বাঙালি পুরুষের বউ

বাঙালি পুরুষের বউ মানেই কিন্তু বাঙালি হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। বাঙালি পুরুষের বউ হতে পারে যে কোন দেশের বিদেশিনী, থাই, চাইনিজ জাপানি থেকে শুরু করে ইন্রেজ আমেরিকান কোন দেশ এখানে বাছবিচারের কিছু নেই। বাঙালি যতো যাইহোক একটি শংকর জাতি। অভিযোজনের ক্ষমতা আছে বিধায়ই এমন শংকর জাতি হয়ে উঠতে পেরেছে বাঙালি। বরং ভিনদেশী বিবাহে বাঙালির আগ্রহ আকাশচুম্বী। একদিন এক বড় ভাইয়ের বিদেশী কন্যা বিয়ে করার পড়ে ছবির পোস্টে একজন কমেন্ট করেছে , ভাই ঘটক অফিস খোলেন , বিদেশী ফর্সা মেয়ে বিবাহ করিতে চাই। একটা জাতি কতোটা মেরুদণ্ডহীন হলে এই ধরণের ভিক্ষা করতে পারে সেটা সুধীজনেরাই বলবে।

বাঙালি বউ আর বাঙালি পুরুষের বউ(বাঙালির বউ) এই দুটা বিশেষণের মাঝে তাই বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। নামে যেমন পার্থক্য কাজেও ঠিক তাই। বাঙালি পুরুষের বউ স্বামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিউইয়র্কে রেস্টুরেন্ট চালানো থেকে শুরু করে নোবেল পর্যন্ত জিতে যেতে পারে সফলভাবে। কিন্তু বাঙালি বঁধুর জন্য হাড়িপাতিল সামলানোই বেশ ঝক্কির কাজ। এতে বাঙালি মেয়েদের এককভাবে দোষ দেওয়া যায়না, দোষ দেওয়া যায়না পুরুষকেও আবার শুধু সমাজ বা প্রথাকেও দেওয়া যায়না যদিও দোষ কমবেশি সব পক্ষেরই আছে।

পরিবর্তনের চেষ্টাটা নারী পুরুষ শিক্ষিত অশিক্ষিত কারো মাঝেই খুব বেশি নেই। বিয়ের পরে পেন্সিল কলম ধরতে হাত কাপে এরকম বাঙালি নারীর সংখ্যা শতকরা অর্ধেকের বেশি হবে। শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি আশাব্যাঞ্জক হলেও সত্যিকার অর্থে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য বা সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য শিক্ষিত খুব কম নারীই হচ্ছেন। এরপর শিক্ষিত হলেও সমাজের সমস্ত নিয়ম রক্ষার স্বার্থে ভালো বউ ভালো স্ত্রী ভালো মেয়ে /মা হওয়ার গোলকধাঁধায় পড়ে কোনোরকম চাকুরী আর সংসার ধর্ম নিয়ে বাঙালি নারীর লেজেগোবরে অবস্থা।

লোকপ্রশাসনের ছাত্রী হিসেবে জেন্ডার এ্যাণ্ড এ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামক একটি কোর্স পড়েছিলাম। জেনেছিলাম একই অফিসে সচিব স্ত্রী উপসচিব স্বামী, একই সময়ে দুজন ঘরে ফেরেন। অফিসে স্ত্রীর পদমর্যাদা বেশি হলেও বাড়িতে উনি বাঙালি বধূ। স্বামী এসে সোফায় গা আর তেপায়ায় পা এলিয়ে দিলেও উনি রান্নাঘরে চটজলদি এক কাপ চা চড়িয়ে দেন স্বামীর জন্য। এরপর বাড়ির সবার খবর নেন, সন্ধ্যার নাস্তার ব্যবস্থা করেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে একজন বাঙালি নারী পুরুষের জিহবার রসনাবিলাস মেটাতে যে পরিমাণ শ্রম দেন, তার ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় ও কী  একটা বই পড়াতে ব্যয় করেন?

ভার্জিনিয়া উলফের বই নিজের একটি কামরা পড়ে জেনেছিলাম কেন শেক্সপিয়ারের কোন মহিলা ভার্শন কোনোদিন হবেনা।  মহিলাদের সেই  প্রতিভা নেই ভার্জিনিয়া উলফ যদিও তা বিশ্বাস করেননা কিন্তু সুযোগের কারনে, নিজের একটা ঘর একটা পড়ার টেবিলের অভাবে বহু ভবিষ্যৎ লেখিকার জন্মই হয়না।

২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জি আর তার স্ত্রী এসথার ডাফলোর কথাই ধরা যাক। বেশিরভাগ বাংলা পত্রিকারই লেখার ভাব এরকম যে বাঙালি অভিজিৎ এবং তার স্ত্রী নোবেল জিতেছেন । অভিজিৎ ব্যানার্জির স্ত্রী,  যার একটি নাম আছে, পরিচয় আছে, যিনি একটি বিষয়ে সত্যিকারের স্কলার তার পরিচয়কে একজনের স্ত্রী বিশেষত একজন বাঙালি পুরুষের স্ত্রী হিসেবে ফলাও প্রচার করাটা চিন্তার দৈন্যতা বৈ কী! সন্দেহ নেই এসথার ডাফলো একজন বাঙালি পুরুষের বাঙালি বঁধু হলে চুলা জ্বালাতে জ্বালাতে আর হাজার বছরের প্রথা সংসারের সব কাজ শুধুই নারীর এই সংস্কৃতি পালন করতে করতে কোনোদিনই নোবেলের ধারে কাছে যেতে পারতেন না। আজ তিনি বাঙালি নন বলেই বাঙালি পুরুষের বউ হওয়া সত্ত্বেও এই সীমা অতিক্রম করতে পেরেছেন, তার স্বামী ও একজন আধুনিক উদারমনা মানুষের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে।

তার্কিশে হাজব্যান্ড বা ওয়াইফ বুঝাতে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয় –এশ,এশ শব্দটির মানে সমান। ভাষার প্রয়োগ থেকেই বোঝা যায় একটি দেশের সংস্কৃতি। ইউরোপ আমেরিকা সেই সমঅধিকারের সংস্কৃতি লালন করে, তার্কিও ব্যতিক্রম নয়। ব্যতিক্রম এই উপমহাদেশ, এর মানুষদের চিন্তাধারার গতিপথ। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন স্বামী যখন সূর্য থেকে পৃথিবী বা গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব মাপায় ব্যস্ত , স্ত্রী তখন বালিশের দৈর্ঘ্য মাপেন! বাঙালি সমাজে অভিজিৎ ডাফলোর মতো একই চিন্তায় মগ্ন, একই চিন্তা ভাবনা শেয়ার করে একটি ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখাটা সামাজিক বা সাংসারিক কর্মজাল বা সেটাপের কারনেই বেশ কঠিন এবং দুঃসাধ্য বিষয়। একজন অভিজিৎ নিঃসন্দেহে গতানুগতিক ৯৯ জন বাঙালি পুরুষের মতো নন, সুতরাং এসথার ডাফলোকে বাঙালি পুরুষের বউ হিসেবে বিশেষায়িত না করে তার নিজ পরিচয়ে বিশেষায়িত করাটাই বোধহয় সবচেয়ে শ্রেয়।

·       শেখ সাফওয়ানা জেরিন

আরও পড়ুন