সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো। নারী পুরুষ সমতায় নতুন বিশ্ব গড়ো

ফারহানা শরমীন জেনী

আটই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ দিবসের ইতিহাস মোটামুটি সবাই জানে। আমার কাছে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যা আমাদের ভাবায়,প্রেরণা দেয় নতুন বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখায়।এমন একটি স্বপ্ন যখন নর ও নারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান সমতায় এ ধরিত্রীর বুকে এগিয়ে যাবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অবগাহনে।এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় সবার জন্য সমতা।
সবার জন্য সমতা বলতে কি বুঝায় আগে আমাদের সেই সম্পর্কে জ্ঞান লাভ প্রয়োজন। ইউনিসেফের মতে জেন্ডার সমতা “অর্থ নারী ও পুরুষ, মেয়ে ও ছেলে, একই অধিকার, সম্পদ, সুযোগ এবং সুরক্ষা ভোগ করবে এটা নিশ্চিত করতে মেয়ে এবং ছেলে, বা নারী ও পুরুষদের চিহ্নিত করতে হবে না, সবার প্রতি একই আচরণ করতে হবে ।

জেন্ডার সমতা কি বা জেন্ডার ইকুয়ালিটি বলতে সমাজে নারী-পুরুষের একই সাথে সঠিক ভূমিকা ও সমস্যা মূল্যায়নকে নিশ্চিত করণ কে বোঝায়। অর্থাৎ সমাজের নারী-পুরুষ বা ছেলে মেয়ে এর চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পারিবারিক সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমস্যামূল্যায়নের প্রবণতাকে বোঝায়।

বেগম রোকেয়া বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষার অগ্রদূত। তিনি নারীদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন রন্ধন শৈলীর সাথেই আমাদের আরও বহুকিছু শিক্ষার আছে। অতএব বহ্নিশিখা হয়ে বেরিয়ে আসো রন্ধনশালার চারদেয়ালের মোহ ছিন্ন করে। সে স্বপ্ন মৃদু হেসে অলক দুলায়ে ছায়া ছায়া কায়ার জন্য নয় তা শুধু তোমার আত্মপ্রত্যয় তৈরির জন্য। নারী শক্ত মাটির ওপর দাড়িয়ে বৈমানিক হবে, নারী কোমল হাতে ফুলের সাজি যেমন সাজাবে তেমন অস্ত্র যেন ধরতে পারে বিপদে তেমন স্বপ্নচারী হবে। নারী পুরুষের কামনার দূর্বল বাক্যে কখনও কাবু হবেনা। “ক্ষণিক বিরহ অবসানে নিবীড় মিলন ব্যাকুলতা” মুক্ত, আজ নারী পুরুষের সাথে সহযোদ্ধা।

বর্তমান যুগ উন্নয়নের স্বর্ন শিখরে অবস্থান করছে সেই স্বর্নশিখরে পৌছানোর ভূমিকায় নারীরাও অংশাংশি। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় নারীদের পরিশ্রম অনেক বেশি। এই সূত্রে আমার দুটো ঘটনা মনে খুব রেখাপাত করেছে এবং মনে হয়েছে সেইদিন আর বেশিদূর হয়তো নেই যেদিন নারীর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। প্রথম ঘটনাটা হল আমার এক পুরুষ সহকর্মী তার গিন্নি প্রসঙ্গে বলতে যেয়ে বলছেন যে “আমার খুব অবাক লাগে আমার ঘুমের আড়মোড়া ছোটেনা আর আমার বউ আলো না ফুটতেই ছুটে যায় রান্নাঘরে।সারাদিনের রান্না নিজহাতে করে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে দুই ঘন্টার বাসযাত্রা করে পৌছায় কলেজে। আবার ফিরে এসে সংসারের কাজ,বাচ্চার দেখাশোনা আমার তদারকি। আপনারা মহিলারা এত কিছু পারেন কিভাবে? ” দ্বিতীয় ঘটনা এক সাহিত্যিক তার গিন্নির কর্মদক্ষতা সম্পর্কে লিখতে যেয়ে এক জায়গায় লিখেছেন “মাঝে মাঝে মনে হয় আমার বউটা আবার জ্বীন নাত?তাকে যখন যা বলি বলার আগেই হয়ে থাকে। ” তাদের জানাই আমার আন্তরিক ভালোবাসা।একজন পুরুষ যদি এভাবে তার স্ত্রীর অকপটে সুনাম করতে পারেন তবে এমনিতেই সেই সংসারে আনন্দের ফল্গুধারা বইবে যার প্রভাবে একটা সুন্দর সমাজ রচিত হবে।

আবার আরেকদিকে দেখেছি কোন কোন পুরুষ স্ত্রীর কোন গুণাবলি স্বীকার করতে চাননা বরং ব্যাঙ্গ করে তার সুকুমার বৃত্তিগুলো গুড়িয়ে দিতে চান।কেউ কেউ বউকে তসলিমা নাসরিনের সাথে তুলনা করতে দ্বিধা করে না।তসলিমা নাসরীনও হয়ত কাঙ্খিত পুরুষ দ্বারা নিষ্পেষিত হয়ে বিদ্রোহ স্বরুপ বিপথে গিয়েছে। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে আমি তসলিমা নাসরিনের সমর্থক নয়।আমি একজনকে জানি যার গাড়ি চালানোর শখ ছিল কিন্তু তার কর্তাবাবু চাননা সে গাড়ি চালাক।কারণ হতে পারে সামাজিক ভাবে মানুষ কি বলবে বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য কিনা?আসলে বউয়ের আন্তরিক আকাঙ্খা তিনি মেনে নিতে পারলেননা হয়ত।পাছে লোকে আবার যদি তাকে দূর্বল ভাবে।কিন্তু সেই মেয়েটি গাড়ির যাবতীয় কাজ করতে গ্যারেজে যাচ্ছে ভেহিক্যালস অফিসে যাচ্ছে তখন কোন সমস্যা নাই। আমরা ক্ষেত্র বিশেষে এখনও প্রাচীন আরবের বর্বর যুগে বাস করছি বলেই মনে হয়।প্রাচীন যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় মহিলারা উটের সওয়ারী হয়েছেন,যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন ব্যাবসাবাণিজ্য পরিচালনা করেছেন। স্বয়ং হজরত খাদিজাতুল কোবরা( রাঃ) আল্লাহর রাসূলের সাথে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের জন্য পরিচয় হয়।তাহলে এই টাইম মেশিনের যুগে আমরা কেন নারীদের সকল ক্ষেত্রে ধর্মের দোহাই দিয়ে আটকাতে চাচ্ছি। ধর্মকেও বিতর্কিত করছি।নারীদের ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠায় আমাদের এত দীনতা কেন?তখন জাতীয় কবির কবিতা অংশটি বারবার মাথায় ভাসে
“আমরা মুসলিম বলিয়া ফখর করি
অথচ জানিনা সর্বপ্রথম মুসলিম নর নহে নারী।”

আমাদের প্রয়োজন নিজ নিজ কর্মদক্ষতা, কর্মক্ষমতা, কর্মের পরিধি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের হাদিসে এসেছে “জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে হলেও যাও”। সেখানে কিন্তু বলা নেয় শুধু ছেলেরা যাও।মানুষের কথা বলা আছে। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে গিয়ে বিদ্রোহী কবি দ্রোহের সাথে বলেছেন কবিতায়ঃ
৷৷ ” মাথার ঘোমটা ছিড়ে ফেল নারী
ভেঙে ফেল ও শিকল
যে ঘোমটা তোমারে করেছে ভীরু
ওড়াও সে আবরণ
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন
যেথা যত আভরণ” ।।
তার মানে এই নয় যে নারীকে উচ্ছৃঙ্খল হতে বলেছেন বা বেপর্দা হতে বলেছেন । এখানে তিনি নারীদের অবরুদ্ধ করে রাখার রুপক হিসেবে ঘোমটা শব্দটি ব্যাবহার করেছেন।নারীকে ধর্মের অন্ধ দোহাই দিয়ে বোকা বানিয়ে রাখা হয়েছে, তাকে লজ্জাবতী লতার সাথে তুলনা করে যে লাজুক লতার খোলসে মুড়িয়ে শুধুই উপভোগ্য তৈরি করা হয়েছে সেই আভরণকে ছিড়ে ফেলতে বলেছেন।
আমাদের প্রয়োজন নিজ নিজ কর্মদক্ষতা কর্মক্ষমতা কর্মের পরিধি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। এত কথা লেখার উদ্দেশ্য হল ঘর থেকেই শুরু হউক না নারীপুরুষ সমতা।আপনার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যার প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো। আপনার ঘরে একটি নতুন মানুষ তার সকল আপনজন, বেড়ে ওঠা স্মৃতিময় গৃহকোণ ছেড়ে অনেক আবেগময় স্বপ্ন নিয়ে আসছে। তাকে নারী না ভেবে আগে একজন মানুষ ভাবুন। তাকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে আপনি তার অত্যন্ত আপনার মানুষ হিসেবে সহায়তা করুন।আপনার কন্যা সন্তানটির অবস্থানে তাকে দেখতে চেষ্টা করুন। দোষ গুণ মিলিয়ে মানুষ।তার গুণ নিয়ে বেশি ভাবুন ।দেখবেন একদিন সে আপনাদের ভাবনার সাথে একহয়ে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মত নতুন কিছু করে নতুন বিশ্ব গড়বে।
প্রতিটি মানুষ জন্মগত ভাবে কিছু প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। নারীর সেই প্রতিভার পরিচর্যা করুন। প্রতিদিন তার নতুন প্রতিভায় একটু একটু করে জল সিঞ্চন করুন।তাকে নতুন নতুন সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করুন।
সমাজটা একদিনে বদলাবেনা।আপনি আমি বদলালে বদলাবে এই সমাজ।২০১৯ এবং ২০২০ এর নারী দিবস প্রতিপাদ্য ভালোভাবে বুঝুন,ভাবুন,চর্চা করুন। তবেই এ সমাজে একদিন প্রয়োজন ফুরাবে নারী নির্যাতন আদলতের।
পরিশেষে একটা হাদিস আপনাদের বলতে চায় তা হল একবার এক সাহাবা এসে মহানবীকে বারবার প্রশ্ন করছিলেন কার মর্যাদা বেশি তখন নবিজি তিনবার বললেন মায়ের কথা আর চতুর্থবারে বললেন বাবার কথা।আরও উল্লেখ্য যে কারও যদি তিনটা কন্যা সন্তান হয় এবং সে পূর্ণ সন্তুষ্টির সাথে এবং আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানের আলোকে তাদের প্রতিপালন করতে পারেন তবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের এত মর্যাদা দেয়া হয়েছে যে কুরআনের একটি সূরাহ শুধু মহিলাদের অধিকার সম্বলিত। স্বয়ং আল্লাহও জানতেন যে মহিলাদের ঠকাতে পারে পুরুষেরা পেশিশক্তির জোরে যেহেতু একমাত্র মানুষকে তিনি দিয়েছেন সৃষ্টির মধ্যে ইচ্ছার স্বাধীনতা। সুতরাং যে দিক দিয়েই হউক নারীদের সঠিক মূল্যায়ন ও সমতা সময়ের দাবি।নারীর সঠিক মূল্যায়ন হলেই পৃথিবী হবে স্বর্গীয়।
আজকের নারীদিবসের প্রতিপাদ্য যেন জাতীয় কবির নারী কবিতারই আরেক রুপ।নারী কবিতায় কবি বলেছেন
৷৷ সাম্যের গান গাই
আমার চক্ষে পুরুষ রমনী
কোন ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যানকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী
প্ররণ্য দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষী নারী।”
আরও একটি উল্লেখ্য কবিতার পংক্তি
রাজায় করিছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রানী
রানির দরদে ধুইয়া গিয়েছে রাজার যত গ্লানী।
জগতের যত বড়বড় জয় বড়বড় অভিযান
সেদিন সুদূর নয়
যেদিন ধরনী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।”
সর্বপরি কালজয়ী বীর হজরত ওমর( রাঃ)এর মত হউক আমাদের পুরুষ সমাজ তার সাথে একাত্ম হয়ে ধারণ করুক “নারীরা কোমলমতি ও সরল প্রাণ তাই তাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা সবার কর্তব্য। আর নারী বা পুরুষ নয় আসুন আমরা সবাই সবায়কে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হিসেবে দেখি।গড়ে তুলি নারী পুরুষ সমতায় নতুন বিশ্ব। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা সকল সুহৃদ বন্ধুদের প্রতি।

লেখকঃ প্রভাষক, কমেলা হক ডিগ্রী কলেজ, বিনোদপুর, রাজশাহী।

আরও পড়ুন