মহীয়সীর কলাম

তৃতীয় লিঙ্গ ভাবনা
           – নুরে আলম মুকতা
রেলের কামরায় কিশোর ছেলে মেয়েকে নিয়ে বসে আছি। জানালা দিয়ে বাংলার অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে জীবনানন্দ না হয় বুদ্ধদেব নয়তো কবি গুরু ভাবছি। উদাস দৃষ্টি প্রক্ষেপন এক দারুন ভালো লাগার অদৃশ্য সাগরে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় আমাদের জাগতিক ক্রিয়াগুলো আমরা একরকম জোর করে দূরে নিক্ষিপ্ত করতে পারি। সাংসারিক চিন্তা কার না নেই। আমরা যাকে বলি, “আপনি দারুন হাসি খুশি মানুষ তো!” আসলে তেমন নয়। তাঁরও প্রচুর চিন্তা আর দায়িত্ব আছে। তিনি সব একদিকে রেখে দারুন এক অভিব্যক্তি নিয়ে যাপিত জীবন চালিয়ে নেন। তাঁর আশেপাশেই দুঃশ্চিতার ঢেউ আছড়ে পড়ে। সময় কে জয় করে চলেছেন যিনি, তিনি মানুষ। তিনি জীবনের সফলতম কারীগর। উদাস দৃষ্টির এক ফাঁকে কড়া আর সস্তা মেকআপে হিজড়ার দল ছেলেটির গা ঘেষতে আসছে। ছেলেটি আমার কুঁকড়ে যাচ্ছে ভয়ে। মেয়েটির অবস্থা করুন। এমনি সময়ে আমার এক ছাত্র যিনি পোশাকি চাকুরিতে কর্তব্যরত তিনি ত্রাণ কর্তার ভুমিকায় অবতীর্ণ। ও আমার সামনে ওদের সহজাত আচরণে দ্রুত সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলেছিলো। কিন্তু সব জায়গাতেই কি আমার ছাত্র বসে থাকবেন। আমি আমার মেয়েটির প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার জন্য বেশ সময় নিয়েছিলাম। এছাড়া আমার আর পথ ছিলো না। ওর প্রশ্নগুলো ছিলো,এরা এরকম কেন? কোথায় থাকে, কি করে খায় , ওরা কি এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে? বেশ জটিল প্রশ্ন। উত্তর গুলো আমি সংক্ষেপে দিলে ওকে থামানো যাবে না আমি জানি। তাই ধীরে সুস্থে দেয়াই ভালো মনে করেছিলাম। হারমাফ্রোডাইট, হিজড়া, খোঁজা, ক্যাসট্রেশন,ট্রান্সজেন্ডার, সেক্স বা লিঙ্গ অনেকগুলো বিষয় একসাথে না বললে বিষয়টি হাল্কা করা যাবে না। আমরা আজ ও প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। আসলে আমার মেয়ে ওর চাচাতো ভায়ের বিয়েতে হিজড়াদের আক্রমন আর চাঁদাবাজির কাহিনী ভুলতে পারছে না। পরে এ ঘটনার লিংক হিসেবে আমাদের বাড়ির অতি উৎসাহি গল্প রসিকদের কাছে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে টানাহেঁচড়ার গল্প শুনে ও আতঙ্কে ছিলো। আমি ওকে বলেছিলাম এরা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ । কোন এক অদৃশ্য কারনে ওরা ঘরে থাকতে চায় না। ও অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। বলেছিলো, বাড়িতে না থাকুক। স্বাভাবিক জীবন যাপন তো অন্তত করুক ওরা নির্ধারিত স্থানে। শিশুর সিদ্ধান্তে আমার মনোজগতের দ্বার খুলে গিয়েছিলো। ওদের অবাধ আর অবাধ্য আচরন শিশু কিশোর মনে যদি কোন রকম বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে তবে তা আমাদের সমাজের জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে। আমাদের সরকার প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ওদের সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছে। এটি একটি বিশাল আশা জাগানিয়া কাজ। হিজড়াদের বিষয়ে বিশেষ কিছু ব্যাবস্থা নিলে সমাজ উপকৃত হবে। বিশাল এক জনগোষ্ঠী জীবনের মুলধারায় এলে আমরা সবাই এক সুন্দর জীবনাচারের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাবো।

 

নুরে আলম মুকতা,কবি,সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক,মহীয়সী

আরও পড়ুন