Ads

তারপরও যে কারণে মেয়েকে বাংলা মিডিয়ামে পড়াচ্ছি ।। ১ম পর্ব

।। হাবিবা মুবাশ্বেরা ।।

৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরে দেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবার ঠিক দুদিন আগে দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে কেন হত্যা করা হয়েছিল জানেন?কারণ দেশটা ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হলেও যেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে –এই উদ্দেশ্যে।স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে আমরা নিশ্চয়ই এই পরিকল্পনার ফলাফলটা উপলব্ধি করতে পারছি ।

একটা শরীরকে সম্পূর্ণভাবে সক্রিয়  রাখার জন্য সবগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজন হলেও তার মস্তিষ্ক বা ব্রেন যেমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবার জন্য, ঠিক তেমনি একটি দেশের জন্য সব ধরনের পেশার মানুষের প্রয়োজন হলেও দেশপ্রেমিক, সৎ বুদ্ধিজীবীদের প্রয়োজন দেশটিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য। তাই কোনো দেশকে যদি আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন রেখেও সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক, চিকিৎসা সহ বিভিন্ন খাতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় তবে তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে রাখাটা সবার আগে জরুরী। এই সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশে বিগত কয়েক বছর যাবত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটার পর একটা এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছে যেন দেশের স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্ম চিন্তাশীল ও যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে না পারে।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত আপডেট করতে হবে অবশ্যই, কিন্তু সেটা হতে হবে দেশের বাস্তবতা ও সক্ষমতার সাথে মিল রেখে। গত বছর থেকে যে নতুন কারিকুলাম চালু করা হয়েছে তার নেগেটিভ দিকগুলো নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি এক বছর যাবত। আমার মতো সচেতন ও ভুক্তভোগী অনেক অভিভাবকই অনলাইনে, অফলাইনে আন্দোলন করেছেন কিন্তু ফলাফল শূন্য। দেশের সাধারণ মানুষের মতামতের কোন মূল্যই যে ক্ষমতাসীনদের কাছে নেই তা আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে এই আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে।

আরও পড়ুন-

রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট করবেন যেভাবে ।। পর্ব -১

তাই আজ আর এই টপিকে লিখবো না। আজ বরং নতুন একটা বিষয়ে লিখতে চাই। কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা আছে জেনেও আমি আমার মেয়েকে এই বাংলা মিডিয়ামে পড়াচ্ছি /পড়াতে চাই ? লেখাটা অনেকটা নিজের জন্যই  সেলফ ক্লারিফিকেশন; সেইসাথে আমার মতো যারা অসহায় অভিভাবক তাদের জন্য একটা আশার আলো হতে পারে।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বহু আগে থেকেই তিনটি শাখায় বিভক্ত। মাদ্রাসা, বাংলা মিডিয়াম এবং ইংলিশ মিডিয়াম। এর মধ্যে বাংলা মিডিয়ামে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছেলে-মেয়েরা পড়ে । ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ।  আর মাদ্রাসায় দেশে নিম্নবিত্ত এবং ধার্মিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ে। যদিও এখন মাদ্রাসায় ছেলেমেয়েকে পড়ানোর ঝোঁক সাধারণদের মাঝেও বেড়েছে । এটাই হচ্ছে মোটা দাগে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত চিত্র।

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়ারা ’ও লেভেল’ পাস করার পর অধিকাংশই দেশের বাইরে চলে যায় । মাদ্রাসার অধিকাংশ ছাত্রই আবার মাদ্রাসা ,মসজিদে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে । আর বাংলা মিডিয়ামে পড়া দেশের মেজরিটি ছাত্র-ছাত্রী দেশে থেকে দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ,অর্থনীতি আইন-শৃঙ্খলাসহ সব ক্ষেত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে । আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পড়া কেউ কেউ অবশ্য আলিম পাশের পর সাধারণ বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রদের কাতারে দাড়িয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পরবর্তী পড়াশুনা চালিয়ে নেয়ার পর । এই বাস্তবতা আমরা বহু বছর থেকেই দেখে আসছি। তাই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই লক্ষ্য নিয়েই বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের বারবার গিনিপিগ বানিয়ে তাদের কনফিউজড করে দেয়া হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে বিগত কয়েক বছর যাবৎ দেশের বাংলা মিডিয়াম থেকে পাস করা (’জেনারেল পড়ুয়া ’-এই পরিচয়ে বেশি পরিচিত) একটা শ্রেণীর মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা এসেছে আলহামদুলিল্লাহ । ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, লেখক, ব্যবসায়ীসহ একটা শ্রেণী যারা বাংলা মিডিয়াম থেকে পাশ করেছেন তারা নিজেরা স্ব-উদ্যোগে ইসলামিক বিষয়ে পড়াশোনা করছেন এবং দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকেও সচেতন করার চেষ্টা করছেন ।

আরও পড়ুন-

আপনার শিশুর আপনিই শিক্ষক

 

এই শ্রেণীটির খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে তারা নিজেরা জেনারেল লাইন থেকে পাস করা বলে তারা সহজেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাথে রিলেট করতে পারছেন । এমন না যে তারা যেসব ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছেন তা দেশের মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের স্টুডেন্টরা এতদিন জানতেন না কিন্তু তাদের সাথে স্পষ্টতই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বাচনভঙ্গি, ভাষা, উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটা দূরত্ব রয়েছে; যার কারণে তারা এতদিন তাদের ধর্মীয় জ্ঞানকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেননি।

এখন এই যে নবজাগরণ শুরু হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে এবং আরো বিস্তৃত করতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে একই সাথে দ্বীনী ও দুনিয়াবী (প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করলাম) শিক্ষায় শিক্ষিত করা খুব জরুরী। আর এজন্যই আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না । তাদের মাঝে দাওয়াতী কাজ করতে হলে তাদের মাঝে থেকেই করতে হবে। তাদের চিন্তার ধরন বুঝে, তাদের সাথে মিশে, তাদের ভাষায় তাদেরকে মোটিভেট করতে হবে। যদিও ব্যাপারটা অনেকটা রিস্কি, প্রতি পদে পা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে ময়লা পরিষ্কার করে সবার চলার জন্য উপযোগী রাস্তা তৈরি করতে হলে তো নিজের শরীরে ময়লা লাগার রিস্ক নিতেই হবে।

আর এই নিয়তে আমি আমার মেয়েকে বাংলা মিডিয়ামে পড়াচ্ছি যেন সে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়। সবাই যদি হতাশা থেকে বাংলা মিডিয়াম থেকে চলে যায় তবে যারা নিরুপায় হয়ে রয়ে যাবে তাদেরকে বিপথে পরিচালিত করা সহজ হয়ে যাবে, দূরভিসন্ধিকারীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যাবে।

তাই আমরা যারা সচেতন এবং শিক্ষিত অভিভাবক আছি তাদেরকে নিজেদের সন্তানদেরকে একেক জন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যাদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা থাকবে, যারা নিজের স্বার্থের জন্য দেশকে বিক্রি করে দেবে না, বরং তাতে বাঁধা দেবে। যাদের কর্মক্ষেত্র হবে ইহকাল কিন্তু ফোকাস থাকবে পরকালে। জানি, এই পথ সহজ নয়, বন্ধুর। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি–”নিয়ত গুণে বরকত।” তাই আমি আমার মেয়েকে এই নিয়তে সাধারণের মাঝে রেখেই বড় করতে চাই ইনশাআল্লাহ।

চলবে…

(পরবর্তী পর্বে থাকবে বাংলা মিডিয়ামের অভিভাবকদের জন্য কিছু গাইডলাইন)

লেখকঃ প্রাবন্ধিক এবং উদ্যোক্তা 

…………………………………………………………………………………………………………………………

মহীয়সীর প্রিয় পাঠক ! সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে লেখা আর্টিকেল ,আত্মউন্নয়নমূলক অসাধারণ লেখা,গল্প,কবিতা পড়তে মহীয়সীর ফেসবুক পেজ মহীয়সী / Mohioshi  তে লাইক দিয়ে মহীয়সীর সাথে সংযুক্ত থাকুন। আর হা মহীয়সীর সম্মানিত প্রিয় লেখক!  আপনি আপনার  পছন্দের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইলে-  [email protected]  ও  [email protected] ; মনে রাখবেন,”জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম ।” মহীয়সীর লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধনের জন্য রয়েছে  আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মহীয়সী লেখক ও পাঠক ফোরাম ; আজই আপনিও যুক্ত হয়ে যান এই গ্রুপে ।  আসুন  ইসলামী মূূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সুস্থ,সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি । আল্লাহ বলেছেন,“তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলো ।” (সূরা বাকারা-১৪৮) ।আসুন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে সচেষ্ট হই। আল্লাহ আমাদের সমস্ত নেক আমল কবুল করুন, আমিন ।

আরও পড়ুন