে না পারে। সেটা হলে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে! এমনভাবে লাখ লাখ খুন করার পরও অনেক দিন কেউ কিছু আঁচও করতে পারেনি।

এ রকম যে একটা গুপ্ত সংগঠন আছে, সেটা ব্রিটিশ সরকার প্রথম জানতে পারে ১৮১২ সালে। গঙ্গার ধারে একটা গণকবরে পাওয়া যায় ৫০ জনের লাশ। তাদের সবার হাড়ের সন্ধিস্থল ভেঙে দেওয়া। এর পরেই আসলে টনক নড়ে সরকারের।

কিন্তু বছরের পর বছর কেন এমন করত ঠগিরা? এটা কি তাদের পেশা? এক অর্থে পেশাই বটে। কারণ, তারা মানুষ মেরে লুট করে নিত। তবে তাদের একটা সাধারণ ধর্মবিশ্বাস ছিল। ঠগিরা সবাই ছিল মা ভবানী বা কালীদেবীর উপাসক। তাদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিমসহ অনেক ধর্মের লোক ছিল। কিন্তু সবাই করজোড়ে মানত করতো মা ভবানীকেই। তারা বিশ্বাস করত, তারা যা করছে সব দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য। অদ্ভুত সব কুসংস্কারও ছিল তাদের। রওনা হওয়ার আগে কোদাল মন্ত্রপূত করা, ঘুঘু বা প্যাঁচার ডাকের জন্য অপেক্ষা করা। তবে এটা মনে কোরো না, কালী সাধকদের সবাই ঠগি ছিল। খুব ছোট একটা অংশই ঠগি হয়ে গিয়েছিল।

বছরের সব সময় তারা খুন করত না। এমনিতে তারা সাধারণ গেরস্তের মতোই জীবনযাপন করত। বিশেষ একটা সময় এলেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেত। আর দল ভারী করত বংশপরম্পরায়। ঠগির ছেলেকেও সে নিয়ে আসত এই পেশায়। তবে সেটা সাবালক হওয়ার পর। তার আগ পর্যন্ত তাকে দলে রাখা হতো কিন্তু কিছু করতে দেওয়া হতো না।

শুধু স্থলে নয়, জলেও কিন্তু ঠগিদের আনাগোনা ছিল। বিশেষ করে বাংলায় জলের ঠগিদের দাপট ছিল সবচেয়ে বেশি। পশ্চিম বাংলার বর্ধমানে ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। এদের বলা হতো ‘ভাগিনা’ বা ‘পাঙ্গু’। তারাও যাত্রীবেশেই নৌকায় উঠত, পরে সুযোগ বুঝে গলায় ফাঁস দিত। এ রকম আরও অনেক দল-উপদলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ঠগিরা। কেউ তাদের বলত মেকফানসা, কেউ বলত ফাঁসুড়িয়া। নাম আলাদা হলেও কাজ সবার একই—ঠান্ডা মাথায় খুন।

এভাবেই চলছিল তাদের গোপন কীর্তিকলাপ। আরও হয়তো অনেক বছরই চলত, যদি উইলিয়াম স্লিম্যান নামের একজন না থাকত। কাকতালীয়ভাবেই ঠগিদের একটা দলের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন এই ইংরেজ রাজকর্মচারী। পরে দেখা যায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়েছে। ১৮৩০ থেকে ১৮৪১ সালের মধ্যেই প্রায় তিন হাজার ৭০০ ঠগি ধরা পড়ে। তাদের প্রায় সবাইকে ঝুলতে হয় ফাঁসিতে,যে ফাঁসি দিয়ে তারা মেরেছিলো লাখ লাখ পথিকদের।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।