Ads

শিশুদের কীভাবে নামাজ ও মসজিদমুখী করবেন?

মুনতাসির মামুন

আমরা যারা মুসলিম বাবা-মা বা অভিভাবক তারা আমাদের বাসার শিশুদের নামাজ পড়া বা মসজিদে যাওয়া নিয়ে জোর জবরদস্তি বা বকা-ঝকা না করে নিম্নোক্ত উপায়ে তাদেরকে মসজিদমুখী করতে পারি-

আশেপাশের পরিচিত, পছন্দনীয় বিষয় বা জিনিসের সাথে নামাজ ও মসজিদের যোগসূত্র স্থাপনঃ

শুরুতেই নামাজ পড়ার উপকারীতা সম্পর্কে বাচ্চার কচি মনে একটা সুন্দর ও স্বচ্ছ ধারনা দিতে হবে। তারা যেভাবে বুঝে তাদের সেভাবে সহজ ভাষায়, আকর্ষনীয় উপায়ে বোঝাতে হবে। তাদের জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়, ঘটনা, উদাহরণ দিয়েই তাদের মনে বিষয়গুলো ঢোকাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আশা করা যায়। ছোটদের পরিচিত পরিবেশ ও বিষয়ের মধ্যে রয়েছে আনন্দ, স্কুল, খেলা, জয়, মজাদার খাওয়া, উপহার ইত্যাদি। এগুলোর সাথে নামাজকে সম্পৃক্ত করে বোঝাতে পারলে তা হবে আনন্দদায়ক, সহজবোধ্য এবং স্থায়ী।

ভালবাসাঃ

মা-বাবা যেমন ছোটদের খুব ভালবাসেন, তাদের সব সময় কাছে পেতে চান, চোখে চোখে রাখতে চান তেমনি আল্লাহ আমাদের ভালবাসেন। মা বাবা যেমন আমাদেরকে বেশিক্ষণ নজরের বাইরে রাখতে চান না তেমনি আল্লাহও আমাদের অল্প সময়ের ব্যবধানে পাশে পেতে চান। তাঁর ভালোবাসা মা বাবার ভালবাসার চেয়েও অনেকগুন বেশি ও গভীর।

তিনি চান তাঁর প্রিয় সৃষ্টি তাঁর কাছাকাছি থাকুক। এজন্য তিনি দিনে ৫ বার তাঁর বান্দাহদের কাছে পাবার আয়োজন করেন এবং মানুষদের সুযোগ দেন আল্লাহকে কাছে পাওয়ার। আল্লাহ আমাদের ভালবাসেন তাই নামাজ পড়তে বলেন। নামাজের বেসিক যে উদ্দেশ্য তা হলো দিনের নির্দিষ্ট সময় পরপর আল্লাহর সাথে মত বিনিময়, তাঁর দুয়ারে ধরনা দেয়া, তার ভালোবাসা পাওয়া ও তাকে ভালোবাসা।

স্কুলঃ

নামাজ যে কত কিছু শেখায় তা অল্প কথায় বলা যাবে না। মুমিনের জন্য সুন্দর স্কুল হলো নামাজ। স্কুলে সময়মত যেতে হয়, নামাজও দিনে সময়মত পড়তে হয়, ৫ বার নিয়ম করে মসজিদে যেতে হয়। প্রতিটি ক্লাসে একজন হেড টিচার থাকেন যিনি সবাইকে পরিচালনা করেন। আবার ক্লাসে একজন ক্লাস ক্যাপ্টেন ও থাকে যে ছাত্রদেরকে পরিচালনা করে থাকে।

নামাজেও তেমনি থাকেন ইমাম। তিনি পুরা দলকে নেতৃত্ব দেন। স্কুলে গেলে অনেক নামের অনেক ধরনের বন্ধুদের সাথে দেখা হয়, আলাপ হয়, খেলা ধুলা করা যায়, আনন্দ করা যায় তাদের সাথে তেমনি মসজিদে শুধু কাছাকাছি বয়সের বন্ধুরাই থাকে না, ছোট বড় অনেক বন্ধু এবং বাবা, শিক্ষক, চাচার বয়সী মানুষও থাকেন। সবার সাথে পরিচিত হওয়া ও কথা বলার সুযোগ তৈরি হয় মসজিদে। এভাবে

নামাজের সাথে স্কুলের একটা যোগসূত্র করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে স্কুলের মত মসজিদও একটা সুন্দর জায়গা যেখানে অনেক কিছু শেখা যায়, অনেক মজা করা যায়।

জয়ঃ

বিজয়ী হতে কার না ভাল লাগে? ছোটদের তো এটা খুবই পছন্দের। হোক সেটা খেলা বা যে কোন কাজ। বিজয় এলেই তারা বেজায় খুশি। নামাজ পড়া ও মসজিদে যাওয়াকে তার বিজয় হিসাবে ব্যাখ্যা করে শোনাতে হবে। এভাবে বলা যেতে পারেঃ

‘নামাজ পড়ে ফেললে তো তোমার সেই সময়ের আসল কাজ করে ফেললে, জয় তোমার হয়ে গেল। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লে শয়তান তোমার সাথে যুদ্ধে হেরে যাবে। শয়তান ভোরে চায় তুমি ঘুমিয়ে থাক, সেই সময় শয়তানের সাথে ঢিসুম ঢিসুম করে ফাইট করে জিততে হবে তোমাকে। এরপর প্রতি ওয়াক্তে শয়তান তোমার মনের মধ্যে নানা কাজ, নানা খেলার কথা আনবে কিন্তু কিছুতেই তাকে জিততে দেয়া যাবে না, কাপ/ট্রফি পেতে দেওয়া যাবে না। চ্যাম্পিয়ন তোমাকেই হতে হবে। দিনে ৫ বার নামাজ পড়লে তোমার ৫ টা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জমা হলো। শয়তান যেন দিনে একটাও নিতে  না পারে। এক ওয়াক্ত মিস করলেই শয়তান একটা ট্রফি পেয়ে যায়। আবার বাসায় নামাজ পড়লে রানার আপ ট্রফি পাবে তুমি, কিন্তু মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি। তাই দিনে ৫ বার চ্যাম্পিয়ন ট্রফি পাওয়া চাই। তাই না?’

উপহারঃ

ছোটরা সবসময়েই উপহার পেতে পছন্দ করে। ছোট্ট উপহার পেয়েও তাদের চোখেমুখে যে আনন্দ! তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। তাই তাদের জন্য নামাজকেও একটা সুন্দর উপহার হিসাবে প্রমাণ করতে হবে। নামাজ পড়লে কি কি উপহার পাওয়া যায় তাও বুঝিয়ে বলতে হবে। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর কাছ থেকে অনেক উপহার পেয়েছেন। বেশিরভাগ উপহারই আল্লাহ দূর থেকে তাকে দিয়েছেন। কিন্তু মেরাজের সময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী তাঁর প্রিয় উপহার ৫ ওয়াক্ত নামাজ দিয়েছেন একান্তে কাছে ডেকে নিয়ে। নামাজের মাধ্যমে অন্যান্য মুমিনেরা মেরাজের স্বাদ লাভ করতে পারে এই মনে করে যে, আমি আল্লাহকে দেখছি এবং আল্লাহ আমাকে দেখছেন।

ঠিকভাবে নামাজ পড়লে আল্লাহ এই দুনিয়াতে অনেক পুরস্কার দিবেন আর আখিরাতে জান্নাত এর মত অসাধারণ এক পুরস্কার দিবেন। নামাজ বেহেশতের চাবি। এই চাবি দিয়ে সহজেই বেহেস্তে যাওয়া যাবে।

খেলা ও খেলার মাঠঃ

ছোটবেলার অনেক অংশ জুড়েই থাকে এই জায়গাটি। এই মাঠে কত হাসি, আনন্দ হয়। খেলার মাঠে প্রতিদিন বন্ধুদের সাথে দেখা হয়। মসজিদেও কি হয় না? হা, নামাজ পড়তে আসা বন্ধুদের সাথে দেখা হয়। একজনকে ক্যাপ্টেন বানিয়ে বিভিন্ন খেলায় মেতে ওঠে শিশুরা। মুসল্লীরাও কিন্তু ক্যাপ্টেন বানায়? কাকে? হ্যাঁ ইমাম বানায় যাকে। সে যা করে পিছনে মুসল্লীরাও তাই করে।

সুতরাং খেলার মাঠের কিছুটা ফ্লেভার নামাজে ও মসজিদেও পাওয়া যায়।
খেলার মাধ্যমে শরীর ভাল থাকে, শৃঙ্খলা, আনুগত্য ইত্যাদি শেখা যায়, মনে আনন্দ আসে। নামাজেরও অনেক শারিরীক উপকারিতা আছে। ওঠা, বসা, নানা রকম অংগ সঞ্চালনের ফলে শারিরীক ব্যায়ামও হয়ে যায় কিছুটা। জামায়াতে নামাজ এর সময় একই সাথে সবার ছন্দময় ওঠাবসা, একত্রে কাজ করা একটি অসাধারণ শৃঙ্খলা্কেই বাস্তবে রুপদান করে।

লেখকঃ লেখক, ইঞ্জিনিয়ার ও সমাজ সেবক

আরও পড়ুন