মহীয়সীর কলাম

যে ঘরে তাহাদের বসবাস!

   -শামীমা রহমান শান্তা
কিছু কিছু ঘরে ঢুকেই দেখা যায় খাটের মাঝখানটা গর্ত হয়ে আছে। আলমারি, শোকেস, ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য আসবাবের চিপা চুপা জুড়ে অসংখ্য ডোরেমন স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, স্পঞ্জ বব কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় কার্টুন মানব-মানবী আর বারবি ডলের বাহারি ছোঁয়া দাঁড়িয়ে আছে!
 আপনি হাসতে হাসতে সোফায় বসে দেখবেন খুঁটে খুঁটে সোফার হাতল থেকে মোম তুলে ছোটখাটো পুকুর বানিয়ে ফেলেছে কেউ ।
ওখানেই ক্ষান্ত হবেন না! বসে দেখবেন সোফা টা বেশ দেবেই গেলো কারণ এক কোনার ফোম কেউ তুলে ফেলেছে যত্ন করে! গালে হাত দিয়ে ভাববেন আপনার দেখার ভুল। আসলে তা না ! খানিকটা আধ ভাঙ্গা হয়ে আছে শোকেস এর কাচ !
সেখানেই শেষ নয়, মাথা তুলে দেয়ালজুড়ে তাকিয়ে দেখবেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসো, জয়নুল আবেদিন , কামরুল হাসান এছাড়া অন্যান্য ভবিষ্যৎ শিল্পী ও  জ্ঞানীগুণীদের শিল্পকলা ঝুলে আছে।
দু’চারটে অংক আর গল্প কবিতা ও দেয়ালজুড়ে পেয়ে যেতে পারেন । আসলে এটা মহা সৌভাগ্যের বিষয় এসবের সাক্ষী হওয়ার!
আপনি ভুলেওনির্ধারিত সীমানার বাইরে পা রাখতে যাবেন না ! তাহলেই বিপদ!  নানান রকম রসালো পদার্থ আপনার পায়ে লেগে যেতে পারে ! কারণ রাতবিরেতে কত এক্সপেরিমেন্ট সেখানে চলে সে জ্ঞান তো আপনার আমার নাও থাকতে পারে!
ভাবছেন সেটা আবার কি ! ওটা হলো আধুনিককালের আর্ট এন্ড ক্রাফট । যা বোঝার মত জ্ঞানী ও সমঝদার লোক পাওয়া বড় কঠিন।
তারপর আপনাকে নাস্তা দিতে গেল গৃহকর্তী ।
আপনি বসে আছেন । একটু পরে এসে দাঁত বের করে হেসে বলবে ।  একটু বসেন । আমি আসছি।
কিছুক্ষণ পর কিচেনে ডিম পোচ করার শব্দ পাবেন এবং যথারীতি সামনে একটা ডিম পোচ এক গ্লাস পানি দিয়ে তিনি হেসে বলবেন একটু কষ্ট করে খেয়ে নিন!
ডিম পোচ খেতে খেতে আপনাকে বুঝে নিতে হবে চানাচুর বিস্কিট অথবা অন্যান্য সঞ্চিত সম্পদের ভাণ্ডার মুঠো মুঠো ছোট ছোট হাত কখন খালি করে ফেলেছে তিনি হয়তো বুঝতেও পারেননি! চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখবেন কিছু ফুটফুটে চোখ আপনার দিকে চেয়ে আছে । পুরোটা শেষ করছেন নাকি কিছু তার জন্য রাখছেন, সেই কথাটা কারো কারো মনে যে  ঘুরঘুর করছে সেটাও বুঝতে হবে আপনাকে!
এসব যদি আপনার সাথে ঘটে আপনি জেনে নিবেন আপনি ভাগ্যবান!
তারপর কান খাড়া করে শুনবেন টুংটাং কিসের আওয়াজ। দু পা এগিয়ে দেখবেন বাদ্যবাজনা বাজছে। তাদের ড্রাম লাগেনা, গিটার লাগেনা, বাঁশি কিংবা অন্য কিছুই লাগে না! তারা নিজেরাই প্রচুর বাজতে পারে! ঝমঝম করে হাসতে পারে!  বৃষ্টির মতো গড়িয়ে যেতে পারে! এগুলো যদি আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আপনি বুঝবেন আপনি একজন সফল উদ্যোক্তার ঘরেই রয়েছেন।
আপনি আসলেই বুঝে ফেলবেন এ বাড়ির সৌন্দর্যটা কোথায়!  হ্যাঁ আমি সেইসব বাড়ির কথা বলছি যাদের বাড়িতে কচিকাঁচারা রয়েছে এবং এই কাঁচা কাঁচা হাতগুলো পাকা পাকা শিল্পকর্মে খুবই দক্ষ ।
এসব আল্লাহর মাল যদি আপনার ঘরে দু’চারটে থাকে তারা আপনার রাতের ঘুম হারাম করে দিতে পারে। কখনো কখনো ওয়াশরুমে যেয়ে দেখবেন বালতির কোনাটা ভাঙ্গা।  মগের তলাটা ফাটা! সাবানটা উধাও শ্যাম্পুর বোতল পুরোটাই খালি!
তারপর ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে দেখবেন কোন দিকে যেন বেঁকে গেছে ।সেটা সোজা করতে আপনাকে একবেলা খাটতে হতেও পারে।
তারপরও আমি বলব প্লিজ তাদের বকবেন না ।
কারণ আপনি একজন সফল উদ্যোক্তা ।
আপনার ঘরে যে ছোট ছোট হাত পা গুলো রয়েছে তাদের শিল্পকর্ম বোঝার মত মন আপনার থাকা জরুরী।
আপনি বিনিয়োগ করুন আপনার সময় তাদের নিবিড় পরিচর্যায়।
বই পড়তে বসে যদি দেখেন বইয়ের পাতাগুলো আস্ত নেই তবে প্লিজ বিরক্ত হয়ে ওদের দিকে কটমট করে চ
চায়বেন না। আপনি না হয় খুজে খুজে দু চারটে আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিন ক্ষতবিক্ষত বইটার এপার ওপার! কিন্তু তারপরও তাদের কোমল হাতে কোন দাগ ফেলবেন না !
ওদের আকাশ অনেক বড়! সে আকাশে যে রংধনু খেলে, যে মেঘ ঘুরে বেড়ায়, তাতে যে স্বপ্নের দোলাচল সারাক্ষণ ঝুলে থাকে,  তা বোঝার মত ক্ষমতা আমাদের থাকা দরকার!
ওই রং টুকু নিয়েই তারা অনেক দূর যাবে যে ! পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে দেখাবে আমিই সুপারম্যান।
তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিভোর আলোটুকু আমরা যেন নষ্ট না করে ফেলি ! আমরা যেন আমাদের বুড়োত্ব দিয়ে তাদের বিচার না করি। তাদের শিশুমনে এমন খারাপ কিছু বুনে না ফেলি যেন  আমাদের শিশুরা আজন্ম বুড়ো  হয়ে যায় !
আসুন আমাদের শিশুদের শৈশব কৈশোর আমরা উন্মুক্ত করে দেই।  কিছুটা সময় তাদেরকে তাদের মতন করে থাকতে দেই। তারা যেন তাদের স্বপ্নের জগতে ঘুরতে পারে । তারা যেন খলখলিয়ে হাসতে পারে ।তারা যেন জানালার গ্রিল ধরে বাঁদরের মতো ঝুলে ঝুলে দেখতে পারে ঝুলার কত মজা ।
তারা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে আপনার খাটটা দুর্বল করে দিয়ে গলা উঁচু করে আপনাকেই বলতে পারে
 ”এটা ভেঙে গেলে কিছু হবে না! ভুল হয়ে গেছে। দেখো তুমি আরও একটা নতুন খাট পাবে!””
এগুলো জীবনের জন্য খুবই জরুরী এগুলোই বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখাতে শেখায় । যে বাচ্চার শৈশব যত মধুর তার বড় বেলা টাও ততো গোছানো আর সফল।
আমি আজ যাদের জন্য লিখছি প্লিজ তারা আমাকে  উদভ্রান্ত জাতীয় কিছু একটা ভাবলেও আমার কথাটা একবার চিন্তা করে দেখবেন!
আল্লাহ আমাদের মনকে প্রসারিত করে দিন আমাদের সমস্ত কচিকাচাদের জন্য! আমিন!

শামীমা রহমান শান্তা,কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন