মানসিক নির্যাতন শিশুর জ্ঞান বিকাশের ‌অন্তরায়

এইচ বি রিতা

ফেসবুকে ঢুকলেই দুই একটা ভিডিও আজকাল চোখে পড়ে। সম্ভবত বছরের শুরুতে করা ভিডিও। একটি ভিডিওতে একটি ছোটশিশু এবং মা’কে দেখা যায়। শিশুটি প্লে’তে যাচ্ছে সম্ভবত। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে যে, একজন মা (সম্ভবত চিটাগং এর ভাষায়) তার ছোট শিশু কন্যাটিকে জোর করে বর্ণ শিখাতে চাচ্ছেন।কিন্তু শিশুটি শিখতে এখনো তৈরী নয়। তাই প্রতিবার মা যখন তাকেপড়তে বলেন, শিশুটি চিৎকার করে কান্না করে এবং ‘আমি পড়বো না পড়বো না’ বলে চিৎকার করে। মা তাকে ধমক দিচ্ছেন।কখনো বেত হাতে পিটানোর ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু শিশুটি চিৎকার করেই যাচ্ছে। কান্না থামছেনা। একই কথা বার বার বলছে, ‘আমি পড়বো না আমি পড়বোনা।’

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একই বয়সী একটি শিশুকে তার মা পড়ার জন্য ধমকাচ্ছেন। শিশুটি কান্না করছে আর বলছে, ‘খালি পড়া আর পড়া। আমারে বেত দিয়ে মারো, আমার কষ্ট লাগেনা?”

সব থেকে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল এই যে, ভিডিওগুলোতে শিশুগুলোকে যতটা না চিৎকার-কান্না করতে দেখা যাচ্ছে, তার থেকেওবেশী ভিউয়ারদের হাসতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা এমন যেন, শিশুটির কান্না, চিৎকার তাদের একটি বিনোদন।

এই ভিডিওগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলাম আমার পরিচিত এক শিশু সন্তানের মায়ের কাছে। তিনি বললেন, ‘এগুলো কবেইদেখসি।’বুঝতে পারলাম, তিনি এটাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছেন। অনেক পিতা-মাতারাই নিচ্ছেন হয়তো। কিছুটা বিভ্রান্ত হলাম, কিছুটারাগান্বিতও হলাম।

আমরা জানি যে ‘চাইল্ড আ্যাবিউজ’ বলে একটা টার্ম রয়েছে মনোবিজ্ঞানে যার বাংলা অর্থ শিশু নির্যাতন। অর্থাৎ সর্বাবস্থায়কোনো শিশুকে অপব্যবহার করা। আবার শিশু নির্যাতন সাধারণত ৪ প্রকার। শারীরিক নির্যাতন (physical abuse), মানসিকনির্যাতন (emotional /psycological abuse), অবহেলাজনিত নির্যাতন (neglect abuse) ও যৌন নির্যাতন (sexual abuse)।

যৌন নির্যাতন ছাড়া বাকি সব কটিই অনেক সময় পিতা-মাতা দ্বারা সংগঠিত হয়ে থাকে এবং প্রায় সময়ই আমাদেরঅভিভাবকেরা সেটা না বুঝেই করে থাকেন। কখনো কখনো গোঁড়া সংস্কৃতি বা পটভূমি এখানে বড় একটা ভূমিকা রাখে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে বিনোদন দিতে আমাদের বাঙ্গালী মায়েরা তাদের শিশু সন্তানটিকে যেভাবে অক্ষর শিখাতে বেতহাতে হুমকি, ভয় দেখাচ্ছেন, সেটাই মূলত মানসিক নির্যাতন, অর্থাৎ ইমোশনাল/ সাইকোলজিক্যাল আ্যবিউজ।

মানসিক নির্যাতন অর্থাৎ ইমোশনাল/ সাইকোলজিক্যাল আ্যবিউজ কি?

শিশু সন্তানকে সামনে রেখে পরিবারের অন্য কাউকে গালি দেওয়া, কটু কথা বলা, গায়ে হাত তোলা বা অন্যের সমালোচনা করা, সন্তানকে ভালোবাসা এবং স্নেহ প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হওয়া, সন্তানকে উপেক্ষা করে মানসিক সমর্থন ও নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়া. বিব্রতকর সমালোচনার মাধ্যমে সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে ছোট করা, হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো, অন্যের সঙ্গে তুলনাকরা….প্রভৃতি বিষয়গুলোকে চাইল্ড ইমোশনাল অ্যাবিউজ বা মানসিক নির্যাতন বলে গণ্য করা হয়।

বুঝে না বুঝে শিশুদের মানসিক নির্যাতন করার ফলাফলে একাধিক সংবেদনশীল, মানসিক এবং শারীরিক সমস্যার সম্মুখীনহতে পারে আমাদের শিশুরা। যার মধ্যে রয়েছে,

অস্বাস্থ্যকর কৌশল বা অভ্যাস (চুষা, কামড়ানো, দোলা, স্ব-ক্ষতি), মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি (উদ্বেগ, হতাশা, ফোবিয়াস), বিশ্বাসেরঅক্ষমতা বা সম্পর্ক গঠনে ব্যর্থতা, আক্রমণাত্মক বা অসামাজিক আচরণ, ড্রাগ এবং অ্যালকোহলের ব্যবহার, উন্নয়নমূলকবিলম্ব, ঘুম বা খাওয়ার ব্যাধি, নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে অসুবিধা, পড়াশোনা বা কথা বলার ব্যাধি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যৌনআচরণ, আচরণগত সমস্যা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে অসুবিধা হওয়া, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা, আত্মঘাতী চিন্তা বা প্রচেষ্টা, স্বল্পআত্মবিশ্বাস, নিজের প্রতি স্ব-সম্মান বা স্ব-মূল্য হারানো…ইত্যাদি।

আজকের দিনেও চাইল্ড অ্যাবিউজ বা শিশু নির্যাতন আমাদের পরিবারে ও সমাজে প্রকট। বাংলাদেশি পিতা-মাতারা সেগুলোনিয়ে মাথা ঘামান না। কারণ সন্তানের প্রতি যেকোনো ধরনের আচরণ ও সিদ্ধান্ত নিতে তাঁরা সমাজ বা রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারাসাধারণত বাধাগ্রস্ত হন না (যদি না সেটা হত্যার পর্যায়ে যায়)। কিন্তু বাংলাদেশি-মার্কিনি পিতা-মাতাদের বেলায় এই বিষয়েস্বেচ্ছাচারী আচরণের ওপর বাঁধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

ভাল শিশু পরিচর্যা বেছে নেয়া প্রতিটা পিতা-মাতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত। কেননা, নিরাপদ এবং ইতিবাচক শিশুপরিচর্যা একটি শিশুর জ্ঞান বিকাশের সুস্থ্যতা বৃদ্ধি এবং বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। শিশুর স্বাস্থ্যকর পরিচর্যায় পড়ায় মনযোগীকরতে লাঠি হাতে পিটানোর ভয় বা হুমকি নয়, বরং এক্ষেত্রে সময়, ধৈর্য্য ও জ্ঞানের প্রয়েজন।

শিশুটি আপনার ভবিষ্যত। তাকে যত্ন করুন। পিটিয়ে, ধমকিয়ে নয় বরং শিশুটির জীবনের শুরুতে নিজ গৃহকে করুন প্রথম স্কুলএবং প্রথম শিক্ষক হন আপনি নিজে। আনন্দ, বিনোদন, মিউজিক, গান, খেলনা এবং বিভিন্ন বাস্তবিক দৃশ্যাবলীর মাধ্যমেশিশুটিকে প্রয়োজনীয় ‌‌অক্ষর চিনতে ও বুঝতে শিখান।

শিশুর জ্ঞান বিকাশে যত্নশীল হোন, একজন মডেল হোন।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ইউএসএ প্রবাসী

আরও পড়ুন