তুরস্কের মুসলিম শিশুরা যেভাবে ইসলাম শেখে

আতাউর রহমান খসরু

ইসলামী খিলাফত ভেঙে যাওয়ার পর একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তুরস্ক। ধর্মের সব ধরনের সংসর্গ থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করে দেওয়ার আয়োজন করা হয় এ সময়।

রাষ্ট্রীয় শিক্ষা কারিকুলাম থেকে ইসলামী শিক্ষা বিলোপ করা হয়; বরং অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় তার ওপর। তুরস্কের মুসলিম জনগণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উদ্যোগে ইসলামী শিক্ষার চর্চা অব্যাহত রাখে। কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে গড়ে ওঠে ইসলামী ভাবধারার কয়েকটি স্কুল। ইমাম হাতিপ স্কুল তেমনই একটি ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র। তুরস্কে একদিকে ইসলামী শিক্ষার দাবি জোরালো হচ্ছিল, অন্যদিকে সংবিধান সীমাবদ্ধতার কারণে স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি কোনো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ ছিল না। সংকট মোকাবেলায় ইমাম হাতিপ স্কুল অধিভুক্ত করে সরকার।

ইমাম হাতিপ স্কুল মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিম ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে তোলা একটি ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেলজুক শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে নিজামিয়া যার মূল ভিত্তি এবং আধুনিক শিক্ষার সংযুক্তি তার সৌন্দর্য। উসমানীয় শাসনের শেষ ভাগ থেকে এখন পর্যন্ত একাধিকবার ঢেলে সাজানো হয়েছে নিজামিয়া মাদরাসা শিক্ষাকে।

আধুনিক সংস্করণে যার নাম হয়েছে ইমাম হাতিপ স্কুল।

আরবি ইমাম খতিবের তুর্কি উচ্চারণ ইমাম হাতিপ। যেহেতু সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম খতিবরা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হন, তাই একে ইমাম হাতিপ স্কুল বলা হয়। ইমাম হাতিপ মডেল স্কুল (ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে) প্রতিষ্ঠিত ১৮৮০ সালে। যদিও তখন ‘ইমাম হাতিপ স্কুল’ নামটি ছিল না। দ্বিতীয় সাংবিধানিক যুগে (১৯০৮-১৯২২) এর কারিকুলামে আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামী বিজ্ঞান যুক্ত হয়। ১৯২৪ সালে অভিন্ন শিক্ষা আইন প্রণয়নের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের ঐতিহাসিক মাদরাসা শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে আইনে ইসলামী শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ রাখা হয়। তা হলো, সরকারের তত্ত্বাবধানে আধুনিক ইসলামী স্কুল প্রতিষ্ঠিত হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের প্রশিক্ষিত শিক্ষকরাই পাঠ দান করবেন। এই আইনের অধীনে ২৯টি দারুল খলিফা মাদরাসাকে ইমাম হাতিপ স্কুলে রূপান্তর করা হয়। ১৯২৪ সালে চালু হওয়া ইমাম হাতিপ স্কুলগুলো ১৯৩০ সালে শিক্ষার্থী কম হওয়ার অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সালে তুরস্কে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু হলে ইসলামী শিক্ষার দাবি আবারও জোরালো হতে থাকে। ১৯৪৯ সালে সরকার ইমাম হাতিপ স্কুলের ১০টি শাখা চালু করতে সম্মত হয়। এরপর ক্রমেই ইমাম হাতিপ স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সরকার মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে চার হাজার ইমাম হাতিপ স্কুলে ১.৩ মিলিয়ন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে।

উসমানীয় শাসনামলে প্রচলিত মাদরাসা শিক্ষা কারিকুলামের সঙ্গে বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিষয়গুলোর সংযোগে তৈরি করা হয় ইমাম হাতিপ স্কুলের সিলেবাস। তাতে আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার হার যথাক্রমে ৬০ ও ৪০ শতাংশ। ধর্মীয় বিষয়গুলোর মধ্যে কোরআন, আরবি, তাফসির, হাদিস, ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব), ফিকহ, সিরাত, অলংকারশাস্ত্র, তুলনামূলক ধর্মীয় ইতিহাস এবং আধুনিক শিক্ষার সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, বিদেশি ভাষা, দর্শন, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, সংগীত, কলা, গণিত, পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়ানো হয় ইমাম হাতিপ স্কুলে। ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে তোলা তুরস্কের শিক্ষাব্যবস্থায় এই স্কুলের অবদানও কম নয়। তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তুরস্কে ইসলামী শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। ইমাম হাতিপ স্কুলের উন্নয়নে সরকার ১১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। অবশ্য সরকারের দাবি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্যই তারা ইসলামী স্কুলের বরাদ্দ বাড়িয়েছে। তুর্কি শিক্ষামন্ত্রী ইসমত ইলমাজ বলেন, ‘আমরা যা করছি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য করছি। ’  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান বলেছেন, তিনি একটি ধর্মভীরু শিক্ষিত প্রজন্ম রেখে যেতে চান। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে নিজের সাবেক স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সব শিক্ষাব্যবস্থার অভিন্ন লক্ষ্য হলো সুনাগরিক গড়ে তোলা, যারা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। ’ তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করতে চায় না তুর্কি সরকার।

 তথ্যসূত্র : রয়টার্স ও ব্রিটিশ জার্নাল অব রিলিজিয়াস এডুকেশন

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.