দৃষ্টির অন্তরালে ( পর্ব ১)

হাবিবা মুবাশ্বেরা

প্রায় ১৫ বছর পর বিদেশ থেকে গ্রামে ফিরেছে হায়দার। বিগত বছরগুলোতে গ্রামের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে দেখে বেশ ভালো লাগছে ওর। রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, বাড়িতে বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ বেড়েছে, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট তৈরি হয়েছে, গ্রামের অধিকাংশ শিশুই স্কুলে যায়, বাল্যবিবাহ কমেছে, নবজাতক শিশু ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যুও কমেছে। তবে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন বোধহয় হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। গ্রামের তরুণদের হাতে হাতে মোবাইল, তাতে আবার ইন্টারনেট সংযোগ। সারা বিশ্বের সাথে তাদের কানেকশনের প্রভাব তাদের পোশাকের ডিজাইন, চুলের কাটিং, চালচলন আর কথার ফাঁকের শব্দচয়নে স্পষ্ট ।

যাক, গ্রামটা তাহলে সবদিক দিয়েই অনেক এগিয়ে গেছে। বিদেশে আর ফিরে না গিয়ে এবার দেশেই থেকে যাবে কিনা ভাবছিল হায়দার। বাজারের মধ্যে চায়ের দোকানে বসে পুরনো বন্ধুদের সাথে এই বিষয় নিয়েই আলাপ করছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলো নারী, পুরুষ, শিশু, তরুণ, বৃদ্ধের একটি দল বিভিন্ন সাইজের বোতল হাতে নিয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তের দিকে ছুটছে।

“কি ব্যাপার, সবাই এভাবে বোতল হাতে কোথায় যাচ্ছে?” অবাক কন্ঠে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল হায়দার।
সুজন নামে ওর এক বন্ধু বলল, “গ্রামের শেষ প্রান্তে পুরানো বট গাছের নিচে একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি এসেছেন ১৫ দিন আগে। তার কাছেই যাচ্ছে সবাই। উনার ফুঁ দেয়া পানি খেলে সবরকম সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তাই বোতল নিয়ে যাচ্ছে ফুঁ দেয়া পানি নিতে।”

“অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি!!!! ধুর কি যে বলিস তোরা? এই যুগে আবার কেউ এসব বিশ্বাস করে নাকি? গ্রামের অবকাঠামোর এত উন্নতি হলেও তোদের মন-মানসিকতার কোনোই পরিবর্তন হয়নি দেখছি।” ব্যঙ্গ করে বলল, হায়দার।

মিলন নামের আরেক বন্ধু বলল, “এসব উন্নয়নের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক বের করতে চাইছিস কেন তুই? উনি আল্লাহর অনেক বড় ওলী। উনার যা ধর্মীয় জ্ঞান আছে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তা আছে নাকি? উনার উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত আছে বলেই তো উনি অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারেন এবং এমন সব সমস্যার সমাধান দিতে পারেন যা এত বছর কেউ পারেনি।”

“কী এমন অলৌকিক ক্ষমতা আছে উনার ??” অনেকটা তাচ্ছিল্যের সুরেই জানতে চাইল হায়দার।

সুজন উৎসাহের সাথে বলল, “উনি শূণ্যে ভেসে থাকতে পারেন ,পাথরকে স্বর্ণে পরিণত করতে পারেন……আরও এমন অনেক কিছু। উনার এসব অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলেই তো গ্রামের মানুষ উনার কাছে যাচ্ছে । শুনেছি সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে উনার জন্য একটা ভালো থাকার ব্যবস্থাও করে দিবে যেন উনি এই এলাকাতেই রয়ে যান।”

“আসলে তুই-ই অনেকদিন বিদেশে থেকে নাস্তিক হয়ে গেছিস, তাই উনাকে অবিশ্বাস করছিস। ”মিলন বলল হায়দারকে উদ্দেশ্য করে।

আর হায়দার মনে মনে ভাবতে লাগলো, আসলেই কি  ঐ ওলীর অলৌকিক ক্ষমতা আছে ? নাকি লোক ঠকানোর জন্য স্রেফ ভাওতাবাজি ? কিন্তু এই ধোঁকাবাজিটাই বা সে করছে কিভাবে? এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পেল না হায়দার।
………………………………………………………………………………………………

উপরের কাহিনীর হায়দার ও তার বন্ধুদের মতো আমরাও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যাপারে দুটি প্রান্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হই। একদল অন্ধভাবে তাদের বিশ্বাস করে তাদের মাধ্যমে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই ,আরেক দল তাদের সবকিছুই ধোঁকাবাজি, কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিতে চাই।

অথচ সত্যিটা হল –এসব তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ  লেভেলে গিয়ে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে– ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। বরং এসব কিছুই তারা করে জ্বীনদের সাহায্য নিয়ে।

সমস্যা হচ্ছে আমরা অনেকেই মুসলিম হওয়া স্বত্ত্বেও জ্বীনের অস্তিত্বের বিষয়টা ভুত-প্রেতের সাথে মিলিয়ে ফেলি এবং এগুলোকেও কুসংস্কার বা অবৈজ্ঞানিক হিসেবে অস্বীকার করে বসি। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে জ্বীনজগতে বিশ্বাস আমাদের ঈমানের অংশ, কারণ পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বহু জায়গায় এদের ব্যাপারে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে সবার প্রথমে বলা যায় সূরা নাসের কথা। ছোট্ট এই সূরাটি আমাদের অধিকাংশের হয়তো মুখস্থ আছে, নিয়মিত নামাযে পড়েও থাকি হয়তো বা। কিন্তু অর্থ না বুঝে পড়ি বলে জানিও না যে এখানে আল্লাহ আমাদেরকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন কুমন্ত্রণা দানকারী মানুষ ও জ্বীনের অনিষ্ট থেকে! সুতরাং জ্বীনদের অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

হাদীস ও কুরআন থেকে আমরা জ্বীনদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারেও জানতে পারি। যেমন- তারা দ্রততম সময়ে অধিক দুরত্ব অতিক্রম করতে পারে (২৭:৩৯-৪০), বিবিধ রূপ ধারণ করতে পারে, মানুষের ধমনীর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ তাদেরকে তাদের মূল আকৃতিতে দেখতে না পেলেও তারা মানুষকে দেখতে পারে(৭:২৭)।

জ্বীনদের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো কাজে লাগিয়েই তথাকথিত অলৌকিক ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। একটা খুব সাধারণ উদাহরণ হলো- কেউ শূন্যের উপর ভেসে আছে দেখে সাধারণ মানুষ হয়তো তাকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভেবে অভিভূত হয় অথচ  আসল ব্যাপারটা হচ্ছে তাকে সাহায্যকারী জ্বীন হয়তো তাকে হাত দিয়ে তুলে রেখেছে । যেহেতু জ্বীনদের মানুষ দেখতে পায় না তাই সাধারণ মানুষ সেই শূণ্যে ভাসতে সক্ষম মানুষটিকেই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ভেবে বিভ্রান্ত হয় । এভাবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে জ্বীনদের বিভিন্নমুখী সহায়তায় তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা তাদের বিশেষত্ব জাহির করে।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

হাবিবা মুবাশ্বেরা সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন