বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিৎ ?

তানজিয়া ইসলাম তানহা

বাবা-মা-সন্তান জেনারেশান গ্যাপ, মাইন্ডসেট গ্যাপ কমাতে অনেকে এই দুইয়ের মধ্যে ফ্রেন্ডলি সম্পর্কের উপর খুব জোর দেন। তবে এমন ফ্রেন্ডশীপের রূপটা কেমন হবে, এই ফ্রেন্ডশীপে কী কী অ্যালাউড আর কী কী অ্যালাউড থাকবে না সেটা সে সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা নেই। এই ফ্রেন্ডশীপ এক্স্যাক্টলি আমাদের সমবয়সী ফ্রেন্ডদের মত ফ্রেন্ডশীপ হবে কিনা, নাকি কিছু রেস্ট্রিকশান থাকবে, থাকলে সেটা কতটুকু, কী কী ব্যাপারে, সেসব নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।ফলে দেখা যায় যে অল্পসংখ্যক কিছু পরিবারে আমরা প্যারেন্টস-চিলড্রেন ফ্রেন্ডলি রিলেশান দেখতে পাই সেখানে নানারকম ইমব্যালেন্সড আচরণ ফুটে উঠে।
কিভাবে?

ওয়েল। যেমন, আমরা প্রত্যেকেই হয়তো নিজের ফ্রেন্ডসার্কেলে বা দূরবর্তী পরিচিত সার্কেলে এমন কাউকে না কাউকে পেয়েছি যার সাথে যে কোনো ফ্রেন্ডলি আলাপই করি না কারণ সে তার মা-কে গিয়ে সেটা বলে দেয়! সে তার মায়ের সাথে এতোই ফ্রেন্ডলি যে তাদের মধ্যে কোনো প্রকার কথাবার্তার কোনো রেস্ট্রিকশান নেই! তা সে নিজে যদি ব্যাক্তিত্বহীন হয় তাহলে তার সাথে কোনো রেস্ট্রিকশান নাই থাকতে পারে কিন্তু তার ফ্রেন্ডের তো ব্যাক্তিত্ব আছে! সেই ফ্রেন্ডের তো প্রাইভেসী আছে নাকি? আপনার ফ্রেন্ড তার যে কোনো কথা আপনার সাথে শেয়ার করতে কমফোর্ট ফিল করে দ্যাট ডাজন্ট মিন তিনি সেটা আপনার মায়ের সাথে শেয়ার করতেও, আপনার মা সেটা জানলেও কমফোর্ট ফিল করবেন!

দেখা যায় এরকম ব্যাক্তিরা কখনোই আর ফ্রেন্ডদের মধ্যে বিশ্বস্ততার জায়গাটা পান না। মানুষের মনে তার প্রতি খচখচানি ভাবটা কেটে উঠে না যা কিনা ব্যাক্তিটির নিজের জন্যই ক্ষতিকর।এরকম অতি মা-ফ্রেন্ডলি মানুষ যেমন নিজেকে ভালো বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না তেমনি নিজেকে ভালো জীবনসাথী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

ম্যারিটাল রিলেশন নষ্ট হওয়ার পিছনে অন্যতম একটা কারণ হলো এই ওভার মা ফ্রেন্ডলি আচরণ। সচরাচর আমরা এটা শুধু ছেলের মা আর ছেলের সাথে রিলেট করি তবে মেয়েপক্ষ থেকেও এ দায় মোটেই কম নয়।

অতি মা ফ্রেন্ডলি ছেলেমেয়েরা তাদের হাজব্যান্ড/ ওয়াইফের সাথে সব মনোমালিন্য সবসময় মায়ের সাথে শেয়ার করে। ছেলের মা শিখিয়ে দেয় কিভাবে এই ডাইনী বৌ ছেড়ে দিতে হবে আর মেয়ের মা শিখায় কিভাবে এমন অপ্রেসর(যাস্ট মনোমালিণ্য হলেই!) স্বামীর ঘর ছেড়ে দিতে হবে, কিভাবে জামাইকে হাতের মুঠোয় রাখতে হবে, কিভাবে জামাইকে তার পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে এগুলা চিকন বুদ্ধি উভয়পক্ষের মাতৃকূল থেকেই আসে।

আর মেরুদন্ডহীন স্টুপিড ছেলেমেয়েগুলো নিজের বোধবুদ্ধি ভালো করে প্রয়োগ করতে না জানায় সেসব কুকথাগুলোর ভিত্তিতেই নিজের কপাল নিজে পোড়ায়। বাবা-মা ভক্ত এমন পার্সোনালিটিলেস ছেলেমেয়েও সমাজে দেখা যায় যারা নিজের স্পাউসের সাথে কিভাবে ইন্টারকোর্স করেছে সেটা পর্যন্ত আলোচনা করে! আহা প্রগ্রেসিভনেস!!

বাপ-মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকার, নিজেকে তাঁদের থেকে আলাদা আইডেন্টিটি, পার্সন না ভাবতে পারার কারণে এরকম সন্তানেরা সারাজীবনভর বাকি সব সম্পর্কগুলোতে সাফার করে। কারণ তারা কখনোই মাম্মি/ড্যাডি’স বয়/গার্ল এই সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে না।

সেক্সুয়ালিটি নিয়ে ট্যাবু আর কুসংস্কার দূর করতে প্যারেন্টস-চিলড্রেন অ্যাডাল্ট টকে উৎসাহিত করার যত প্রচার প্রচারণা আমরা দেখি আসলে তার কতটুকু অ্যাপ্রোপ্রিয়েট? মেয়ের পিরিয়ড নিয়ে বাবার সাথে সবসময় খোলামেলা কথা বলা বা এই রিসেন্টলি যে প্রথম আলোতে মায়ের পিরিয়ড সম্পর্কে ছেলেও জানে এমন আর্টিকেল পাবলিশ করা এর কতটুকু আসলে মোরালিটির সাথে যায়? আদৌ কী যায়?

ট্যাবু দূরা করা আর ব্যাপারটাকে ইচ্ছামত যেমন খুশি, যতটা খুশি মুরুব্বিদের সাথে রগরগে আলোচনা করা বিষয়টা কী এক? তাহলে বাবা-মা-সন্তান আলাদা ব্যাক্তিত্ববোধের কী রইলো? বন্ধুদের সাথে আমরা যেমন খুশি তেমন আলোচনা যদি এক্স্যাক্ট সেম ওয়েতে বাবা-মায়ের সাথেও যাচ্ছেতাইভাবে করি তাহলে উনাদের যে আলাদা একটা রেসপেক্টের জায়গা রয়েছে সেটা কোথায় থাকলো? উনারা তো একদম সমবয়সী তুই-তোকারি স্কুল ফ্রেন্ডদের মত খেলো হয়ে গেলেন।ট্যাবু সরানোর উদ্দেশ্য কি এটা ছিলো?না।

ট্যাবুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলমান থাকবে।

মেয়েরা তো তবু পিরিয়ড নিয়ে মা-খালা থেকে অগ্রীম ধারণা পায়, হেল্পও পায়। কিন্তু ছেলেরা একদমই তাদের বায়োলজিক্যাল চেঞ্জের ব্যাপারে বড়দের থেকে ধারণা পায় না। যেটির জায়গায় স্থান করে নেয় ইচড়ে পাকা সিনিয়র ভাইদের আলাপ, পর্ণোগ্রাফি, চটি বই ইত্যাদি। অথচ এসময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, মেন্টাল সাপোর্ট পাওয়া তাদের অধিকার ছিলো।

আমাদের অজ্ঞতার কারণেই এসব গ্যাপ পূরণ করতে এমন সব প্রচারণা চালানো হচ্ছে যা মোটেই ব্যাক্তিত্বের সাথে যায় না! এসব বিষয়ে ফ্রেন্ডলি হতে গিয়ে পিরিয়ড নিয়ে বাবার সাথে কেনো প্রয়োজনের বেশি ক্লোজ হতে হবে? প্রথমত সবকিছুতো মা বা ফিমেল মেম্বারদের সাথেই কাউন্সেলিং করা যায়। বাবার সাথে অবশ্যই হতে পারে প্রয়োজনের বেলায়। ছোটবেলা থেকে পিরিয়ডের ব্যাথায় আমাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ানো, চিকিৎসা করানো, ওষুধ কেনা, প্যাড কেনা সবকিছুতে আম্মুর সাথে আব্বু অটোম্যাটিক্যালি আছেন। এরকম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশান দেয়া অবশ্যই গোড়ামি।

কিন্তু তার মানে কী এমন প্রয়োজন না থাকলেও, ফিমেল মেম্বার থাকলেও বাবার সাথে আমার পিরিয়ড কাউন্সেলিং করতে হবে?মায়ের পিরিয়ড নিয়ে ছেলের জানতে হবে? এমন ছেলে তো বৌয়ের পিরিয়ড, বৌয়ের প্রাইভেট সবকিছুও মায়ের সাথে আলাপ করবে।জঘন্য লজ্জাজনক ব্যাপার।ট্যাবু ভাঙা আর লজ্জার ধারণা উঠিয়ে দেয়া কখনোই এক হতে পারে না।

যেটা নিয়ে বলছিলাম,প্যারেন্টস-চিলড্রেনের মধ্য ফ্রেন্ডলি রিলেশান করতে গিয়ে আমরা হিউম্যান-আনফ্রেন্ডলি যেনো কিছু না করি।বাবা-মায়ের সাথে ফ্রেন্ডশীপের ক্ষেত্রে যেনো আমরা একটা সুন্দর সীমা সবকিছুর মধ্যে রাখি। নিজের একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয়, বন্ধুদের ব্যাক্তিগত বিষয়, নিজের স্পাউজ, ম্যারিটাল লাইফ এই সবকিছুর মধ্যে যেনো আমরা একটা সুন্দর সীমারেখা মেইন্টেইন করি।

একটা সম্মানজনক দূরত্ব যে সম্পর্কের মধ্যে নেই সে সম্পর্কে কখনোই সম্মান আর বিশ্বাস বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না।বিয়ের সময়েও যাচাই করে নেয়া উচিত পাত্র/পাত্রী মাম্মি’স বয়/গার্ল কিনা।মাম্মি’স বয়/গার্লদের বিয়ে করার চেয়ে আজীবন একা থাকা বেশি সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির।

লেখকঃ কলাম লেখক 

আরও পড়ুন