কিছু ভালোলাগার গল্প

সাদিকা সুলতানা লিনা

বেশ কিছুদিন আগে বিকেলে শাহবাগ দাঁড়িয়ে আছি রাস্তা পার হবো বলে।প্রচুর মানুষ আর গাড়ি;পার হবার কোন জো নেই। হঠাৎ এক বাসের কন্ডাকটরের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম,”টংগী,গাজীপুর “বলে যাত্রীদের বাসে উঠার জন্য ডাকছে।লোকটাকে দেখার পর অবাক আর বিস্ময়ের সীমা রইল না।মানুষটা লম্বায় ৩ফুট ৯/১০ইঞ্চি হবে,চোখে কড়া পাওয়ারের চশমা আর পড়নে একটা সাদা চেক শার্ট আর কালো প্যান্ট;দেখতে একজন ভদ্র মানুষের মতোই।আর পাঁচজন কন্ডাকটর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা,চেহারার মধ্যেও একটা গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাব পরীলক্ষিত। এই মানুষটা এই পেশায় এসেছে;দেখে অবাক হলাম।
.
এর কিছুদিন পর যাত্রাবাড়ীতে আরেকজন বাসের কন্ডাকটর দেখলাম।তার একটা পা নেই;স্ক্রেচে ভর করে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের ডাকছে।উনাকে দেখার পর বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠল,চোখগুলো সামান্য জলে ছলছল করে উঠল।এতোগুলো মানুষের মধ্যে সে নিজেকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে আর তার চাইতেও বড় কথা সে তার শারীরিক অসুস্থতার কথা চিন্তা না করে জীবনধারণের জন্য এইরকম একটা পেশা বেছে নিয়েছে।
.
আপনারা যারা যাত্রাবাড়ী থাকেন তারা প্রায়শই সকালে একটা ছেলেকে দেখে থাকবেন হয়তো।বয়স বেশি না;খুব সম্ভবত ১২/১৩বছর হবে।রোজ সকালে সে পেপার বিক্রি করে।ওর হাত-পা কোনটাই স্বাভাবিক নেই;সহজ কথায় বলতে গেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। ও যখন পেপার বিক্রি করে অনেকটা স্বভাববশত হয়তো মানুষের গাঁ ঘেষে এসে বলে,”পেপার লন,পেপার লন।”ওর এই আচরণে কিছু মানুষ বিরক্ত হয়,কেউ তাচ্ছিল্য করে,মেয়েরা ভয়ে অন্যদিকে চলে যায় কিংবা চেঁচামেচি করে।আমি যখন প্রথম দেখেছিলাম তখন আমিও অবাক হয়েছি তবে ভয় পাইনি।সত্যি বলতে কি,ছেলেটাকে দেখে একরকম মুগ্ধ হয়েছিলাম,বেশ ভালোও লেগেছিল বটে।আমি যখনি ওর দেখা পাই,ওর কাছ থেকে একটা পেপার কিনে নেই।আমি ওর কাছ থেকে পেপার কিনি নিজের প্রয়োজনে নয় বরং একধরনের মায়া আর ভালোলাগা থেকেই।
.
কিছু মানুষ মানুষকে মুগ্ধ করার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়,কিছু মানুষের জন্মই হয় মানুষের অনুপ্রেরণার আদর্শ হয়ে বাঁচার জন্য,কিছু মানুষ বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা আর ভালবাসার দৃষ্টান্ত হয়ে।এই মানুষগুলো সেইসব মানুষদের প্রতিচ্ছবি।
আমাদের আশেপাশে আমরা যাদের শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে অবজ্ঞা করি,তাচ্ছিল্য করি ওরাতো আমাদের মতোই মানুষ। এইসব মানুষগুলোকে দেখে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।এরা নিজেদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দোহাই দিয়ে নিজেদেরকে আর মানুষের করুণার পাত্র করে রাখতে চায়না;তাই হয়তো জীবনধারণের জন্য বিভিন্ন পেশায় নিজেদেরকে নিযুক্ত করছে।এইসব মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা আর অকুণ্ঠ ভালবাসা চলে আসে এমনিতেই।
জীবনসংগ্রামে এইসব মানুষগুলো এভাবেই এগিয়ে যাক, এদের চোখে জ্বলজ্বল করা স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাক;ভালবাসা নিরন্তর এইসব স্বপ্নালু মানুষগুলোর জন্য।

সাদিকা সুলতানা লিনা সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন