কাশ্মীর সংকটের পটভূমি এবং ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার আবির্ভাব

কাশ্মীরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাশ্মীরের স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, আর অন্যদিকে ভারতীয় সরকারের কাশ্মীরকে নিজের অধীনে একেবারে আনার জন্য তাদের স্বায়ত্ব শাসনের অধিকার কেড়ে নেয়ার প্রচেষ্টা থেকে বারবার কাশ্মীরে সংকট দেখা দিয়েছে । কাশ্মীরে বিচ্ছিন্ন হামলা, সেনাবাহিনী মোতায়েন তো নিত্য নৈমত্তিক বিষয় যুগের পর যুগ ধরে । জম্মু ও কাশ্মীরের এই সংকটের সুচনা আসলে কবে থেকে ? আর এই সংকট নিরসনেই কিভাবে ৩৭০ ধারার আবির্ভাব হয়?

জম্মু ও কাশ্মীরের জন্ম হয়েছিল মূলত ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ এর পর । হেনরি লরেন্স এর পরামর্শে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড হার্ডিঞ্জ কাশ্মীর উপত্যকাকে তাঁদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সেই ক্ষয় ক্ষতি পুনরুদ্ধার করতে অমৃতসর চুক্তি অনুসারে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে জম্মুর ভোগরা শাসকদের কাছে বিক্রি করা হয় । তখন থেকে শুরু করে অর্থাৎ ১৮৪৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর মহারাজা দ্বারা শাসিত একটি দেশীয় রাজ্য ছিল ।

১৮৪৭ সালে মহারাজা গুলাব সিং নামের একজন ভোগরা শাসক ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে জম্মু কাশ্মীর কিনে নেন ।১৯২৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত হিন্দু রাজা হরি সিংই  ছিলেন কাশ্মীরের শাসক।

এদিকে ১৯৩০ সালের দিকে জম্মু কাশ্মীরের প্রথম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি)এর সৃষ্টি হয় । কাশ্মীরের জনগণ তৎকালীন হিন্দু রাজা হরি সিং এর পক্ষপাতদুষ্ট নিতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না । মহারাজার শাসনের পতন ঘটাতে এনসির প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মীর স্বাধীন কর্মসূচীর নেতৃত্ব দেন ।

এরপর ১৯৪৭ এর আগস্টে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে কাশ্মীর । জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ এবং জম্মু কাশ্মীর রাজ্যগুলোকে ‘‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেসন” এর মাধ্যমে সুযোগ দেয়া হয় যে তারা স্বাধীনতা, ভারতের অন্তর্ভুক্তি বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি এই তিনটার মধ্যে যে কোনটা বেছে নিতে পারে । এই সময় তৎকালীন রাজা হরি সিং ‘‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেসনের” আওতায় প্রথমে স্বাধীন থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন । এই সময় ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার বিদ্রোহী নাগরিক এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর রাজ্য আক্রমণ করে ।

তখন কাশ্মীরের রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও গভর্নর -জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে সহায়তা চাইলেন। কাশ্মীরের রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করবেন, এই শর্তে মাউন্টব্যাটেন কাশ্মীরকে সাহায্য করতে রাজি হন।১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। ২৭ অক্টোবর তা ভারতের গভর্নর -জেনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়।চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

ভারত বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। জাতিসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের বিপক্ষে মত দেয় । ভারত ও পাকিস্তানে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি তত্ত্বাবধানে আসে। এই গোষ্ঠীর কাজ ছিল, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা ও তদন্তের রিপোর্ট প্রত্যেক পক্ষ ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে জমা দেওয়া। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে কাশ্মীর থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহার ও গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ভারত গণভোটে অসম্মত হয় এবং এজন্য পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়। ভারত গণভোট আয়োজনে অসম্মত হয় এজন্য যে, এটা নিশ্চিত ছিল যে গণভোটে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বেশিরভাগ ভোটারই নিজেদের স্বাধীনতা অথবা পাকিস্তানের পক্ষে ভোটদান করবেন ও এতে কাশ্মীরে ভারত ত্যাগের আন্দোলন আরো বেশী জোড়ালো হবে।

এদিকে ১৯৪৯ সালেই কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিধানের বিষয়ে আলোচনা করেন । তখনও ঐ অনুচ্ছেদটি খসড়া করা হচ্ছিল । এরপর ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে বিশেষ মর্যাদা পায় জম্মু ও কাশ্মীর ।

ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। এই ধারাবলে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধানের আওতামুক্ত রাখা হয় (অনুচ্ছেদ ১ ব্যতিরেকে) এবং ওই রাজ্যকে নিজস্ব সংবিধানের খসড়া তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। এই ধারা বলে ওই রাজ্যে সংসদের ক্ষমতা সীমিত। ভারতভুক্তি সহ কোনও কেন্দ্রীয় আইন বলবৎ রাখার জন্য রাজ্যের মত নিলেই চলে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে রাজ্য সরকারের একমত হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তানে বিভাজন করে ভারতীয় সাংবিধানিক আইন কার্যকর হওয়ার সময়কাল থেকেই ভারতভুক্তির বিষয়টি কার্যকরী হয়।

এরপর ১৯৫২ সালে দিল্লি চুক্তি সই হয়, ১৯৫৬ সালে জম্মু ও কাশ্মীর নিজেদের আলাদা সংবিধান প্রণয়ন  করে এবং নিজেদের ভারতের অভ্যন্তরীণ অংশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে ।

এরপর ১৯৭৫ সালে কাশ্মীরের শেখ আবদুল্লাহ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কাশ্মীর চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যেখানে আবারও অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর উপর জোর দেয়া হয় । এরপর ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও নিশ্চিত করেন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ কখনও রদ বা বাতিল করা হবে না ।

৩৭০ ধারার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীর যেমন বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে তেমন ৩৭১ ধারার মাধ্যমেও ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের ৬টি রাজ্য সহ ১১টি রাজ্য যেমন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, নাগাল্যান্ড,মণিপুর বিশেষ কিছু সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে ৩৭০ ধারা বলে কেবল মাত্র জম্মু কাশ্মীরেরই নিজস্ব আলাদা সংবিধান এবং স্বতন্ত্র পতাকা রয়েছে ।

কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকাকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫এ রদ করার প্রস্তাব তোলেন । এ বছর ৫ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ (ক) ধারা কে অকার্যকর করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা খর্ব করেন। এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে ।সেই দুটিকে ভারতের দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করে ।

৫ আগস্টের ঘটনার প্রেক্ষিতে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুদাসসর নাজির মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বলেছেন, “দেশভাগের আগে কাশ্মীর কিন্তু স্বতন্ত্র একটি দেশ ছিল, স্বাধীন মুলুক ছিল।”

এদিকে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড: চ্যাটার্জি বলেছেন, ‘‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেসন-য়ে সই করেছিল কাশ্মীর ও ভারতের সরকার, দুটো স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা – তার মাধ্যমেই কাশ্মীর ভারতে সংযুক্ত হয়েছিল।’’

ড: চ্যাটার্জি বলেছেন-

‘‘যে শর্তের ভিত্তিতে সেই চুক্তি সই হয়েছিল, ভারত সরকার একতরফাভাবে বলতে পারে না যে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে, তাই আমরা সেই শর্তগুলো আবার নতুন করে বিবেচনা করবে’’

কিংশুক চ্যাটার্জি আরও বলেছেন, ‘‘যদি ভারতের একশো কোটি মানুষও বলে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আর কাশ্মীরের মানুষ সে কথা না মানে, তাহলে কিন্তু আইনি পথে বা গণতান্ত্রিক পন্থায় ভারত সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অবশ্য গায়ের জোরে হয়তো সম্ভব।’’

সূত্রঃ

উইকিপিডিয়া, বিবিসি বাংলা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, কালের কণ্ঠ

লেখকঃ

শারমিন আকতার

সম্পাদক, মহীয়সী (https://www.mohioshi.com )

 

 

আরও পড়ুন