লরির পাটাতনে পড়ে থাকা শস্য কুড়ানোও যখন পেশা!

আতাউল মোনেম আহমাদ 

সকাল প্রায় দশটা ,বাসের কেবিনে ইঞ্জিনের উপর পাতা গদিতে বসে জ্যাম -জটে আটকে পড়া বাসটায় একদিকে রাঢ় বঙ্গের তেতাল্লিশ ডিগ্রী গরম সঙ্গে গরম ইঞ্জিনে কোমরের নিচ থেকে তখন হাফ বয়েল ডিমের মত ফিল করছি !
বহরমপুর থেকে হরিহরপাড়া গামী বাসে কন্ডাক্টরকে বলে কয়ে কোনরকমে কেবিনের সিটে ড্রাইভারের কোল -ঘেঁষে বসতে পেরেছি , যাব স্বরূপ পুর, যদিও লোকাল পাবলিকের উচ্চারণ ভ্রমে সেটা সুরুক পুর সুরুক পুর শুনছি !
বাসটা তখন সবে বহরমপুর ছেড়ে রেল-গেটের জ্যামে পড়েছে ; দু -একটা গাড়িকে ক্রস করতেই সামনে পড়ল একটা লরি ডালাটা খোলা ! যেহেতু এটা ৩৪ নং জাতীয় সড়ক তাই সারা দিন-রাত এখানে মাল বাহী গাড়ি চলাটাই দস্তুর ! কেবিনে বসার সুবাদে ড্রাইভার দাদার সাথে বেকুফ পাবলিকের মত জ্যাম -রিলেটেড আলোচনা আর সরকারের কর্তব্য নিয়ে উপদেশ মালা রেডি করছিলাম I
হঠাৎ সামনের লরিতে মুড়ো ঝাঁটা হাতে লুঙ্গি -গেঞ্জী পরা একটা লোকের আবির্ভাব । সিরিংগে চেহারার লোকটা একলাফে উঠে পড়ল লরির পাটাতনে । লরিটা বোধহয় কোন গুদামে গম খালি করে ফিরে যাচ্ছে আর তখনও কিছু গম ছড়িয়ে রয়েছে তার পাটাতনে । লোকটা উঠেই ছড়িয়ে থাকা গমগুলো একজায়গায় জমা করতে লাগলো । ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ হলেও চোখে পড়ল তার তাড়াহুড়োর জন্য , ইতিমধ্যে কোত্থেকে বছর দশেকের একটা ছেলে তার কাঁধ ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়েছে মুখ নেড়ে কিছু একটা বলছে, লোকটার তখন সেদিকে তাকানোর ফুরসত নেই ,সে যতটা পারছে গম একজায়গায় জমা করছে ত্ক্তার ফাঁক বাঁচিয়ে , এমন তাড়াহুড়ো যেন পরীক্ষার হলের লাস্ট ওয়ার্নিং বেল পড়ে গেছে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকিI
এদিকে বাচ্চাটাও নাছোড় , শেষে দেখলাম লোকটা মুখ না তুলেই একটা দশটাকার নোট এক হাতে তুলে ধরলো । ছেলেটা টাকাটা নিতেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাত চালাতে লাগলো । ইতিমধ্যে জ্যাম ছেড়ে গিয়েছে লোকটা যতটুকু সম্ভব গমগুলো বস্তায় ভরে ছিটকে নেমে এলো , এদিকে ছেলেটিও লরির ডালার কিনারা বেয়ে অভ্যস্ত পায়ে কেবিনে পৌঁছে গেল !
ড্রাইভার ভদ্রলোকের থেকে জানলাম এটাই এদের পেশা ; এরা এরকমই রাস্তার ধারে ঝাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে শষ্যবাহী গাড়িগুলোর জন্য অপেক্ষা করে  । আর জমাকৃত মালগুলো আবার গুদামে চালান হয় সামান্য পয়সার বিনিময়ে ! আর বাচ্চাটা লরির খালাসীর শাগরেদ , খালাসির হয়ে হিসেবটা বুঝে নিতে তার আবির্ভাব !
লোকটার এই তাড়াহুড়োর কারণ সিগন্যালে দাঁড়ানো পুলিশকে এড়িয়ে কাজ সেরে ফেলার জন্য !

 

আরও পড়ুন