চলে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পরিমল চন্দ্র গুহ

।। শ ম রেজাউল করিম ।।

চলে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পরিমল চন্দ্র গুহ, পি সি গুহ নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। ১০ বছর খুব ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে মিশেছি। তাকে চেনার এবং বোঝার চেষ্টা করেছি। তিনি একজন চমৎকার আইনজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন আইনজীবিদের নেতা। তিনি সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য এবং একাধিক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সৌভাগ্যক্রমে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে তার সাথে। নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের নির্বাচনী প্রচার অভিযান একই ভাবে বিভক্ত হয। আলাদা আলাদাভাবে প্রচারণায় চলে যাওয়া, বিভিন্ন স্থানে ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রেও বিভক্ত অবস্থায় যার যার মত করে ভোট চেয়েছেন। এই প্রকাশ্য বিরোধ এবং বিভেদের মাঝেও সকলকে নিয়ে সম্মিলিত ভাবে একটি প্যানেল করার জন্য, প্যানেল পরবর্তীতে সকলের বিজয়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন পরিমল চন্দ্র গূহ।

ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন স্যারের ভাষায় জমিদার পি সি গুহ। তিনি ভালো পোশাক পরতেন না, কথা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। অন্যদের মতো নিজেকে ফিটফাট রাখতেন না। কিন্তু মানসিক জায়গাটা ছিলেন শতভাগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার । বিরোধপূর্ন তথা উত্তপ্ত অবস্থা দেখলে তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন। প্রতিপক্ষের কাছে বাড়িয়ে কোনো কথা বলেননি। বরং কিছুই হয়নি এভাবে কিভাবে সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় সেটা তিনি করেছেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি সাবেক ছাত্রনেতা এবং আমৃত্যু একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন।

একটা সময়ে আমার উপরে প্যানেলের দুই শিবিরে একাধিক নেতা ক্ষুব্ধ হন।কারন, আমি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অন্ধ গ্রুপিং করতে রাজি হইনি। আমাকে পরিমলদা বললেন, আপনি হেরে গেলে খুব ক্ষতিহবে । আপনারা উদীয়মান। আমাদের তো পড়ন্ত বেলা। আপনার হেরে গেলে ভবিষ্যতে দাঁড়াতে পারবেন না। আমি বললাম আমি কি করতে পারি? তিনি স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলেন। বিভিন্ন স্থানে তার দল ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঘনিষ্ঠ আইনজীবিদের যখনই তার নিজের জন্য ভোট চাইলতেন , ফুল প্যানেলের জন্য বলার পাশাপাশি আমি যাতে হেরে না যাই আমার জন্য আলাদাভাবে ভোট চাইতেন। যেখানে প্রতিশ্রুতি পেতেন না, গোপনে ফোন নাম্বার গুলো আমাকে দিয়ে বলতেন,রেজা সাহেব এখানে ফোন করেন। বিভিন্ন জায়গায় তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন ।

তার ছিল ছোট্ট একটি নোটবুক। ঐ নোটবুকে বাংলাদেশের সকল প্রান্তের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আইনজীবীদের নাম্বার ছিল। তিনি সবসময় চাইতেন আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ টিকে থাকুক। আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ কোনভাবেই যেন বিপন্ন হয়ে না পড়ে ।তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক আইনজীবিদের নেতৃত্বে একটা নির্ভরযোগ্য স্থানে পৌঁছে ছিলেন । তিনি খুব কেতাদুরস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ পড়তেননা। মক্কেলদের কাছ থেকে বিপুল টাকা নিতেন না। কিন্তু কখনো অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দিতেন না । মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে গোপন আঁতাত করে নিজে নির্বাচিত হওয়ার যে নোংরামী অনেকের ভিতরে দেখেছি, তার থেকে মুক্ত ছিলেন। পরিমলদা আপনার চলে যাওয়ার বিষয়টি এত বেদনাদায়ক যে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আপনি স্বশরীরে না থাকলেও আপনার অবস্থানটা আমাদের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে থাকবে। আপনার আত্মার শান্তি কামনা করছি ।পরিমলদা শ্রদ্ধায় ভালবাসায় সব সময় আপনাকে মনে রাখব। আপনার শুন্যতা কখনোই পুরন হবেনা। ভালো থাকবেন ওপারে।

লেখকঃ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

আরও পড়ুন – যন্ত্রণাদায়ক পৈশাচিকতা আমরা আর কামনা করি না

চলে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পরিমল চন্দ্র গুহচলে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পরিমল চন্দ্র গুহচলে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী পরিমল চন্দ্র গুহ

আরও পড়ুন