চলে গেলেন ছড়াশিল্পী একেএম শহীদুর রহমান বিশু

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ছড়াশিল্পী একেএম শহীদুর রহমান বিশু আর নেই। ২০২০ সালের ৯ আগস্ট সকালে তিনি তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।খবরটা পেলাম কবি আবুবকর সালেহ’র ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পরে ফোনে কথা বলে বিস্তারিত শুনলাম। কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম। তবুও মহান আল্লাহর নিয়ম মেনেই নিতে হবে। সত্যিকার অর্থে আজ পতন হলো এই সময়ের ছড়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের। তাঁর সাথে আমার বেশ কিছু স্মৃতি বেদনার জন্ম দিচ্ছে। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাত নসিব করুন। আমিন।

উল্লেখ্য, একেএম শহীদুর রহমান বিশু ছিলেন একাধারে কবি ছড়াকার গীতিকার নাট্যকার ও নাট্য শিল্পী। তিনি ১৯৪১ সালের ১৯ জানুয়ারি রংপুরের মুন্সীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মুহাম্মদ নছিমুদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনিও ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও সংগীত শিল্পী। মাতা সাহেরা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান বিশু। বাবার হাত ধরে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৫১ সালে ৫ম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় বাবার চাকরিসূত্রে বগুড়ার নন্দীগ্রামে কবিতায় হাতেখড়ি। প্রথম কবিতায় তিনি লেখেন- ‘হে বিশ্বচালক তুমি হে মহান/ তোমারই কাছে সকলের সম্মান’। সেই থেকেই তাঁর লেখালেখি চলমান। ১৯৫৮ সালে বগুড়ার গাবতলী হাইস্কুলে ছাত্রাবস্থায় তার প্রথম ছড়ার বই ‘অর্পণ’ প্রকাশিত হয়। ষাট দশকের প্রথম দিকে দিনাজপুর জেলা স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক কবি কাজী কাদের নেওয়াজ ও নাজিমুদ্দীন হলের প্রতিষ্ঠাতা হেমায়েত আলীর আহবানে প্রতি শুক্রবার নওরোজ সাপ্তাহিত সাহিত্য আসরে কবিতা পড়তে উপস্থিত হতেন।

১৯৬৩ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অপেক্ষা’ প্রকাশিত হয়। কবি জসিমউদ্দীন এই গ্রন্থের পা-ুলিপি দেখে দিয়েছিলেন এবং ভূমিকা লিখেছিলেন কবি কাজী কাদের নেওয়াজ। তিনি ছিলেন সফল অভিনেতা। ১৯৬৪ সালে চিত্রনায়ক রহমানের ‘মিলন’ ছায়াছবিতে অভিনয় করেন তিনি। চিত্রনায়ক জহির রায়হান ও কবি বেনজির আহম্মেদের ভীষণ প্রিয়ভাজন মানুষ ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান রাজশাহী কেন্দ্রের অনুমোদিত গীতিকার হন। ১৯৬৭ সালে রংপুর রেডিওতে তাঁর ঈদের গান শিল্পী খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়ার কণ্ঠে প্রচারিত হয়। রংপুর ও রাজশাহী রেডিওর জন্য তিনি অসংখ্য ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আধুনিক, বাউল, ইসলামী, ভাটিয়ালী, ঠুমরি, বাংলা রাগ-প্রধান, কাওয়ালী ও গজলসহ নানা ধরনের গান, গীতি-নকশা ও নাটক লেখেন। তাঁর গান বিটিভিসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। তাঁর গ্রন্থনা ও পরিচালনায় ‘রংপুরের জারী, ‘নাইওরী’ গীতিআলেখ্য ১৯৮৪-৮৬ পর্যন্ত এবং ২০১৬ সালে গবেষণামূলক অনুষ্ঠান ‘আলোকিত রংপুর’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।

সাহিত্যচর্চার সবুজ মাঠ হিসেবে তিনি ১৯৭৮ সালের ৫ মে প্রতিষ্ঠা করেন অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ। ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অভিযাত্রিক সাহিত্য সংকলনের সম্পাদক এবং রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত দেনিক যুগের আলো পত্রিকার সাহিত্য পাতার দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি ‘উত্তরমেঘ’ মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন।

একেএম শহিদুর রহমানের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ‘ছবি ও ছড়ায় ছয় ঋতু’। ২০১৭ সালে রংপুরের পাতা প্রকাশ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে। এছাড়াও ২০১৭ সালের বই মেলায় তাঁর ‘গোলক ধাঁধাঁ’ ‘চম্পাকলি ও রাজকন্যা’ নামে আরো দুটিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০১৮ সালের বইমেলায় ছোটদের গুণিজন জীবনী গ্রন্থ ও উপন্যাস ‘স্পর্শ’ প্রকাশিত হয়। ‘ছবি ও ছড়ায় ছয় ঋতু’ গ্রন্থে ছড়ায় ছড়ায় শিশুদের সামনে বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। বৈশাখ ও জৈষ্ঠমাস ছড়ায় তিনি বলেনÑ

গ্রীস্মের খরতাপ রোদ্দুর

জনহীন জলাশয়/ পথঘাট ধুলিময়

ওই দূর দেখা যায়- যদ্দূর।

ধূ-ধূ মাঠ প্রান্তর/ পুড়ে যায় অন্তর

ঘাম ঝরে দিনভর-তেষ্টায়

যায় বুঝি যায় প্রাণ শেষটায়।

ছড়াশিল্পী একেএম শহিদুর রহমানের অনবদ্য ছড়াগ্রন্থ ‘চম্পাকলি ও রাজকন্যা’। ছড়াগল্পে শিশুদের মাতিয়ে রাখার মতো একটা ছড়ার বই এটি। বিশ্বায়নের এ খর¯্রােতা সময়ে আমাদের শিশুরা যখন ভার্চুয়্যাল জগতে উড়াল দিতে ব্যস্ত তখন ছড়ার আমেজে গল্প আসরে ফিরিয়ে আনতে সফল প্রয়াস চালিয়েছেন এ প্রবীণ ছড়াকার। ২০১৭ সালের বইমেলায় তাঁর গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন অনুজপ্রতীম শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার কাদের বাবু ‘বাবুই প্রকাশনী, ঢাকা থেকে। ছড়ার সূচনাটা করেছেন অসাধারণ আবহে। তারপর চম্পাকলি পরীর নামকরণ এবং চেহারা বিবরণসহ বিভিন্ন লঙ্কাকা-ের বিবরণ দিয়েছেন। চম্পার পরিচয়ে তিনি বলেনÑ

এবার বলি/ চম্পাকলি

নাম ছিলো সে পরির

জোসনা মাখা শরির।

কাঁদলে পরে/ মুক্তো ঝরে

হাসলে চোখে পানি

পান্না ঝরে জানি।

শেষপর্বে এসে দারুণ চমক দিয়েছেন কবি একেএম শহিদুর রহমান। নানাবিধ বিড়ম্বনার পওে হলেও তিনি নায়ক-নায়িকার মিলন ঘটিয়েছেন নাটকীয় ঢঙে। তিনি শেষঅংশে উল্লেখ করেনÑ

দোলায় চড়ে/ শা-নজরে

চম্পাকলি হাসে/ কুমার তাহার পাশে

অই সে দূরে/ পালকি উড়ে

যাচ্ছে হাওয়ায় ভেসে

অচিন রাজার দেশে।

শিশুতোষ ছড়ায় যেমন তিনি নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে দেন শিশুদের সামনে তেমনি সামাজিক অসঙ্গতিকে ছড়ার চাবুকে শায়েস্তা করতেও পটু তিনি। ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয় তেমনি একটি চাবুকছড়া। দখল নামে প্রকাশিত সেই ছড়ায় তিনি সাহসের সাথে উচ্চারণ করেন সমস্ত অবৈধ দখলদারিত্বের প্রতিবাদে। তিনি লেখেনÑ

দখল দখল/ জমি দখল/ পাড়ায় পাড়ায়

দখল এবার/ চেয়ার দখল/ মানুষ হারায়

আগুন আগুন/ জ্বলছে আগুন/ কৃষ্ণচূড়ায়

দেখছে লোকে/ কেমন শোকে

ঝরছে পানি/ ‘নিরো’ও চোখে/ প্রসাদ চূড়ায়।

লেখক এবং সংগঠক হিসেবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও মূল্যায়নের খাতা তাঁর সমৃদ্ধ নয়। আমরা কেউ তাঁকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। করতে পারেনি দেশের কর্তাব্যক্তিগণ। করতে পারিনি আমরা যারা সাধারণ মানুষ। তবু তিনি যোগ্যতা বলে নিজেকে প্রশস্ত করে গেছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা সংগঠন কর্তৃক পদকপ্রাপ্ত হয়েছেন। দেশের বাইরে ভারতের শিলিগুড়ি, আসাম, গৌরীপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও সংবর্ধিত হয়েছে সাহিত্যেও গুণিমানুষ হিসেবে। ২০১১ সালে তিনি রংপুর পৌরসভার সিনিয়র সিটিজেন এওয়ার্ড এবং ২০১৫ সালে ‘রঙধনু ছড়াকার সম্মাননা’ ও সম্মিলিত লেখক সমাজ রংপুরের বইমেলায় গুণী সাহিত্যিক হিসেবে সম্মাননা পান। এছাড়া পল্লীকবি জসিম উদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ও ২০১৭ সালে ছড়া সংসদ থেকে বিশিষ্ট ছড়াকার সম্মাননা, ২০১৮ সালে রফিকুল হক দাদু মৌচাক ছড়া সাহিত্য সম্মাননাসহ বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জনক। তাঁর ছড়া সাহিত্য অত্যন্ত উঁচু মানের। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্য অঙ্গণের অনেক বড় ক্ষতি সাধিত হলো।

[লেখক: কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]

 

আরও পড়ুন