মাকে খুঁজতে ৪২ বছর পর ফ্রান্স থেকে কলকাতায় অ্যাঞ্জেলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অ্যাঞ্জেলা ক্যালিও, নামটা বিদেশি হলেও চেহারায় আপাদমস্তক দেখতে একেবারে বাঙালি। ফরাসি পাসপোর্টধারী অ্যাঞ্জেলার জন্ম হয়েছিল ৪২ বছর আগে উত্তর কলকাতার একটা ছোট্ট বেসরকারি হাসপাতালে। পিতৃপরিচয় ছিল না। উপরন্তু জন্ম দিয়েই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন তরুণী মা। বেওয়ারিশ বাচ্চার দায়িত্ব কে নেবে?

শেষমেশ অনাথ শিশুর ঠাঁই হয় মাদার হাউসে। বয়স তখন ছ’মাস, ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। ফরাসি এক দম্পতি তাঁকে দত্তক নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন। ম্যারি আর আগস্তের হাত ধরে জিদানের দেশে পাড়ি দেন অ্যাঞ্জেলা। এরপর সেখানেই স্কুল, কলেজ জীবন কাটিয়ে পেশাদার ফটোগ্রাফারের চাকরি। তবে ‘মনকেমন’ তাঁর পিছু ছাড়েনি। নতুন মা-বাবা পেয়েও অ্যাঞ্জেলার মন আনচান করত। কিন্তু কেন? “যতবার নিজেকে আয়নায় দেখতাম অনুভব করতাম আমার শিকড় অন্য কোথাও বাঁধা। ফ্রান্সে কর্মসূত্রে কিছু বাঙালি থাকেন। তাঁদের কথা শুনে বুঝতে না পারলেও একটা অন্তরের টান অনুভব করতাম।”

এরপর এল আরেকটা ১৮ ডিসেম্বর। ৪২ বছর আগে যে দিন প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন অ্যাঞ্জেলা। এইদিনই তাঁর মা তাঁকে ছেড়ে চলে যান। ৪২তম জন্মদিনের মাস দেড়েক আগে ফরাসি মা তাঁর কাছে খোলসা করেন পুরো বিষয়টা। বলেন, “কলকাতার মাদার হাউস থেকে আমরা তোমায় দত্তক নিয়েছিলাম অ্যাঞ্জেলা। চাইলে তুমি সেখানে যেতে পারো। হয়তো তোমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”

ব্যস, আর কিছু ভাবেননি তিনি। উড়োজাহাজের টিকিট কেটে নেন মুহূর্তে। প্রিয়বন্ধু ক্লেয়ারকে নিয়ে তাঁর গন্তব্য ছিল তিলোত্তমার সেই হাসপাতাল। কিন্তু এতবড় শহরে মা-কে খুঁজবেন কোথায়? আর তিনি তো বাংলা জানেন না। কথাই বা বলবেন কী করে? কিন্তু ভাগ্যদেবী যে তাঁর সহায়।
স্মিত হেসে অ্যাঞ্জেলা বলছেন, “লে বেনেদিকশন দে দিউ”, ফরাসি ভাষায় এ কথার মানে ঈশ্বরের আশীর্বাদ। যে আশীর্বাদ তাঁকে ঘিরে রয়েছে সবসময়। প্লেনে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় স্নেহদীপ কায়েতের। বাটানগরের স্নেহদীপ কর্মসূত্রে প্যারিসের বাসিন্দা। আপাতত অ্যাঞ্জেলার হয়ে দোভাষীর কাজ করছেন স্নেহদীপই। কথা দিয়েছেন যে করেই হোক খুঁজে দেবেন অ্যাঞ্জেলার মা-কে।

বেঁচে থাকলে আজ অ্যাঞ্জেলার জন্মদাত্রীর বয়স ৬০। কোথায় বাড়ি তাঁর? কেমন দেখতে? কিছুই জানেন না ফ্রান্সের মেয়ে। সম্বল শুধু হাসপাতালের নথি ঘেঁটে পাওয়া মায়ের নামটা। লিলি সিংহ। হাসপাতাল পরিচালন সমিতির অধিকর্তা সজল ঘোষের কথায়, ‘অ্যাঞ্জেলা নামেই ফরাসি। আদতে সে আদ্যোপান্ত বাঙালি। ফেসবুকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ। গড়পারের এই হাসপাতালেই তাঁর জন্ম। কলকাতায় আসার পর হাসপাতালে আমরা তাঁর জন্মদিনও পালন করেছি। আমাদের পক্ষ থেকে যতটা তথ্য তুলে দেওয়া সম্ভব আমরা দিয়েছি। এখন মাকে যদি ও খুঁজে পায় তবেই ষোলোকলা পূর্ণ।’

দূরত্ব প্রায় আট হাজার কিলোমিটার। মাঝে দু’-দুটো মহাসাগর। খান ছয়েক দেশ। সব উজিয়ে নাড়ির টানে কলকাতায় হাজির হয়েছে ।আপন শিকড়ের সন্ধানে ছুটছেন মহানগরের এ মাথা থেকে ও মাথা।

তথ্যসূত্রঃ সংবাদ প্রতিদিন, কলকাতা, ভারত

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.