বিজয়ের মাসে কেমন আছেন মুক্তিযোদ্ধারা -এইচ বি রিতা

বিজয়ের মাসে কেমন আছেন মুক্তিযোদ্ধারা!
-এইচ বি রিতা
ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে, আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়। এই বিজয় যাঁদের জন্য সম্ভবপর হয়েছিল, তাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন যাঁরা শারীরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ স্বাধীন করার প্রত্যয়ে দৃঢ় ও সহায়ক ছিলেন, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানুষের নিরাপত্তায় ত্রাণ বিতরণসহ চিকিৎসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন যাঁরা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনায় সাংবাদিক, ভাষ্যকার ও শিল্পী, যুদ্ধরত সৈনিকদের আশ্রয়দাতা ও গোয়েন্দা ছিলেন যাঁরা, যুদ্ধকালীন সময়ে যেসব নারীরা খাদ্য ও সেবা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন, রাজাকার ও পাক বাহিনীর হাত থেকে নানা ছলেবলে মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে নিরাপদ রেখেছেন—তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা।
বিজয়ের মাসটি এলেই আমাদের সাজ-সজ্জা বদলে যায়। চারদিকে লাল-সবুজের সমারোহে বিজয়ের মাসটি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই মাসটিকে সামনে রেখে মিটিং-মিছিল, সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি সর্বব্যাপী আয়োজনের মধ্য দিয়ে আত্মত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকে স্মরণ করতে আমাদের ব্যস্ততার কোনো সীমা থাকে না। কিন্তু বিজয়ের এই মাসে আমরা কেউ স্মরণ করি না সেই সব অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নিজ বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানদের নির্মমভাবে পিটিয়ে জখম করা হয়। সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোনো সভা হয় না, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিবেশী কারও দয়ার ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকে, যাঁরা রেললাইন অথবা কোনো বস্তির এক কোণে ঘুপচি ঘরে বসবাস করেন। লাল-সবুজের পতাকা ওড়ে না সেই সব মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে, যাঁরা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েও রিকশা, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলতাজ মিয়া। বয়স এখন প্রায় ৭৩ বছর। ১৯৭১ সালে তিনি দেশের জন্য কমান্ডার মেজর আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি রামু উপজেলার উখিয়া, মরিচ্যাসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের এই বীর সৈনিক আলতাজ মিয়া অল্প শিক্ষিত হওয়ায় নিজ অধিকার আদায়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দপ্তরগুলোতে পৌঁছাতে পারেননি। আর তাই স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাননি আলতাজ মিয়া। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সামান্য ভিটে-মাটিতে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার তাঁর। বীর এই মুক্তিযোদ্ধা আজ একজন রাখাল বলেই এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত।

নড়াইল জেলার পাইকড়া গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জন্ম হয় মুক্তিযোদ্ধা মীরা রানী সরকারের। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তিনি টালিখোলা মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণসহ কলকাতা জাদুঘরের পেছনে ১২ দিন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগানোর কাজ দেওয়া হয়। তিনি ভারতের হেলাঞ্চা, বাগদা, গোপালনগর, চাঁনপাড়া মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙা করার জন্য নানাভাবে সাহস জোগান। ঝিনাইদহ ও যশোরের বিভিন্ন শিবিরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রূষা ও সহযোগিতা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে নগদ এক হাজার টাকা সম্মাননা পান তিনি। মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা পেলেও শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা মীরা রানী সরকার আজ টাকার জন্য ভালো কোনো চিকিৎসক দেখাতে পারছেন না।

শরিফুজ্জামান খান স্বপন। এলাকায় তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভাই’ নামে পরিচিত। তেজগাঁও ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল স্কুল/কলেজে (বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান কলেজ) অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। টিবিতে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে তাঁর ফুসফুসের কার্যকারিতা পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। উনি এখন স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে সংসার চালাতে অন্যের দোকানে একটু জায়গা ভাড়া নিয়ে চা-পান শিঙাড়া বানিয়ে বিক্রি করছেন। অসুস্থতার কারণে একদিন দোকান চালালে দুদিন বিছানায় পড়ে থাকেন। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শরিফুজ্জামান খান স্বপনের নাম কোনো মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই।

কিশোরগঞ্জ বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের অবহেলিত ও আলোহীন একটি গ্রামের নাম রুস্তমপুর। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে হারিয়ে অভাব অনটনে হতাশার মধ্যে দিন কাটছে বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিত চন্দ্র নমদাদের। বয়স ৭০-এর কাছাকাছি। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা বর্ডারসংলগ্ন সিংরায় ছয় মাস প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার শফিউল্লাহর নেতৃত্বে বাজিতপুর উপজেলার সরারচর বাজার, কটিয়াদী উপজেলার মানিকখালী বাজার, গচিহাটা ও কিশোরগঞ্জ সদরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কখনো সম্মুখ যুদ্ধে, আবার কখনো গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। আজ বীর এই মুক্তিযোদ্ধা পাগলের মতো রাস্তায় প্রলাপ বকেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে রাতভর মারধর করার ঘটনাও আছে। রাস্তায় হেঁটে অহেতুক প্রলাপের কারণে ছয় মাসের জেলও খেটেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিত চন্দ্র নমদাদর। তাঁকে আজ লোকে চেনে ‘রঞ্জিত পাগলা’ নামে।

পাবনার চাটমোহর উপজেলার বড়াল নদীপাড়ের বোঁথড় গ্রামে জন্ম মুক্তিযোদ্ধা আসালত আলীর। ভারতের কচুয়াডাঙ্গায় দু মাসের প্রশিক্ষণ শেষে দার্জিলিংয়ে ২১ দিনের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এর পর যোগ দেন তাড়াশের নওগাঁ এলাকায় লতিফ মির্জার পলাশডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা যুবশিবিরে। সেখানের নওগাঁ হাটে প্রায় সাত-আট শ হানাদারকে খতম করার এক ভয়াবহ যুদ্ধে শামিল হন তিনি। দেশ স্বাধীন হলো। মাসহ ১০ ভাই-বোনের সংসার টানতে রিকশার প্যাডেলে পা রাখলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ভাগ্যক্রমে চাটমোহরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চৌকিদারের একটি চাকরি জুটে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরির সুযোগ হয়নি তাঁর সন্তানের।

খঞ্জনী বেগমের কথা আজকের তরুণ সমাজ জানেন কি? ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদারবাহিনী জগন্নাথ দীঘিসংলগ্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে। সোনাপুর গ্রামে তখন নারীদের ওপর চলতে থাকে শারীরিক নির্যাতন। এরই মধ্যে ক্যাম্পের হাবিলদারের নজর পড়ে সুন্দরী বিধবা দুই সন্তানের মা আফিয়া খাতুন চৌধুরী ওরফে খঞ্জনীর ওপর। তাকে হাবিলদারের হাতে তুলে দিলে গ্রামে অন্য নারীদের ওপর নির্যাতন করা হবে না বলে জানায় তারা। ১৯৭১ সালের জুন মাসে স্থানীয় রাজাকার নুরুল ইসলাম নুরু ওরফে নুরু মিয়া, আফজ উদ্দিন ফজল হক ও তার মা জোর করে খঞ্জনীকে হানাদারদের জগন্নাথ দিঘি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ওই রাতেই হাবিলদার বিয়ে করেন খঞ্জনীকে। বিয়ের পরের মাসে উক্ত হানাদার মারা গেলেও ৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাক হানাদারদের ক্যাম্পেই থাকতে হয় তাঁকে। এর বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত সোনাপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আর কোনো নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়নি। নিজের ইজ্জত দিয়ে শুধু গ্রামের মেয়েদের সম্ভ্রমই রক্ষা করেননি খঞ্জনী, আশপাশের অনাহারী অভাবী মানুষজনদের জন্য কৌশলে পাক হানাদারদের ক্যাম্প থেকে খাবার চুরি করে তাদের জীবনও রক্ষা করেছেন। কিন্তু নিজে নির্যাতিত হয়ে পুরো গ্রামের নারীদের নিরাপদে রাখা এই নারী বিতাড়িত হন নিজ ঘর থেকেই! আজও তিনি পাননি বীরাঙ্গনা খেতাব। বর্তমানে তিনি নিজ এলাকায় ও সমাজে নষ্টা বলে পরিচিত। বর্তমানে তিনি আছেন কুমিল্লা নগরীর পূর্ব বাগিচাগাঁওয়ের বড় মসজিদসংলগ্ন বড় মসজিদের ওয়াক্ফ এস্টেটের বস্তির দুকক্ষের একটি খুপরি ঘরে, মেয়ের কাছে।

খঞ্জনী বেগম, আসালত আলী, শরিফুজ্জামান খান স্বপন, মীরা রানী সরকার, আলতাজ মিয়া, রঞ্জিত পাগলার মতো এমন আরও বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশে আজ অলিখিতদের তালিকায় অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন। তাদের কথা লিখতে গেলে ইতিহাস বদলাতে হবে। তাদের অধিকার তুলে ধরতে গেলে পুরো সমাজকে সংস্কার করতে হবে। তাদের বীরত্বকে মর্যাদা দিতে গেলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো নড়ে উঠবে।
বাংলার এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় আজ বড় অসহায়। মাছ জোটে না তাঁদের মোটা চালের ভাতের থালায়। ৭১-এর আগুনে পোড়া তামাটে চামড়ার খোলসে আটকা পড়েছে তাঁদের হাহাকার, হতাশা ও নীরব কান্নার ধ্বনি। তাঁদের ছানি পড়া চোখে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে রূঢ় বাস্তবতা। বিজয়ের ধ্বনি তাঁদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাঁরা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, নিজ অধিকার-সম্মান থেকে প্রতারিত হয়ে রাত কাটান গভীর হতাশা বুকে নিয়ে। স্বাধীনতার উল্লাস তাঁদের মনে করিয়ে দেয় ৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোর কথা। তাঁদের হাহাকার ছাপিয়ে তবু বিজয়ের মাসে আমরা স্বাধীনতার উল্লাসে মেতে উঠি। আমরা ভোগ করি স্বাধীনতা, স্মরণ করি বীরদের বীরত্বের কথা। আমরা ভুলে যাই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া পোড় খাওয়া সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, যাঁরা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশকে উপহার দিতে গিয়ে সব হারিয়েছেন। আমরা ভুলে যাই তাঁদের দেওয়া বাংলাদেশে আজ তাঁরাই না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অপমানে-লাঞ্ছনায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঠিকই বলেছিলেন—

‘বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে,
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিল।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার।’

লেখিকা -এইচ বি রিতা
পেশায় শিক্ষক হলেও কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী হিসেবে সমাদৃত । প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নিয়মিত লেখিকা তিনি, সোস্যাল মিডিয়াতে লেখিকা তিনি ডার্ক এভিল নামে পরিচিত ।

আরও পড়ুন