মায়াবতী!!!!!

মোসাঃ নাছরিন সুলতান

এক বিদেশী এসে মায়াবতীতে ঢুকে অবাক হয়ে গেল এই সেই মায়াবতী যার নাম দেশে বিদেশে সবাই একনামে চিনে! কি ভাবে পারছে এরা? মায়াবতী হচ্ছে এমন একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে গরিব, অসহায়, এতিম, বৃদ্ধ ও শারিরীক ভাবে অসুস্থ এমন হাজার লোককে এখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বিদেশীর খুব জানতে ইচ্ছা হলো কারণ সে বাংলাদেশ এসেছিল ডাক্তারী পড়ালেখা করার জন্য কিন্তু হসপিটাল গুলোর অবস্থা দেখে সে খুব হতাশ ছিল! তাই সে অবাক যে দেশে একবেলা খাবারের জন্য মানুষ অন্যজনের কাছে হাত পাতাসহ এতো নিচে নামতে পারে সে দেশে মায়াবতীর মতো একটা প্রতিষ্ঠান কি করে হয়?

মায়াবতী হচ্ছে সুমি ও রুমি জমজ দুই বোনের প্রতিষ্ঠান! এরা দুইবোন পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না করে ছোট্ট একটা ফাস্টফুড এর দোকান দেয়। এরা দুইবোন জমজ হলেও এদের বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন। সুমি খুবই বদমেজাজি আর রুমি খুবই শান্তি প্রিয়!

এরা যখন দোকানে কাজ করত তখন সুমি কোনদিনও দোকানের কাজ করত না মালিক এর মতো শুধু টাকা উত্তলন করত আর রুমি কর্মচারীর মতো সকল কাজ করত!

তাদের দোকানের সামনে প্রতিদিন একটা বৃদ্ধা ফকির আসতো । সুমি তাকে বকাঝকা করে বিদায় করে দিত । আর রুমি তাকে পেটভরে খাওয়াতো! রুমি তাকে যখনই দেখতো কিছু না কিছু খাবার তার হাতে তুলে দিতো! আর সুমি মাঝে মাঝে সে খাবারও কেড়ে নিয়ে ফেলে দিত! কিন্তু তবুও ফকিরটা প্রতিদিন ওদের দোকানের সামনেই বসত!

একদিন তাঁর খুব জ্বর হয়েছে দেখে রুমি তাকে নিয়ে ডাক্তার এর কাছে গিয়ে ঔষধ কিনে তাকে তার বাসায় পৌছে দিয়েছে। সেজন্য সুমি আর সেদিন তাকে দোকানে ঢুকতেই দেয়নি! এভাবেই দুইবোনের দিন কাটতে লাগল।

একদিন হঠাৎ দু’বোনই অসুস্থ হয়ে গেল । ওদের হসপিটালে ভর্তি করা হলো এবং ডাক্তার বলল, সুমির প্রচন্ড রাগের কারণ তার নার্ভ সিস্টেম ডেমেজ হয়ে গেছে তাই ও আর চোখে দেখতে পারবে না এর নতুন চোখ লাগাতে হবে যা খুবই ব্যায়বহুল! এছাড়া দুইটা চোখ পাওয়া খুব কঠিন ।

অন্য দিকে অতিরিক্ত মানসিক চাপের জন্য রুমির  দুইটা কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে, এরও দুইটা কিডনি নতুন করে লাগাত হবে ! ওদের বাবা এগুলো শুনে তো পাগল, দুই মেয়েকেই একসাথে হারাতে হবে!!!

টাকা মেনেজ করতে পারলেও কিডনি বা চোখ পাওয়া যাবে না; আবার যদিও কোথাও পাওয়া যায় তবে এতো টাকা ডিমান্ড করে যে ওদের পক্ষে মেনেজ করা সম্ভব না! ওরা দুইবোন জেনে গেছে ওদের আর বেঁচে থাকার কোন উপায় নেই!

এদিকে ফকিরটা প্রতিদিন দোকানে আসে কিন্তু কেউ এসে দোকান খুলে না । সে অপেক্ষা করে দিনশেষে হতাশ হয়ে চলে যায়! একদিন দোকানে একটা ছোট্ট পিচ্চি কর্মচারীর সাথে তার দেখা হয়, ওর কাছে সে সব শুনতে পায়! তারপর সে খুঁজতে খুঁজতে যে হসপিটালে ওরা আছে, সেখানে গিয়ে ওর বাবার সাথে দেখা করে! ওর বাবা বলে এরা আর বাঁচবে না; কারণ আমি কিডনি বা চোখ কোনটাই মেনেজ করতে পারিনি! ফকির আর কিছু না বলে দূর থেকে ওদের দেখেই চলে আসে!

বাসায় এসে তার জমানো সব টাকা নিয়ে আবার হসপিটালে ফিরে যায় । ডাক্তার তার সাথে কথা বলতে রাজি হয় না । অনেক অনুরোধ করে বলার পর রাজি হলো! সে ডাক্তারের হাতে একটা পুটলা দিয়ে বলল,

-ডাক্তার সাহেব এখানে কতো টাকা আছে আমি জানি না; আপনি এই টাকা দিয়ে আমার দুইটা কিডনি আর আমার দুইচোখ নিয়ে ওদের দুবোনকে ভাল করে দেন?

ডাক্তার তো অবাক এ মহিলা কি বলে এতো সত্যি পাগল!!! ডাক্তার কিছুতেই রাজি হচ্ছে না! মহিলা ও নাছোড়বান্দা কিছুতেই হাল ছাড়ছে না ।সে আবার বলল

-ডাক্তার সাহেব আমার দুইটা মেয়ে কলেরা হয়ে মারা গেছে, আমি বাচাঁতে পারিনি । ওদেরও মা নেই! আমি না হয় ওদের মায়ের কাজটা করলাম! তাছাড়া আমার তো এখন বয়স হয়ে গেছে, বেচেঁ থেকে কি হবে? ওরা বাচঁলে অনেক কিছু করতে পারবে!

ডাক্তার এবার একটু নরম হলো এবং বুঝতে পারল আসলেই সে কি চায়!!!!বৃদ্ধা ফকির আবার বলল,

-আর হে ওদের এখন কিছু বলবেন না । ওরা যেদিন ভাল হবে সেদিন আমার এই চিঠিটা রুমির হাতে দিবেন!

অবশেষে ডাক্তার বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে গেল এবং ওদের অপারেশন করল! সবকিছুই যেন কাকতালীয় মনে হলো সুমি ও রুমির বাবার! যেদিন ওদের রিলিজ হবে ডাক্তার এসে চিঠিটি রুমির হাতে দিল, রুমি চিঠিটা নিয়ে পড়তে লাগল!

আমি ফকির কিন্তু মানুষ! তুমি আমাকে প্রতিদিন খাওয়াতে। একদিন অনেক বকা খেয়েও আমাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলে এটা তার পুরস্কার! তোমার বোনটা এবার নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে! আমি তোমাদের জন্য নতুন পৃথিবী রেখে গেলাম সেখানে

কখনো অন্ধকার আসতে দিও না ।

ইতি
মায়া

এই ছোট্ট একটা চিঠি পড়ে দুইবোনসহ ডাক্তার, নার্স সবাই খুব কান্না করল । আর ডাক্তারও আর কোন বিল নেয়নি ওদের কাছ থেকে! বলতে গেলে কোন টাকা খরচ ছাড়াই ওদের অপারেশন হলো! সেই মায়া থেকেই আজ এই মায়াবতী! দুইবোন তাদের নতুন জীবনে বিজনেস শুরু করে আজ তারা কোটিপতি এবং তাদের মায়াবতী সকল অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল!!!

বিদেশী গল্পটা শুনে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মায়াবতী সত্যি বড় মায়াময়!!!!!

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার

 

আরও পড়ুন