অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার -সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার

তৃপ্তি পোদ্দার

আমি কিছু দিন পূর্বে একটি পোস্ট দেই, “নোংরা করতে দিলে শিশুর মেধাশক্তি বাড়ে”, অনেকে বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আবার অনেকে নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন। এই লেখাটি পড়লে হয়তো বা অনেকের বোধোগম্যতায় আসবে আমার এই কথা বলার কারনটা কি ছিল । এই দুই ধরনের শিশুরা পড়াশুনা বা একাডেমিক অংশগ্রহনের সাফল্য থেকে পিছিয়ে পড়ে, অনেক সময় তাদের এই অপারগতা অভিভাবক না বুঝে অনেক ধরনের মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন করে থাকেন। আসলে শিশুটির বয়স যখন ৫ বছরের নিচে ছিল তখন শিশুর সেন্সরি বিকাশের জন্য তেমন কোন একটিভিটিস করানো হয়নি, তাই শিশুটি অস্তির, আনাড়ি, মনযোগী বা মনে রাখার ক্ষমতা অনেকটা কম । শিশুকে বকা বা কথা না শুনিয়ে শিশুর অপারগতাকে বুঝে তার শিখন শিক্ষনে সাহায্য করা প্রতিটি অভিভাবকের কর্তব্য। আপনার শিশু আপনার, সমাজের, জাতির এবং দেশের।
আমরা প্রত্যেকে জানি, আমরা মানুষ,আমাদের ৫ টি সেন্স রয়েছে যা হলো ভিজ্যুয়াল সিস্টেম, হিয়ারিং সিস্টেম, টেস্ট বা গস্ট্যাটরি সিস্টেম, স্মেল বা ওলফ্যাক্টরি সিস্টেম এবং টাচ বা ট্যাক্টিল সিস্টেম। আমরা অনেকেই জানি না যে আমাদের ভেস্টিবুলার এবং প্রোপ্রাইওসেপ্টিভ সেন্স ও রয়েছে। ভেস্টিবুলার সেন্স হলো মুভমেন্ট এবং ব্যালান্স রাখার ক্ষমতা আর প্রোপ্রাইওসেপ্টিভ সেন্স হলো আমাদের শরীরের অবস্থান জানার ক্ষমতা, যেমন ধরুন: তাকিয়ে না দেখেও বুঝতে পারা কেউ পিছনে আসছে কিনা বা চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারা শরীর কোন দিকে সরানো হচ্ছে।
সেন্সরি প্রসেসিং আসলে কি? সেন্সরি প্রসেসিং হলো আমাদের শরীর পারিপার্শ্বিকতা থেকে সেন্সরি ইনফরমেশন নিয়ে থাকে এবং ব্রেন এই তথ্য গুলো সঃযোগ করে. অনেক সময় তথ্য গুলো ব্রেইনে যাচ্ছে কিন্তু প্রক্রিয়া করে সঠিক কাজটি করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে । সেন্সরি প্রক্রিয়াটি হলো একটি শিশু অন্য একটি শিশুর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে এবং একই তথ্য দিলে ও এক একটি শিশু এক এক ভাবে তথ্য গুলি প্রসেস করবে সঠিক উত্তর বা সমাধানটি দেবার জন্য, এই উপায়ে শিশু সেন্সরি গ্রহন করে এবং সমাধানের পার্থক্য করে থাকে।

শিশুর সেন্সরি সিকিং এবং সেন্সরি এভোইডিং কি?
আমাদের ব্রেন সবসময় আমাদের এই সেন্স থেকে তথ্য নিচ্ছে , এই যে তথ্য নিয়ে প্রসেস করা সবসময় সমস্যা নয়, কিন্তু প্রকাশ করা বা বলা বা করে দেখানো শিশুর জন্য এক একটি পরীক্ষা পাশের মতো. সব শিশুর উত্তর দেওয়ার বা ভাব প্রকাশের ধরন এক নয়. কিন্তু এই ধরনকে সাধারণত ২টি ভাগে ভাগ করা যায় একটি হলো সেন্সরি সিকিং এবং অন্যটি সেন্সরি এভোইডিং। শিশুর সেন্সরি সিকিং হলো, এই ধরণের শিশুরা শক্ত করে ধরে বা খুব জোরে ধরে যাতে করে তাদের শারীরিক অবস্থান এবং প্রেসার বুঝতে পারে আর সেন্সরি এভোইডিং শিশুরা হলো এই সব ধরনের কাজ থেকে এড়িয়ে থাকবে। সেন্সরি সিকিং শিশুরা আন্ডারসেনসিটিভ অথবা হাইপোসেন্সিটিভিটি থাকে, তারা সেন্সরি স্টিমুলেশন বেশি খুঁজে বেড়ায়, এই ধরনের শিশুরা একটু আনাড়ি হবে, জোড়ে কথা বলবে এবং আচরণগত সমস্যা থাকবে। অন্যদিকে সেন্সরি এভোইডিং হলো ওভারসেন্সিটিভ বা হ্যাপারসেন্সিটিভিটি। এই ধরনের শিশুরা আলো ও শব্দে অস্থির হয়ে ওঠে, এছাড়াও অনেক ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে।
সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার শিশুর আচরণগত বিকাশে এবং মনযোগী হবার পথে অনেক বাধা বা প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে. শিশুর খাবারে উৎসাহী না হওয়া, একই খাবার খেতে পছন্দ করা, খুব বেশী কথা বলতে চাওয়া কিন্তু বলতে না পারা, সে যেটা করতে চায় সেটি না করতে পারলে অস্থির হয়ে উত্তেজিত হওয়া, কলম ঠিক মতো ধরতে না পারা, খুব সহজেই মনোযোগ ভেংগে যায় এবং মনোযোগী হতে সময় লাগে, পড়ছে কিন্তু মনে রাখতে পারছে না, এমন অনেক উদহারণ রয়েছে। সব লক্ষণ যে একটি শিশুর মধ্যে থাকবে তা কিন্তু ঠিক নয় আবার ২/৩ টি লক্ষণ ও একটি শিশুর মাঝে থাকতে পারে, তবে মনে রাখবেন, সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার কিন্তু অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার নয় কিন্তু প্রতিটি অটিস্টিক শিশুর সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার থাকবে, হতে পারে হাইপার অথবা হাইপোসেন্সিটিভিটি।

লেখকঃ কলামিস্ট ও আর্লি ইয়ার্স এক্সপার্ট, লন্ডন, ইউকে

আরও পড়ুন