আমার প্রিয় নজরুল

মোস্তফা মাসুম তৌফিকঃ

আজ (গতকাল)১১ জ্যৈষ্ঠ। আমাদের প্রিয় কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী। আমাদের বিদ্রোহী কবি। জাতীয় কবিও বটে। তবে সেই ব্রিটিশ আমলেই কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি নেতাজী সুভাস বসু, তাকে ভারতবর্ষের জাতীয় কবির মাল্যদান করেছিলেন। হাজার বছরের অন্যতম সেরা বাঙ্গালী, খাঁটি বাঙ্গালী এবং মহাবিশ্ব কবি এই নজরুল; আমার প্রিয় নজরুল।
নজরুল ছিলেন চিরন্তন দ্রোহের কবি। যখন এই দেশ ছিলো ব্রিটিশ বর্বরতার যাঁতাকলে পিষ্ট, তখন তিনি তার সমস্ত শক্তিকে কলমের নিপূন আঁচরের ধারে রাজশক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করতে ছিলেন  সদা তৎপর। তার নিজের ভাষায়, ” রক্ত ঝরাতে পারিনাতো একা, তাই লিখি এ রক্তলেখা”।  পুরো সুস্থজীবনে তার ব্রিটিশ বিরোধী দ্রোহী সত্ত্বা ঘেকে বিন্দু পরিমান বিচ্যুত হননি তিনি। তাত্বিকতার খোলস ছেড়ে নজরুলকে তাই দেখা যায় পুরোদস্তুর বিপ্লবী এক রাজনৈতিক চরিত্রে, যা তাকে অন্যন্য বড় মাপের কবিদের চেয়েও স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ঠে ধন্য করেছে। আর দ্রোহ, সাম্য, মানবতা, প্রেমের যে ব্যবহারিক রূপ নজরুল প্রকাশ ঘটান, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল নয় শুধু অদ্বিতীয়ও বটে।
অপশক্তির সাথে আপোষহীনতা এবং তাকে সর্ব শক্তি দিয়ে প্রত্যাঘাতকে নিজের ক্ষুদ্র কবিজীবনের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানে কবি ছিলেন একান্ত সৎ ও একাগ্রচিত্ত। শৈশব থেকেই জীবনের বাস্তবতার সব রকম ঘাত প্রতিঘাত প্রত্যক্ষ করে জীবনের গতিধারাকে একমুখী বহমান করেন, যা মানবতা, সৃজনশীলতা প্রেম ও দ্রোহের অপূর্ব সমন্বয় মাত্র।
তার বাঙ্গালীত্ব তাকে ভারতবর্ষীয় থেকে শেষ পর্যন্ত চিরন্তন বৈশ্বিক এক মহাসত্ত্বায় রূপ দেয়। যেখানে দ্রোহ, সাম্য, মানবতা, ও প্রেম এক অভূতপূর্ব  একক চরিত্র হয়ে দাড়ায়।
নজরুলের দ্রোহের সরাসরি প্রতিপক্ষ নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ রাজশক্তি হলেও, তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন শিক্ষাবিমুখ ধর্মীয় মোড়লদেরও ( কবির ভাষায় ” মৌ- লোভী”) কোন ছাড় দেননি। ছাড় দেননি মানবতা বিরোধী রক্তচোষা মহাজন বা শোষক দেরকেও। আসলে অন্যায়, অসাম্য, অমানবিকতায় নিষ্পেষিত এই জনপদের সর্বশত্রু সবাইকেই তার প্রত্যাঘাতের নিশানা বানানোর প্রয়াস পান তিনি। শুধু এই জনপদ নয়, সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে, সর্বত্র ই তিনি এতটাই সোচ্চার ও প্রত্যাঘাতকারী ছিলেন, যে তার দ্রোহী সত্ত্বাও হয়ে যায় বৈশ্বিক, সার্বজনীন ও চিরন্তন।
নজরুলের মানবতাবোধ সম্পূর্নতা পায় মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ও গভীর ভালোবাসায়। সৃস্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাতের সামান্যতম অবমাননা তিনি মেনে নিতে পারেন নি পুরো কলম জীবন জুড়েই। ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রাম কে  সারা বিশ্ববাসীর জীবন যুদ্ধে রূপায়নেও তাই কবি ছিলেন চুড়ান্ত সফল। মানবতার বিজয় গানের কবি, কখনই পরাজয়ের কল্পনাও করতে প্রস্তুত ছিলেন না।
তার মানবতা আচ্ছন্ন ছিলো এক অবাক সাম্যবাদে। মানুষে মানুষে সাম্য, নারী পুরুষে সাম্য, সাদা কালোর সাম্য, ধর্মে বর্ণে সাম্য সব কিছুর চুড়ান্ত পরিনতি পায় তার একান্ত ব্যক্তিগত সাম্যবাদী চরিত্র ধারনে, যেখানে ইসলাম ও কমিউনিজম এর অপূর্ব সহাবস্থান ঘটে।
নজরুলের জীবনে, তার রচনায়, গানে, কবিতায় সর্বত্রই প্রেমের অপূর্ব মধুর ঝংকারময়। এই প্রেম যেমন নারীপুরুষের চিরন্তন প্রেম; তেমনি তা, মহান স্রষ্টার প্রতি মহাবিনয়ের আলোয় অলংকৃত। আল্লাাহ রাব্বুল আ’লামিন মানব জাতির প্রতি যে গভীর প্রেম, দয়া ও অনুগ্রহ দান করেছেন, কবি ভীষনভাবে বিনীত কৃতজ্ঞতায় তার সব লেখায় তা তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। তাইতো তার কবিতা,গানে, এমনকি প্রবন্ধেও ফুটে ওঠে শ্বাশ্বত প্রেমের অলৌকিক জয়গান। মানুষের প্রতি প্রেম তার মধুরতম লেখনীর ভেলায় চড়ে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর প্রেমে পরিপূর্নতা পায়। তাই তার অন্তিম আকুতি ছিল মসজিদের পাশে কবরে বসবাসের।
মানবাত্মার মাঝে শ্রেষ্ঠতম রাসুল (সাঃ) এর প্রতি তার ভক্তি, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ছিল একেবারে খাঁটি বা অকৃত্রিম। রাসুল(সাঃ) এর জীবনের সত্য আদর্শে কবি পরিপূর্ন সত্ত্বা দিয়ে নিজেকে সমর্পন করেন। তার হামদ ও নাত গুলো তাই ভীষন সরল, গভীর প্রেমময় ও জীবন্ত।
সমস্ত অন্যায় আর অপশক্তির বিরুদ্ধে জেহাদকে তিনি তার জীবনধর্ম রূপে প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী হন।
একজন আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে তিনি নিজ জীবনকে ধন্য করার পাশাপাশি সমস্ত বিশ্ব বিবেককেও সজোরে নাড়া দিতে সক্ষম হন।
আজ তার জন্ম দিবসে, তার প্রতি, তার কবিসত্ত্বা, তার দ্রোহ, মানবতা ও প্রেমের প্রতি আমরা জানাই অজুত নিজুত শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সালাম। মহান আল্লাাহর দরবারে তাই বিনীত প্রার্থনা,  কবিকে জাগতিক ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতের শীতল ছায়ায় একটু স্হান দেবার জন্য। আমাদের মত পাপী তাপী বান্দাদের তরফ থেকে মহান রাব্বুল আ’লামিনের কাছে এটুকুই আকুতি।
আমীন।

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন