দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাই জীবন বদলে যাবে

হাবিবা মুবাশ্বেরা

আজ ৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। প্রায় ১৩ বছর আগে এরকমই এক নারী দিবসে আমিও নারী দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারী ছিলাম। তখন একটা বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায় জেন্ডার ইউনিটে কাজ করতাম। তাই চাকুরীর অংশ হিসেবে নারী দিবসের অনষ্ঠান আয়োজন করতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানে দেশের স্বনামধন্য অনেক নারী নেত্রীরা একটি বিশেষ রঙের পোশাক পরে আসলেন, নারীর অধিকার নিয়ে বক্তৃতা দিলেন। আমিও তাদের বক্তব্য নোট করে নিলাম, পরে রিপোর্ট লিখতে হবে তাই। একটা বিষয় ঐদিনই মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল যখন দেখলাম তারা ফরমাল আলোচনা শেষ হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলেন তখন তাদের টপিকস ছিল কে কোন পোশাকটা কোন দোকান থেকে কিনেছে, কোন গয়নার দাম কতো কিংবা বাসার বুয়া , কখনও বা বাচ্চার পড়াশোনা, টিচার এসব। তখন একটা বিষয় মনের মধ্যে খচখচ করতো, এই যে তারা এতক্ষণ লেকচার দিলো নারী স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে পুরুষের সমান সমান হতে হবে, সম্পত্তিতে সমান অধিকার দিতে হবে, চলাফেরা, পোশাক সব ক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ দিতে হবে …..ইত্যাদি ,ইত্যাদি তাহলে এরাও যখন নিজেদের মধ্যে গল্প করে তখন কেনো ছেলেদের মতো রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা খেলাধূলা নিয়ে গল্প করে না? কেন তারা ঘরের বাইরে এসেও ঘরের আলোচনাই করে???
তখন সেই প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
এত বছর পর এসে একটা শব্দে এই রহস্যের অর্থ খুঁজে পেলাম, সেটা হলো ফিতরাত। বাংলায় বলতে গেলে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতিগতভাবেই মেয়েরা এসব বিষয়ে আকষর্ণবোধ করে পোশাক, গয়না, ঘরকন্না, বাচ্চা প্রতিপালন প্রভৃতি, তা সে যত বড় নারী নেত্রী হোন না কেন!!

তাহলে নারী দিবসের তাৎপর্য কি? মানে এই দিবস পালন করে আমরা কি অর্জন করতে চাই তাহলে?

পুরুষের সমকক্ষতা??? এখানেও আমি কনফিউজড।। কেউ কখনও কারও সমকক্ষ তখনই হতে চায় যখন সে নিজেকে তার তুলনায় inferior মনে করে। তার মানে কি নারী নিজের অজান্তেই পুরুষদের superior মনে করে?? তাই তাদের সমান হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়?? তো এই superior হওয়ার মানদন্ড কি পুরুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী এটাই??

যদি তাই হয় তবে পুরুষ কি পারবে টানা দশ মাস সার্বক্ষণিকভাবে আরেকটা শরীরকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে? টানা দুই বছর আরেকটা শরীরকে নিজের শরীর থেকে খাবার সরবরাহ করতে? কিংবা ১৩-৪৩ অর্থ্যাৎ প্রায় ৩০ বছর প্রতি মাসে গড়ে ৫ দিন হলেও কমপক্ষে ১৮০০ দিন সার্বক্ষণিক শারীরিক একটা কষ্ট বয়ে বেড়াতে??
পারবে না, পৃথিবীর কোনো পুরুষ কোনো দিন পারেও নি। তাহলে ছেলেরা শারীরিকভাবে শক্তিশালী হলো কিভাবে?

নারী আর পুরুষের শারীরিক গঠন আলাদা এটাই মূল কথা এবং সেটা পৃথক দায়িত্ব পালনের জন্য পৃথকভাবে ডিজাইন করা। পাখি আকাশে উড়তে পারে আর মাছ পানির নিচে সাঁতার কাটে বলেই যেমন পাখি , মাছের চেয়ে superior হয়ে যায় না তেমনি নারী ঘরে থেকে গৃহস্থালী কাজ করলে , সন্তান উৎপাদন, প্রতিপালন করলে আর পুরুষ বাইরে গিয়ে অন্য কাজ করলেই পুরুষ নারীর চেয়ে superior হয়ে যায় না। পাখির শারীরিক গঠন যেমন আকাশে উড়ার জন্য ডিজাইন করা তেমনি মাছের শারীরিক গঠন পানির নিচে সাঁতার কাটার জন্যই ডিজাইন করা। আর এই ডিজাইন করেছেন স্বয়ং স্রষ্টা, যিনি মাছ, পাখি, নারী, পুরুষ সবাইকেই ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক গঠনে তৈরি করেছেন। তাই যে কোনো সৃষ্টি যতই চেষ্টা করুক না কেন আরেকটি সৃষ্টির মতো হতে পারবে না।

তবে কি এই ২০২০ সালে এসেও নারী শুধু সংসারের চার দেয়ালেই আটকে থাকবে? তার মেধা থাকলে কি সেটা কাজে লাগাবে না? অবশ্যই । তবে সেটা কখনই পুরুষের সমান হওয়ার জন্য নয়। স্রষ্টা তাকে যে মেধা দিয়েছেন তা কাজে লাগিয়ে সে যদি পরিবারের, সমাজের উপকার করতে চায় তবে সে তা করতে পারে তবে সেটা যেন কখনই “আমিও ছেলেদের মতো পারি”——এটা প্রদর্শনের জন্য না হয়। আরেকজনের মতো হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা যেন পক্ষান্তরে নিজেকেই ছোট না করি। আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন, কোনো সৃষ্টির অনুরূপ হওয়া নয়।

সবশেষে বলতে চাই, যদি আদতেই আধুনিক নারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে চান তবে জ্ঞানার্জন করুন। দুনিয়াবী এবং দ্বীনি উভয় ধরনের জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজেকে সবসময় আপডেট রাখুন। নারী বলে শুধু প্যারেন্টিং, দাম্পত্য, পোশাক, গয়না এসব বিষয়ে আলোচনা, সমালোচনা করে জীবনের মূল্যবান সময় কাটিয়ে দিবেন না প্লিজ।

‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে’…..অর্থ্যাৎ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যখন সবধরনের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ আপনার হাতের মুঠোয় তখন সেটাকে কাজে লাগান। যদি সত্যিই পুরুষদের সমক্ক্ষ হতেও চান তবে সেটা জ্ঞানে হওয়ার চেষ্টা করুন, শারীরিক সক্ষমতায়, পোশাকের সাদৃশ্যে বা সর্বত্র বিচরণের স্বাধীনতায় সমকক্ষতার সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় না।
Trust me আপনি যদি জিনস্, টিশার্ট পড়ে , হাই ফাই রেস্টুরেন্টে বসে মেকাপের ব্র্যানড বা চুলের কালার নিয়ে আলোচনা করেন তবে পুরুষদের দৃষ্টিতে আপনি যতটা না সম্মান পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মান ঘরে থেকে ,পর্দা নষ্ট না করে অনলাইনে আইন , অর্থনীতি কিংবা চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শ দিয়ে পেতে পারবেন।

তাই আসুন, জ্ঞানার্জন. চিন্তা-ভাবনার বিষয নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করি, তবেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সমসাময়িক সমস্যা সমাধানের উপযোগী মডার্ণ নারী হতে পারবো।

লেখকঃ সাহিত্যিক। 

আরও পড়ুন