বিশ্ব গার্লগাইডসএর ইতিহাস ও এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য

 

বিশ্ব গার্ল গাইডস ও গার্ল স্কাউটস সংস্থা ওয়ার্ল্ড এসোসিয়েশন অব গার্ল গাইডস এবং গার্ল স্কাউটস (ওয়াগন) এর প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট স্টিফ্যান্স স্মিথ ব্যাডেন পাওয়েল উপলব্ধি করেন ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরকেও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্য করে তোলার প্রয়োজন। এজন্য তিনি ছেলেদের স্কাউট দলের পাশাপাশি মেয়েদের পৃথক সংগঠনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। এই উপলব্ধি হতেই ১৯০১ সালে তিনি বালিকা, কিশোরী ও তরুণীদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম, যা পরবর্তীতে ‘গার্ল গাইডস’ নামে আত্ম প্রকাশ করে। এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন তার যোগ্য সহধর্মিণী লেডি ওলেভ সেইন্ট কেয়ার সোমস।পৃথিবীর ১৪৬টি দেশের অন্যতম এই সংগঠন বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশন।

উনিশ শতকের গোড়ার কথা, সে সময় খোদ ইউরোপেও মেয়েরা বহির্জগতের কোন কাজ করতে পারতোনা। মেয়েদের শিক্ষালাভের সুযোগও সেসময় ছিল খুব কম।অন্দরমহলের সৃজনশীল কাজে আটকে ছিল তাদের জীবন।নতুন শতাব্দীতে মেয়েরা স্বপ্ন দেখেছিল পুরুষের পাশে চলার স্বাধীনতা। লর্ড স্টিফেন স্মিথ ব্যাডেন পাওয়েল ছিলেন পেশায় একজন সৈনিক। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে তিনি চিন্তা করতে থাকলেন যে যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সৈনিকদের নিজ উদ্যোগ ও রিসোর্সের ভিত্তিতে ট্রেনিং দিতেন,সেই ট্রেনিং যুবকদের মাঝে অবসর কালীন সময়ের বিনোদন হিসেবে কাজে লাগিয়ে যুবকদের সামাজিক কাজে সংগঠিত করা যায়। তার এই উদ্যোগ অভূতপূর্ব সাড়া পায়।১৯০৮ সালে এই আন্দোলন সরকারি মর্যাদা লাভ করে এবং ১৯০৯ সালে ৪ সেপ্টেম্বর লন্ডনের “ক্রিস্টাল প্যালেসে” সর্ব প্রথম “সর্ব ইংল্যান্ড স্কাউট র‍্যালী” অনুষ্ঠিত হয়। সেই র‍্যালীতে দুহাজার বয়স্কাউটসের সাথে মাত্র এগারোজন বালিকা স্বঘোষিত গার্ল স্কাউটস হিসেবে অংশগ্রহণ করে। তখন লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল তাদের দেখে বিস্মিত হন এবং ঐ মুহূর্তে তাদের ফিরিয়ে দিলেও তিনি তাদের নিয়ে ভাবতে থাকেন যে ছেলেদের জন্য দল থাকলে মেয়েদের জন্য কেন নয়।এই ভাবনা থেকে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ভগিনী সংগঠন “গার্ল স্কাউট ” নামে গড়ে তোলেন যার দায় দায়িত্ব দেন তার বোন এ্যাগনেস ব্যাডেন পাওয়েলকে।তার ভগ্নি “স্কাউটিং ফর বয়েজ” বই থেকে লিখলেন “হাউ ক্যান হেল্প দ্যা এম্পায়ার”।তিনি গাইডদের একটা কোম্পানি চালু করেন।কোম্পানির নাম দেন ” মিস ব্যাডেন পাওয়য়েল ওন”। এদের নাম দিলেন লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল “গাইড” নাম দিলেন।এ্যাগনেস ব্যাডেন পাওয়েল এই দলের সাংগঠনিক রুপ দিবার পর এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে “গার্ল গাইডস হেড কোয়াটার” তৈরী করেন।১৯১০ সালে সরকারিভাবে এই আন্দোলন স্বীকৃত হয়।১৯১৬ সালে সিনিয়র গ্রুপ বা রেন্জার দল চালু হয়।১৯১২ সালে স্যার ব্যাডেন পাওয়েলের সঙ্গে মিস অলেভ সেইন্ট ক্লেয়ার সোমস এর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে তিনি লেডী ব্যাডেন পাওয়েল নামে গাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
১৯১১ সালে পাক-ভারত উপমহাদেশে গাইডিং কার্যক্রম শুরু হয় ও ভারতের জব্বলপুরে প্রথম গার্ল গাইড ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৮ সালে লর্ড ব্যাডেন পাওয়েলের স্বাক্ষরে এই অঞ্চলে ব্লু বার্ড, গাইড ও ওয়ারেন্ট গাইডারের স্বীকৃতি মেলে।১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গার্ল গাইডস এসোসিয়েশনের ৫টি প্রদেশের একটি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান গার্ল গাইডসের কাজ শুরু হয়।
বিশ্ব গার্ল গাইডস এর ভিশন হলো প্রত্যেক বালিকা, কিশোরী ও তরুণীকে মূল্যায়ন ও সমৃদ্ধ করা যেন তারা বৈশ্বিক পরিবর্তনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারে।
আর মিশন হলো বিশ্ব নাগরিক হিসেবে বালিকা,কিশোরী ওতরুণীদের সুপ্ত প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ সাধন যেন তারা দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এই সংস্থা দুটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে
ক)মেয়েদের অধিক সুযোগ করে দেয়া যেন তারা সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারে।
খ)নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ গার্ল গাইডস এসোসিয়েশনের লক্ষ্য হচ্ছে মেয়েদের চরিত্র গঠন,আনুগত্য ও আত্মনির্ভরশীলতার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ দান,অপরের মঙ্গল চিন্তায় উদ্বুদ্ধকরণ, নিজেদের প্রয়োজনে আসবে এমন কাজে প্রশিক্ষণ দান এবং শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের মধ্যে নাগরিকত্ববোধ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা।
বাংলাদেশের মেয়েদের শ্রেণী,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে নিজ নিজ ধর্মের স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য, গৃহকর্ম, নেতৃত্ব, দুর্যোগ মোকাবেলা, রাষ্ট্রিয় কাজে নারীদের দায়িত্ব কর্তব্য,স্বাস্থ্য সচেতনতা, মহামারী মোকাবেলায় সামাজিক দায়বদ্ধতা, যৌতুক প্রথা উচ্ছেদ, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নারী নির্যাতন বন্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখার প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।
গার্ল গাইডস এসোসিয়েশন নারীর সচেতনতা,নারী নেতৃত্ব এবং ক্ষমতায়ন তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

(মহীয়সীর কলাম)

২৭/০৯/২০২০
রাজশাহী।

লেখকঃ ফারহানা শরমীন  জেনী, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন