বাবু ভাইয়েরা কেন সংবাদ মাধ্যম ছাড়ছেন?

রফিকুল ইসলাম মন্টু

বাবু ভাই সাংবাদ মাধ্যম ছেড়েছেন!! এটা ভাবা যায়? বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকের তালিকায় যার নাম প্রথম দিকে, তিনিই যদি সাংবাদিকতা ছাড়েন; তাহলে সাংবাদিকতা করবেটা কে? হ্যাঁ, বদরুদ্দোজা বাবু ভাইয়ের কথাই বলছি। টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যিনি দর্শকের সামনে তুলে এনেছেন নতুন নতুন বিষয়; তাকে কেন চলে যেতে হলো পেশা ছেড়ে? এটা কী সংবাদ মাধ্যমের জন্য ভালো হলো, নাকি খারাপ? এই ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের সামনে কী প্রশ্ন এঁকে দেয়? আগামীর জন্য কী ইঙ্গিত বহন করে? পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রশ্নগুলোই মাথায় ঘুরছিল। বাবু ভাই নতুন কর্মস্থলে যোগদানের চারদিনের মাথায় ছোট করে একটু লিখতে ইচ্ছে হলো।

বদরুদ্দোজা বাবু একা নন, এই দল এরই মধ্যে অনেক বড় হয়েছে। সাংবাদিকতা পেশায় খুব ভালো করেও এ জগৎ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। নাম লিখতে গেলে তালিকা অনেক লম্বা হবে। আমরা যদি একটু কাগজ কলম নিয়ে বসি, গত পাঁচ বছরে এমন অনেকজনকে পাবো, যারা সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছেন। এর প্রমাণ বহন করে কিছুদিন আগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি- ডিআরইউ’র একটি নোটিশ। এতে পেশা বদলের কারণে শতাধিক সাংবাদিকের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে- নাম উল্লেখসহ। সাংবাদিকদের পেশা বদল এখন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন নেই, পেশা ছেড়ে দেওয়া ২০জন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বললেই আমরা পেতে পারি অনেক গুরুত্বপূর্ন পয়েন্ট। সেখান থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝে নিতে পারবো আমাদের সংবাদ মাধ্যমের ভেতরকার অবস্থা।

বাবু ভাইয়ের সংবাদ মাধ্যম ছাড়ার পেছনের গল্প আমরা জানি না। তবে এ কথা প্রায় সকলেই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে ‘মানিয়ে চলা’ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরি থাকবে কী না, কিংবা আপনি স্পেস কতটুকু পাবেন- তা নির্ভর করে ‘বসের’ সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কতটা নিবিড়, তার ওপর। আর বিষয়-বৈচিত্র্যের দিকে তাকালেও দেখতে পাই, সংবাদ মাধ্যম অনেকটাই প্রতিদিনকার কথা বা ঘটনা নির্ভর হয়ে পড়েছে। কোন কারণে মন্ত্রী-নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে দিলে এদেশে সংবাদ মাধ্যমের চলতে বোধহয় একটু কষ্টই হবে। আরেকটি প্রবণতা হচ্ছে- সংবাদ মাধ্যম তাকিয়ে থাকে, কখন একটি বড় ঘটনা ঘটবে? নুসরাত, মিন্নি, কল্লা কাটা, ডেঙ্গু- এগুলোই যেন মিডিয়াকে সচল রেখে চলেছে বছরের পর বছর। এই যখন অবস্থা তখন বিশেষ খবরের স্থান কোথায়? আর বিশেষ খবর কিংবা অনুসন্ধানী কোন বিষয়ের পরিকল্পনা না থাকলে বদরুদ্দোজা বাবু ভাইদের মত সাংবাদিকও বোধ হয় সংবাদ মাধ্যমে প্রয়োজন নেই।

শুধু বাবু ভাইয়ের কথা বলি কেন- ভিন্নধারার কিছু করার প্রয়াস নিয়ে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। তাদের খোঁজ কেউ রাখেন না। সাংবাদিকতা পেশায় আসার মানে কিছু সৃষ্টি করা, নতুন কিছু করা। এটা স্রেফ ফরমায়েসি চাকরি নয়। সুতরাং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারার সুযোগটাই এখানে প্রাধান্য পাওয়া উচিৎ কিন্তু পায় না। অতিমাত্রায় বানিজ্যিক মনোভাব সংবাদ মাধ্যমকে কোন পথে নিচ্ছে, আমার জানা নেই।

যা’হোক, সংবাদ মাধ্যম বদরুদ্দোজা বাবুকে হারালেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা থেকে হারিয়ে যাবেন না বদরুদ্দোজা বাবু। তিনি এখন “Head of Investigative Journalism Helpdesk at Management and Resources Development Initiative”। নিজে অনুসন্ধান করবেন না; এখন অনুসন্ধান করতে সাংবাদিকদের সহায়তা করবেন। তার কাজের পরিধি এখন আরও বিস্তৃত। একই সঙ্গে ভাববেন অনেক বিষয় নিয়ে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়- সংবাদ মাধ্যম যখন শুধু মন্ত্রী-নেতাদের বক্তব্য আর ঘটনা নির্ভর হয়ে পড়েছে, সেখানে বাবু ভাই কাকেই বা সহযোগিতা করবেন? সেই সহযোগিতার আউটপুট-ই-বা কোথায় প্রতিফলিত হবে?

তবুও আমরা আশাবাদী। আশায় বুক বাঁধি। একটা নতুন কিছু হাজির হবে আমাদের সামনে। এরই পথ ধরে হয়তো একদিন বদলাবে সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি। বদরুদ্দোজা বাবু ভাইয়ের জন্য শুভ কামনা। নতুন কর্মস্থলে আসুক সাফল্য।

প্রতিবেদকঃ উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক

আরও পড়ুন