কীভাবে ছোটো শিশুদের রোজা পালনে অভ্যস্ত করবেন?

ইবরাহিম নাজ 

ইসলামে একটি শিশুর আদর্শবান হওয়ার জন্য যাবতীয় পথনির্দেশনা রয়েছে। রোজা ও রমজানের প্রশিক্ষণও এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। যে সন্তানটি হবে আদব-আখলাক ও শিষ্টাচারে সবার সেরা, যে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধন এবং মুক্তির কারণ হবে- এমন সন্তান প্রতিটি মা-বাবারই কাম্য।
মুসলিম রেনেসাঁসের কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন-

‘ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে,
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।
আকাশ-আলোর আমরা সুত,
নূত বাণীর অগ্রদূত,
কতই কি যে করবো মোরা-নাইকো তাহার অন্ত-রে….’

কবি গোলাম মোস্তফার এ কয়টি লাইন গভীরভাবে অনুধাবন করলে শিশুদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সহজেই অবগত হওয়া যায়।
কবির ভাষায়-ভবিষ্যতের বহু বড়ো বড়ো মহামানব শিশুদের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে। তাদের মধ্য থেকেই অতীতে বের হয়ে এসেছিল যুগশ্রেষ্ঠ অসংখ্য মনীষী।

‘শিশু’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে এক নিষ্পাপ মায়াবী চেহারা ভেসে ওঠে। এরা ঠিক চারাগাছের মতো।। হাওয়ায় দুলতে থাকা সবুজ-শ্যামল নির্মল পাতাযুক্ত ছোট্ট চারাগাছই এদের উদাহরণ। বাচ্চারা ছোটোকালে যা শেখে, পরবর্তী জীবনে সেটিরই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।

তাই আমাদের করণীয় হলো- ছোটোকাল থেকেই গভীর পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। এ ছাড়াও সন্তানকে উত্তম গুণাবলি ও ভালো কাজে অভ্যস্ত বানানোর ক্ষেত্রে মহানবি (সা.) বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত শিশুদের রোজা পালন
শিশুদের রোজা পালনের বিষয়টি বিভিন্ন হাদিসে উঠে এসেছে। এসব হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সাহাবিরা সন্তানদের নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে রোজা রাখতেন। রমজানে অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব, শিশুদের রোজা রাখতে উদ্বুদ্ধ করা।
রুবাই বিনতে মুয়াওয়েজ (রা.) বলেন-

‘রাসূল (সা.) আশুরার সকালে মদিনার আশপাশে আনসারদের এলাকায় এই ঘোষণা পাঠালেন- যারা রোজা অবস্থায় সকাল শুরু করেছে, তারা যেন রোজা সম্পন্ন করে। আর যারা রোজা না রেখে সকাল অতিবাহিত করেছে তারা যেন বাকি দিনটুকুর জন্য রোজার নিয়্যাত করে নেয়। এরপর থেকে আমরা আশুরার দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের ছোটো শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। আমরা তাদের নিয়ে মসজিদে যেতাম এবং তাদের জন্য উল দিয়ে খেলনা তৈরি করে রাখতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে সেই খেলনা দিয়ে ইফতার পর্যন্ত সান্ত্বনা দিয়ে রাখতাম।’ (বুখারি ও মুসলিম)
উমর (রা.) রমজান মাসে এক মদ্যপ ব্যক্তিকে বলেছিলেন- ‘তোমার জন্য আফসোস! আমাদের ছোটো শিশুরা পর্যন্ত রোজাদার! এরপর তিনি তাকে প্রহার করা শুরু করলেন।’

যে বয়সে শিশু রোজা পালনে সক্ষমতা লাভ করে, সে বয়স থেকে পিতা-মাতা তাকে প্রশিক্ষণমূলক রোজা রাখাবেন। এটি শিশুর শারীরিক গঠনের ওপরও নির্ভর করে। ওলামায়ে কেরাম কেউ কেউ এ সময়কে ১০ বছর বয়স থেকে নির্ধারণ করেছেন।

যেভাবে ছোটো শিশুদের রোজা পালনে অভ্যস্ত করবেন
ছোটো শিশুদের রোজা পালনে অভ্যস্ত করে তোলার বেশকিছু পন্থা রয়েছে। নিম্নে তেমনই কিছু পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো-
১. ছোটো শিশুদের সামনে রোজার ফাজায়েল সম্পর্কিত হাদিসসমূহ তুলে ধরতে হবে। তাদেরকে জানাতে হবে, রোজা জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম। জান্নাতে একটি দরজা আছে ‘রাইয়্যান’, যে দরজা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করবে।
২. প্রথমদিকে দিনের কিছু অংশে রোজা পালন করানো। ক্রমান্বয়ে সেই সময়কে বাড়িয়ে দেওয়া।
৩. রমজান আসার আগ থেকেই কিছু নফল রোজা রাখানোর মাধ্যমে তাদেরকে অভ্যস্ত করে তোলা যেতে পারে। যাতে তারা আকস্মিকভাবে রমজানের রোজার সম্মুখীন না হয়।
৪. প্রতিদিন বা প্রতিসপ্তাহে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে রোজা পালনে উৎসাহিত করা।
৫. একেবারে শেষ সময়ে সাহরি গ্রহণ করানো। এতে করে তাদের জন্য দিনের বেলায় রোজা পালন সহজ হবে।
৬. ইফতার ও সাহরির সময় পরিবারের সব সদস্যের সামনে তাদের প্রশংসা করা- যাতে তাদের মানসিক উন্নতি ঘটে।
৭. শিশুদের ক্ষুধা লাগলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে অথবা বৈধ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা। এমন খেলনা- যাতে পরিশ্রম করতে হয় না; যেভাবে সাহাবিরা তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে করতেন।
৮. উত্তম হবে যদি বাবা তার সন্তানকে নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যান। এতে করে সন্তান নামাজের জামাতে উপস্থিত হয়ে, মসজিদে অবস্থান করে কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিররত ব্যক্তিদের দেখতে পাবে।
৯. যার একাধিক শিশু রয়েছে, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করা যেতে পারে।
১০. ইফতারের পর শরিয়ত অনুমোদিত ঘোরাফেরার সুযোগ দেওয়া অথবা তার পছন্দমতো খাবার, ফল-ফলাদি ও শরবত প্রস্তুত করা।

শিশুকে রোজা রাখার জন্য বকাঝকা বা জোর জবরদস্তী না করে সুন্দরভাবে রাসুলের শেখানো পদ্ধতি অবলম্বন করে সংযম, সাধনা ও তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন এই রমজানে । তাদের সামনে এই রোজাকে সহজ করে উপস্থাপন করুন । ইসলামের যে কোন বিধানের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ বলেছেন  ‘তোমরা সহজ কর, কঠিন কর না ।’ 

লেখকঃ গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন