এন্ড্রু কিশোরের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি

আহমেদ  জহুর, ঢাকা থেকে

নপ্রিয় কন্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা নিরাশা প্রকাশ করায় এবং এন্ড্রু কিশোর দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাওয়ায় তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

সংগীত শিল্পী ও সাংবাদিক, আমার স্নেহভাজন রেজা মতিনের পোস্ট থেকে জানতে পারলাম, এন্ড্রুর ওয়েব পেজে তার স্ত্রী লিপিকা লিখেছেন-

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর আমরা সিঙ্গাপুর যায়। সেখানে কিশোরের ধরা পরে Diffuse Large B Cell Lymphoma (cancer in both Adrenal Gland)। তারপর কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শেষ হয় এপ্রিল মাসে। ডাক্তার বলেন এখন আর কোন কিছুর দরকার নেই। medicine দিয়ে বলেন আগস্ট মাসে আসতে। আমরা ১৩ মে দেশে আসার জন্য টিকেট কাটি। কিশোর ভয় পাই, কারণ শারীরিকভাবে খুব দুর্বল ছিল। আমি টিকেট বাতিল করি। ডাক্তার বলেন, এটা কেমোর জন্য, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে, সময় লাগবে।
পরে ১০ জুন আবার টিকেট কাটি কিন্তু হঠাৎ ২ জুন কিশোরের হালকা জ্বর আসে, ৩ জুন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। ৪ জুন হাসপাতালে ভর্তি করেন ডাক্তার। কিন্তু জ্বর বার বার আসতে থাকে। কোন medicine তার শরীরে কাজ করছিল না। হাসপাতালের ডাক্তার আমাকে ফোন করে বলেন, PET SCAN করতে হবে, Lymphoma আবার back করেছে কিনা দেখতে হবে।
ডাক্তারের কথা শুনে আমি খুব ভয় পেয়ে যায়। মনে মনে শুধু ঈশ্বরকে ডাকি। কারণ শুরুতে ডাক্তার বলেছিলেন, Lymphoma যদি একবারে নির্মূল না হয়, যদি back করে , তাহলে সেটা double strong হয়ে ফিরে আসে এবং তা দ্রুত ছড়ায়। তখন সেটা কোনভাবেই control করা সম্ভব হয় না। ৯ জুন PET SCAN হয় এবং সেদিন রাতে ডাক্তার আমাকে ফোন করে বলেন যে, পরদিন মানে ১০ জুন সকাল ১০ টায় আমার সাথে PET SCAN report নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে চান । ৯ জুন রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাত। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি, সকাল ১০টার আগে হাসপাতালে গিয়ে বসে থাকি কিশোরের পাশে। কিশোর আমাকে বলে, ডাক্তারকে বলবা, হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিতে, আমরা দেশে ফিরবো। আমি ভয়ে চুপ করে বসে আছি থাকি। শুধু বলি, দেখি Doctor Lim কী বলেন।

কিছুক্ষণ পরে একজন নার্স এসে আমার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে বলেন ডাক্তার ডাকছেন। Dr. Lim আমার সামনে এসে একটাই কথা বলেন, Lymphoma back করেছে। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, কোন কথা বলতে পারছিলাম না, বুঝলাম সব শেষ। ডাক্তার বললেন, Andrew কে বলব? আমি বললাম, বলতেতো হবে। ডাক্তার আমাকে computer screen এর সামনে নিয়ে গেলেন এবং দেখালেন। Adrenal Gland এ কিছু নেই। Lymphoma ভাইরাস ডান দিকের লিভার এবং স্পাইনালে ছড়িয়ে গিয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় অল্প অল্প আছে। আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না। চোখের জল ঠেকাতে পারছিলাম না, অনেক কষ্টে ডাক্তারকে বললাম, what next. ডাক্তার বলেন, I am sorry, আমার আর কিছুই করার নেই। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে এত অসহায় লাগছিল যে, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। কিশোর বুঝতে পেরেছিল, আমাকে ডাকতে থাকে।
ডাক্তার কিশোরকে জানান, Lymphoma back করেছে। কিশোর ডাক্তারকে বলে, তুমি আজই আমাকে রিলিজ করো, আমি আমার দেশে মরতে চাই। আমাকে বলে, আমি তো মেনে নিয়েছি, সব ঈশ্বরের ইচ্ছা, আমি তো কাঁদছি না। তুমি কাঁদছো কেন? কিশোর খুব স্বাভাবিক ছিল, মানসিকভাবে আগে থেকে প্রস্তুত ছিল, যেদিন জ্বর এসেছিল সেদিন থেকে। কিশোর high commission এ ফোন করে বলে, কালই আমার ফেরার plane ঠিক করে দেন। আমি মরে গেলে আপনাদেরই বেশি ঝামেলা হবে, জীবিত অবস্থায় পাঠাতে সহজ হবে। ১০ জুন বিকালে হাসপাতাল থেকে ফিরি এবং ১১ জুন রাতে air-ambulance করে দেশে ফিরে আসি আমরা।
ঈশ্বরের কী খেলা! ১০ জুন সম্পূর্ণ positive result নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। অথচ ১১ জুন ফিরলাম পুরো negative result নিয়ে। আমি ডাক্তারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আর কতদিন? তিনি এটা লিখেছিল “It’s difficult to predict but typically in terms of months rather than years”. এখন কিশোর কোন কথা বলে না। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। আমি বলি কি ফিল করছো? জবাবে কিশোর বলে, তেমন কিছু না। পুরনো কথা মনে পড়ে আর ঈশ্বরকে বলি, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও, বেশি কষ্ট দিও না।
Cancer এর last stage খুব যন্ত্রনাদায়ক ও কষ্টের হয়। Andrew Kishor এর জন্য সবাই প্রাণ খুলে দোয়া করবেন, যেন কম কষ্ট পায় এবং একটু শান্তিতে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে পারে।
আমার মনে হল, কিশোর শুধু আমার কিংবা আমাদের সন্তানের বা আমাদের পরিবারের নয় বরং দেশের মানুষের একটা অংশ, সম্পদ । তাই এই কথাগুলো তার ভক্ত-শ্রোতাদের জানানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এটাই শেষ পোস্ট, এরপর আর কিছু বলা বা লেখার মত আমার মানসিক অবস্থা থাকবে না। এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন মনে হয়, কিশোর থাকবে না অথচ আমি থাকবো, মেনে নিতে পারছি না। এ অসময়ে সবাই সাবধানে থাকবেন, নিজের প্রতি যত্ন নিবেন, সুস্থ থাকবেন, ভাল থাকবেন আর Andrew KIshor এর প্রতি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি রাখবেন ও প্রাণ খুলে দোয়া করবেন। বিদায়….

ই-মেইল:[email protected]
০৬ জুলাই, ২০২০

আরও পড়ুন