ম গল্প

 করোনার থাবা

 -নুরে আলম মুকতা

অনেকদিন ধরে আমরা ওকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম ওর আর হবে না মনে হয়। আমাদের সব জারিজুরি ষখন শেষ তখন অন্তরীক্ষে বসে আল্লাহ মনে হয় হেসেছিলেন। হঠাৎ ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে সব হিসাব নিকাশ পাল্টে গিয়েছিল। ওদের বাড়িতে একটি বউ দুটি শিশু সন্তান নিয়ে সংসার সামলাবে নাকি শ্বাশুড়ির সেবা করবে? ওভাবে যে আর বেশি দিন চলবে না তা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। অল্প বয়সী একমাত্র মেয়েটি সারাদিন খেটে সন্ধ্যায় যখন আমাদের দিকে হাসি মুখে চায়ের পেয়ালা নিয়ে সামনে দাঁড়াতো তখন আমি বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে যেতাম। হাশেমের মায়ের অসুস্থতার পর ওর মতি গতি আমাদের কাছে একটু নরম মনে হয়েছিলো। ওর ভাবী একদিন আমাকে ডেকে বলেছিলো, ভাই ও মনে হয় এখন বিয়ের পিড়িতে বসতে রাজি হতে পারে। আমার শ্বাশুড়ি ওর মাথায় হাত দিয়ে শপথ করিয়েছে। ছেলেকে বলেছে, বাবা আমি আর বেশি দিন নেই মনে হয়। তোর বৌটির সোনামুখ দেখতে পেলে আমি মহাশান্তি পেতাম। তাতেই কাজ হয়েছে। হাশেম বিয়েতে রাজি হয়েছে এ সংবাদ চাউর হতেই যেন সবার মনে আনন্দ। কিন্তু মেয়ে পছন্দ হয় না। আমরা হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনের বিরুদ্ধে বার বার মেয়ে দেখতে হয়েছে। সৃষ্টির সেরা জীবের আর কতবার প্রদর্শনী হয়! আমার মতো মানুষের আসলে বউ দেখাই উচিৎ না। মনে হয় সবাই সুন্দরী। সবাই যোগ্য। কিন্তু আমার সাথীরা তো মানে না। শেষ পর্যন্ত আমি রণে ভঙ্গ দিলাম। বিশেষ একটি নারী পুরুষের দলকে দায়িত্ব দেয়া হলো হাশেমের বৌ খোঁজার জন্য। ওরা পেয়েও গেলো। কিন্তু আবার ঐ একই বিষয়। আমি না দেখলে সমাপ্তি টানা যাচ্ছে না। কি আর করা ? হাশেমের বিয়ে বলে কথা। আমি গেলাম। কিন্তু শর্ত দিয়ে গেলাম। ফাইনাল খেলতে গেলে আমি গোল করেই ফিরবো। বউ না নিয়ে আমি বাড়ি ফিরবো না। কলার ঝাঁকিয়ে বলে গিয়েছিলাম এ বান্দা আর ব্যর্থ হবে না। একটি শুশ্রী অষ্টাদশী কে নিকাহ কবুল করানোর সময় মনে হয় আল্লাহর আরশে মওলা কাঁপে! না কাঁপলে আমি কেঁপেছিলাম কেন! “হরিপুর নিবাসী জহুর মিয়ার একমাত্র কন্যা সাবিহা বানুর সহিত অজয়গাঁ নিবাসী বজলুর রহমানের পুত্র মিকাত ওরফে হাশেমের সহিত দুইলক্ষ্য সাতশত তিন টাকা দেন মোহর ধার্য্য করিয়া নগদ সাতশত তিন টাকায় নিকাহ কবুল করানোর জন্য সাক্ষী সহ আমরা কন্যাকে নিকাহ কবুল করিয়েছি। সাক্ষীগন শুনিয়াছে।” সাক্ষী, কি শুনেছেন বলুন। আমি অদ্ভুত এক হৃদ কম্পন অনুভব করেছিলাম। বড় বড় স্টেজে হাজার দর্শক কিছুই না মনে করা লোক আমি। অনর্গল আবৃতি করে গিয়েছি। নিজের ভুল তো কখনও ধরতে যাইনি। প্রশংসায় বিগলিত হয়ে হাঁটার ভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে। ঐ আমি কাঁপতে কাঁপতে বলতে শুরু করলাম,আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান(সাঃ)আবদুহু ওয়া রাসুলুহু… হাঁ আসমান জমীনের মালিক মহান আল্লাহ সাক্ষী যিনি সর্বাগ্রে শুনিয়াছেন। তারপর আমরা শুনিয়াছি, কন্যা নিকাহ কবুল করিয়াছে। হাজিরানা মজলিসের সকলে বলেছিলো আলহামদুলিল্লাহ। বউ টি নিয়ে আসার পর অসুস্থ শয্যাশায়ী মমতাময়ী মায়ের সামনে দাঁড়ালাম। এক অদ্ভুত ঐশ্বরিক দৃশ্যের অবতারনা হলো। হাশেমের ভাবীকে মায়ের জন্য কিছু খাবার আনতে বলে হাশেমের মাকে ধীরে ধীরে শোয়া থেকে বসানো হলো। নতুন বউ মেহেদী রাঙা হাতে মাকে খাবার তুলে দিলো। আমি দেখলাম পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠতম দৃশ্য। সাক্ষী হয়ে রইলাম মায়ের জয়গাঁথার। বুকের ভেতর অসম্ভব রকম শান্তনা অনুভব করেছিলাম। সামাজিক ভাবে অনেক সময়ই আমরা জৈবিক বিষয়গুলো গোপন, একান্ত গোপন করে ফেলি। আসলে এগুলো একেবারে গোপন কিনা এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারন পড়া আমাদের ধর্ম। আর পড়তেই যদি হয় তাহলে হয় শিক্ষক নয়তো শিক্ষার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই আমি যা আমার মানদন্ডে সঠিক মানি তা দায়িত্ব হিসেবে পালন করি। লোক লজ্জা আমার নেই। এখানে আমি বেহায়া আর নির্লজ্জ। হাশেম কে সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ সযতনে বুকে রেখে সংরক্ষণ করে আদর করার কৌশল যা আমার সীমার মধ্যে যায় ততটুকু বলে চলে এসেছিলাম। আমার স্বাভাবিক আচরন হলো,একটি কাজ হয়ে গেলে কেহ যদি সামান্যও বিরক্ত হয় এজন্য ও পথ আর না মাড়ানো। বহুদিন ওদের বাড়ি আর যাইনি। অনেক জল গড়িয়েছে। হাশেমের শ্বশুর বাড়ির লোকজন যথারীতি কুটুম্বিতা চালিয়েছে। মাস কয়েক পর হাশেমের মা ইহলোক ত্যাগ করলেন। ততদিনে করোনা জেঁকে বসেছে। দাফন করা মুশকিল! আবার আমি সর্বাগ্রে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্যে হাশেমের মায়ের কাফন-দাফন

শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। নতুন বউটি হাত ধোয়ার জন্য সাবান আর গামছা এগিয়ে দিয়েছিলো। বেশ কিছুদিন আমি আর খোঁজ নিইনি। একদিন শুনলাম হাশেমের প্রচন্ড জ্বর সহ কাঁশি। ওর বউ বাপের বাড়ি। সময়টি যেহেতু একদম আলাদা তাই নিরাপদ থাকাই শ্রেয়। হাশেম কে ফোনে বললাম ওষুধ খাও আর আইসোলেশনে থাকো। ও তাই করা শুরু করে দিলো। সচেতন ছেলে, ভ্যাপার নেয়া থেকে শুরু করে যতরকম কোভিড বিরোধী কাজ ছিলো ও প্রাণপণে করে গিয়েছিলো। কিছুদিন পর সুস্থ হলেও বউ আর আসে না। মাঝখানে এতিম হাশেমের দুটি ঈদ বউ ছাড়া চলে গিয়েছে। হাশেমের শ্বাশুড়ি করোন টেস্ট করার কথা বলেছে জামাইকে। ভালো কথা। করবে। কিন্তু এটি এমন করে ডালপালা মেলেছে আর গুজব সরলীকরণ হয়েছে যে মেয়েকে আর হাশেমের কাছে পাঠাবেই না মেয়ের বাবা। কঠিন যন্ত্রণা! আমি আমার কৌশলের অংশ হিসেবে প্রটোকল শুরু করলাম। মাঝখানে মেয়েটি ওর বাবা মার দ্বারা মোবাইল বঞ্চিত হলে হাশেমের মনে আরো যন্ত্রণা তীব্রতর হয়। মেয়েটির এক ফুপু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আমি হাশেম কে বলেছি, তুমি নিজে একটু ছোট আর বেহায়া হতে সমস্যা নেই তো। দারুন প্রেমময় একটি মেয়ের জন্য তুমি তোমার শ্বশুর মহোদয়ের নিকট সমর্পন করো। কথা বলো। সব সমাধান হয়ে যাবে। একটি মেয়ের আকুলতা আর হাহাকার তোমার বোঝা উচিত। নিজেরটি তো সবাই জানে। কিন্তু অপরের টুকু নিলে আরো ভালো হয়। আমরাতো ঘরেই চিৎকার করি। নিজে নিজে রাগে গোঙানী দিই। বাইরে বের হলে বেলুনের মতো চুপসে যাই। তাই হাশেমের ওপরে আমার হিমালয় সমান অভিমান আমাকে মাঝে মাঝে ঝাঁকুনী দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমার সামনে ভেসে চলেছে সারাক্ষণ মেয়েটির নিস্পাপ প্রেমময় ছবি।

নুরে আলম মুকতা,কবি ,সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক,মহীয়সী

আরও পড়ুন